default-image

আপনার কি কখনো মনে হয়েছে, আমি যদি অটিস্টিক হতাম? তাহলে পৃথিবীটা কেমন মনে হতো? চলুন, তিন খ্যাতিমান অটিস্টিক মানুষের কাছ থেকে অটিজমের চোখে পৃথিবী দেখার চেষ্টা করি।

১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আমি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে স্থানীয় শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তরের সহায়তায় আমার অটিস্টিক ছেলে আদিলের জন্য ইনটেনসিভ গৃহভিত্তিক শিক্ষামূলক ও থেরাপিউটিক প্রোগ্রাম পরিচালনা করি। আদিল এখন দক্ষ চিত্রশিল্পী, প্রাচীন মিশরের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ, তবে তার চেয়ে প্রিয় হলো বাংলাদেশ। যেখানে সে এখন বাস করছে। অক্সফোর্ডে থাকার সময় ছোট্ট আদিল ছিল নির্বাক, অতিরিক্ত চঞ্চল ও ভীষণ আক্রমণাত্মক। সে সময় আমার সৌভাগ্য হয়েছিল কয়েকজন বিশিষ্ট অটিস্টিক ব্যক্তির বক্তৃতা শোনার, তাদের আত্মজীবনী পড়ার। তাঁদের মধ্যে তিনজন আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তাঁদের কাছে আমি যা শিখেছি, তার কিছুটা আগামী ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে সবাইকে জানাতে চাই।

প্রথমেই বলি ড. টেমপল গ্রান্ডিনের কথা। উনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। একটি সম্মেলনে তিনি জানালেন, তিনি একজন ভিজ্যুয়াল থিঙ্কার অর্থাৎ তিনি ছবির মাধ্যমে চিন্তাভাবনা করেন।

এই সম্মেলনে তাঁর মা ইউস্টেসিয়া কাটলার টেমপল গ্রান্ডিন জানান, টেমপলের জন্য তিনি কতটা দৃঢ়সংকল্প ছিলেন এবং একজন সহযোগীর সহায়তায় বাসায় কীভাবে একটি কাঠামোগত পরিকল্পিত দৈনন্দিন কার্যক্রম চালু রাখেন। যে শিশু ছিল নির্বাক, ভাষাহীন এবং যার আচরণ ছিল ভাঙচুরপ্রবণ, সেই শিশু একজন হাই স্কুলশিক্ষকের সহযোগিতায় কয়েক বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে পড়াশুনায় মনোযোগী হয়ে ওঠে।

একবার টেমপল গরমের ছুটিতে চাচির ডেইরি ফার্মে গিয়ে দেখেন, গাভীর গায়ে ধীরে ধীরে চাপ দিলে গাভী অনেক স্থির ও শান্ত হয়ে ওঠে। এটা দেখে তিনি এমন এক যন্ত্রের নকশা করেন যে, তিনি যখন কোনো বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, ঐ প্রেশার মেশিন দেহের জায়গায় জায়গায় চাপ প্রয়োগ করে। আর এতে তার উদ্বেগের উপশম হয়। এই ধারণা থেকে উদ্ভব হলো একটি ওজনদার জামা (ভেস্ট), যা দিয়ে অস্থির ও চঞ্চল শিশুদের শান্ত করা যায়।

টেমপলের আরেকটি সমস্যা হলো, স্পর্শে অতিসংবেদনশীলতা। জামাকাপড়ের ট্যাগ বা ওই ধরনের বস্তুর স্পর্শ সে সহ্য করতে পারে না, কাজেই সে অন্তর্বাস উল্টিয়ে পরে। ব্যক্তিগতভাবে আমি টেমপলের কাছে ঋণী এ জন্য যে তিনি আমাকে কেবল একটি শিশুর কী কী অক্ষমতা কিংবা দুর্বলতা আছে, সেই দিকে গুরুত্ব না দিয়ে তার কী কী নিজস্ব ক্ষমতা, সক্ষমতা আর আগ্রহ আছে, সে দিকে জোর দেওয়ার জন্য ভীষণভাবে উৎসাহিত করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এবার আসি ডোনা উইলিয়ামসের কথায়। তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক বইয়ে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। র্দুভাগ্যবশত তিনি ২০১৭ সালে ৫৩ বছর বয়সে মারা যান। অক্সফোর্ডে থাকার সময় তাঁর সঙ্গে আমার দুইবার দেখা হয়েছে।

ডোনা বার্কশায়ার অটিস্টিক সোসাইটির একটি সভায় বিশদভাবে বলছিলেন যে তাঁর খাবারে গ্লুটেন (গম) ও ক্যাসিন (দুধ) অসতর্কভাবে থাকলে কিংবা প্রতিদিনের মিনারেল সম্পূরক কোনো সময় না খেলে তাঁর আচরণের ওপর গভীর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এমনও হয়েছে যে আইসক্রিম খাওয়ার পর তিনি জানালার পর্দা টেনে ছিঁড়ে ফেলেছেন।

আরেকটি বক্তৃতায় ডোনা জানিয়েছিলেন, মাঝেমধ্যে তাঁর হাতের আঙুল দিয়ে দেয়ালে টোকা দেন। এটা হচ্ছে মূলত দৃষ্টিনির্ভর অনুভব সমস্যা অর্থাৎ দেয়ালটি অসমান বা দোদুল্যমান মনে হয়। একই কারণে অনেক অটিস্টিক শিশু মনে করতে পারে, মেঝে অসমতল এবং দুলছে, তাই তারা পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে হাঁটতে নিরাপদ বোধ করে।

ডোনার কাছ থেকে শোনার পর আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে আদিলকেও ডোনার মতো চিনি ও গ্লুটেনমুক্ত খাবার পরিবেশন করি এবং মিনারেল সম্পূরক দিতে শুরু করি। ওর আচরণগত সমস্যার অনেকটা উন্নতি হয়।

সবশেষে টিটো মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে কিছু কথা। দৃষ্টিনির্ভর শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কিছু অটিস্টিক শিশু আছে, যারা আবার শ্রবণ শিক্ষার্থী। এরা আকার–ইঙ্গিত ও ছবির চেয়ে শব্দ শুনে দ্রুত শিখতে পারে। এমনি একজন অটিস্টিক মানুষ হলেন বাঙালি কবি ও লেখক টিটো মুখোপাধ্যায়। টিটো কিন্তু কথা বলতে পারেন না। তিনি বাক্‌শক্তিহীন। তাঁর মা সোমা তাঁকে একাই লালন–পালন করেছেন।

সোমা টিটোকে বর্ণমালার বোর্ড দেখিয়ে লিখতে ও পড়তে শিখিয়েছেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে টিটো তার প্রথম কবিতার বই প্রকাশ করেছেন। টিটো জানান, অটিস্টিক শিশু ও বয়স্কদের জন্য আবেগের প্রকাশ কতটা কঠিন। তার মা সোমা একবার জন্মদিনে তার জন্য একটি উজ্জ্বল, লাল রঙের ট্রাইসাইকেল (তিন চাকার সাইকেল) উপহার দিলেন। টিটো তো মহাখুশী কিন্তু তার আশানুরূপ আনন্দের অভিব্যক্তি অনুপস্থিত। সে তার মার প্রতি ধন্যবাদ জানাতে তিনটি খেলনা সৈন্য ট্রাইসাইকেলটির পাশে শান্তভাবে রাখল। তার এই বার্তার গূঢ় অর্থ কে উদ্ধার করবে? এই শিশুই তার বই দ্য মাইন্ড ট্রি–তে তার মনের গভীরের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতিগুলো কত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

‘আমি যা কিছু করি, তা দেখে মানুষ হতভম্ভ।’

একটি কবিতায় সে লিখেছে, ‘যখন তুমি নীল নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করো এবং অবশেষে ভাবনায় কালো এসে যায়, নিশ্চয়ই তাতে তুমি নিরাশ হও; এমনটি আমার প্রায়ই হয় এবং আমি অসহায় বোধ করি। তা না হলে আমি কেন ঘুরপাক খেতে থাকি; আমার শরীরটাকে ঘোরাতে থাকলে আমার চিন্তাভাবনায় একটি সমন্বয় খুঁজে পাই।’

টিটোকে আমি সরাসরি দেখিনি। কিন্তু বইয়ের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে মনে হয়। টিটোর জন্যই বুঝতে পেরেছি আদিল কেন সমাজে সহজে মিশতে পারে না।

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে আমি টেমপল, ডোনা ও টিটোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। তাঁদের জীবন আমার ও আদিলের জীবনকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। তাঁরা তাঁদের অটিজমের জগৎ সম্পর্কে জানতে দিয়ে আমাদের মতো মা–বাবা ও পেশাজীবীদের অনেক উপকার করেছেন, যাতে আমরা অটিজম সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে পারি। আর অটিস্টিক শিশু ও বয়স্কদের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রচনা করতে পারি।

লেখক: অটিজম বিশেষজ্ঞ

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন