সাইবার বুলিং

অনলাইনে অনাচার নয়

অনলাইনে অনাচার নয়
বিজ্ঞাপন

সাইবার বুলিং নিয়ে লেখা আমার জন্য কঠিন একটা কাজ। নিশ্চয়ই এটি সামাজিক সমস্যা। তবে সামাজিকতার বাইরেও এ বিষয়ের ব্যক্তিগত একটি দিক আছে। অনলাইনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার বিচরণ এখন প্রায় এক যুগের ওপরে। কিঞ্চিৎ পরিচিতি আছে বলে বিভিন্ন সময় কারণে-অকারণে আমাকে নানা রকম গালমন্দ ভর্ৎসনার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

ধরুন, আমি আমার প্রিয় ফুটবল দল নিয়ে কিছু লিখলাম আর একজন অপরিচিত ব্যক্তি আমার মা–বাবা তুলে গালি দিয়ে গেল। আবার কখনো দেখা গেল, কোনো কারণ বা পরিচিতি ছাড়াই আমাকে ইনবক্সে বীভৎস ভাষায় গালাগালি করছে। তারপরও আমার ধারণা, ছেলে হওয়ার কারণে এবং সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে খানিকটা দূরে থাকায় আমি অনেকটাই বেঁচে গেছি। আমার আশপাশের নারীদের প্রতিনিয়ত যে ধরনের কটূক্তির সম্মুখীন হতে হয়, তারপরও যে তারা মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তাতেই আমি আশ্চর্য হয়ে যাই।

আমি বিশ্বাস করি যে সাইবার বুলিং যারা করে, তাদের সংখ্যা অন্যদের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু তাদের উগ্রতা ও নিষ্ঠুরতার কারণে তারা বেশি চোখে পড়ে ঠিক যে রকম সমাজে অনেক ভালো মানুষের মধ্যে অপকর্ম যারা করে, তাদেরই আমরা বেশি লক্ষ করি।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই গালমন্দ আমাকে খুবই বিচলিত করত। একজন মানুষ যাকে আমি চিনি না, জানি না, কীভাবে আমার প্রতি এতটা ঘৃণা প্রকাশ করতে পারে, আমার সম্পর্কে আমার পরিবার সম্পর্কে এত খারাপ কথা বলতে পারে! মাঝেমধ্যে ঘুম হারাম হয়ে যেত। ভাবতাম, এই মানুষদের সঙ্গে আমার হয়তো রাস্তাঘাটে বা অন্য কোথাও দেখা হয়। আমার প্রতি এতটা ঘৃণা একজন পোষণ করছে, অথচ আমি বুঝতেই পারি না। পরে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের আচরণ নিয়ে কিছুটা জ্ঞান হলো, তখন বুঝলাম, সাইবারজগতে বুলিং এবং বাস্তবে বুলিংয়ের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে।

আমার ধারণা, ছেলে হওয়ার কারণে এবং সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে খানিকটা দূরে থাকায় আমি অনেকটাই বেঁচে গেছি। আমার আশপাশের নারীদের প্রতিনিয়ত যে ধরনের কটূক্তির সম্মুখীন হতে হয়, তারপরও যে তারা মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তাতেই আমি আশ্চর্য হয়ে যাই।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাইবারজগতে আমরা যাদের গালাগালি করছি, তাদের থেকে অনেক দূরে থাকি। একটা গালি দিয়ে সেটার প্রতিক্রিয়া আমাদের দেখতে হয় না বা সামলাতে হয় না। এমনকি কারও সম্পর্কে দুই লাইন বা দুটি খারাপ কথা লিখতে তার প্রতি খুব বেশি ঘৃণাও সঞ্চয় করতে হয় না। অপছন্দের কাউকে সামনাসামনি গালমন্দ করতে অনেক সাহস ও শক্তির দরকার হয়। অনলাইনে তা লাগে না। তারপরও এই গালাগালি করার অভ্যাসটা আমার কাছে একধরনের অসুস্থতা মনে হয়। কোনো সুস্থ মানুষ আরেকজনকে, বিশেষ করে অচেনা কাউকে এভাবে অত্যাচার করতে পারে না, করাটা যতই সহজ হোক না কেন।

আমি বিশ্বাস করি যে সাইবার বুলিং যারা করে, তাদের সংখ্যা অন্যদের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু তাদের উগ্রতা ও নিষ্ঠুরতার কারণে তারা বেশি চোখে পড়ে ঠিক যে রকম সমাজে অনেক ভালো মানুষের মধ্যে অপকর্ম যারা করে, তাদেরই আমরা বেশি লক্ষ করি।

যেহেতু অসুস্থ মানসিকতার, তাই আমি কিছু বললে তাদের ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। আমার বিশ্বাস, এগুলো ঠিক করতে হলে আইনি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। একজন ব্যক্তি, অভিভাবক, বন্ধু ও শিল্পী হিসেবে আমরা সাইবার বুলিং বা অনলাইনের এসব অনাচার থেকে নিজেদের কীভাবে নিরাপদ রাখতে পারি, সেটা নিয়ে কিছু বলা যায়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা আমার প্রোফাইলে আমি ফলোয়ার, কমেন্টস অপশন বন্ধ করে দিয়েছি। অনেকে এটা করতে চান না। সত্যি বলতে, বেশির ভাগ মন্তব্যই ভালো হয়। কিন্তু খারাপ কথাগুলো এতই খারাপ হয় যে মানসিক অশান্তি তৈরি করে। বহুদিন লক্ষ করে বুঝলাম যে এই অশান্তি আমি নিতে পারছি না। তাই ফলোয়ারদের মন্তব্য করার সুবিধাটা বন্ধ করে দিলাম। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

একজন অভিভাবকের বেলায় বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার। আমাদের সন্তানদের যতটা রক্ষা করা সম্ভব, আমাদের করা উচিত। এ ক্ষেত্রে বাচ্চাদের নিয়ে পোস্ট দেওয়া বা তাদের কর্মকাণ্ড সাইবারজগতে প্রকাশ করার ব্যাপারে আমাদের সব ধরনের সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। বাচ্চাসংক্রান্ত পোস্টে প্রাইভেসি সেটিংস নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, এখন প্রায় সবার হাতেই মুঠোফোন থাকে। আপনার সন্তানের কোনো পোস্টে কেউ খারাপ মন্তব্য করলে সেটা আপনি ওকে না দেখালেও যে ওর কোনো বন্ধু, আত্মীয় বা প্রতিবেশী দেখাবে না, সে নিশ্চয়তা তো নেই। যে ধরনের গালিগালাজ আমাদেরই নিতে কষ্ট হয়, একটি বাচ্চার জন্য তা কতটাই না বেদনাদায়ক হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তানের বিচরণের ব্যাপারে ঠিক একইভাবে অথবা আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। এখনকার শিশুরা খুব অল্প বয়স থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কীভাবে ঢুকতে হয়, সেটা শিখে ফেলে। প্রতিটি ধাপে হয়তো তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তাই নিজের সন্তানকে যদি আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচরণের অনুমতি দেনও, তাকে এর নেতিবাচক বিষয়গুলো বোঝাতে হবে। সন্তানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা চালিয়ে যেতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে সে যেন নিজেকে একা মনে না করে। কোনো ধরনের বুলিংয়ের সম্মুখীন হলে যেন সে আপনার সঙ্গে সেটি নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ না করে। সাইবারজগৎ এমন একটি জায়গা, যেখানে একাকিত্ব বোধ করা খুবই সহজ। বিশেষ করে বিপদের সময়। আপনার সন্তান যাতে বিপদের সময় একা না হয়ে যায়, এই ব্যাপারে খেয়াল রাখা খুবই জরুরি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বন্ধু ও কাছের মানুষের ব্যাপারেও খেয়াল রাখা উচিত। আমি যেমন বললাম, সে রকম আরও অনেক মানুষকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালমন্দ গভীরভাবে মনঃকষ্ট দেয়। আপনার কাছের কেউ যদি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়, তাকে শক্তি দেওয়া প্রয়োজন। তার কষ্টের কথা শোনা উচিত। অনেক সময় অনলাইনে দশটা বাজে কথার রেশ সামনাসামনি দুটো ভালো কথা দিয়ে কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব।

একজন শিল্পী হিসেবে আমি মনে করি, আমাদের বুলিং সংস্কৃতিকে মহিমান্বিত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আমরা যে শিল্পই তৈরি করি না কেন, সেটা নাটক হোক, সিনেমা হোক বা ভ্লগ (ভিডিও ব্লগ) হোক, আমাদের সতর্ক থাকা উচিত যে আমাদের কাজ দেখে যাতে আমাদের অনুসারীরা আরও দশজনকে বুলিং করার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত না করে। অহেতুক গালিগালাজ করে, সহিংস কথা বলে ভিডিও বা কোনো কিছু তৈরি করলে হয়তো সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায়। কিন্তু আমার কাজ দেখে যদি কাল আমারই ঘরের মানুষকে কেউ অনলাইনে উত্ত্যক্ত করতে উদ্বুদ্ধ হয়, তবে সেই জনপ্রিয়তার মূল্য কতটুকু?

একটা লেখায় বা একজনের কথায় সাইবার বুলিংয়ের অবসান বা সমাধান ঘটবে না। আমার কথা বা লেখাতে তো নাই–ই। তবে সমাজ, সরকার, ব্যক্তি মিলে আমরা যদি সমষ্টিগতভাবে এ ব্যাপারে সচেতন থাকি, তবে হয়তো কিছুটা হলেও নিজেকে, নিজের সন্তানকে, নিজের ভালোবাসার মানুষকে সাইবার বুলিং থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

সবাই সুস্থ থাকবেন। নিরাপদ থাকবেন।

লেখক: অভিনেতা

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাইবার বুলিং গুরুতর অপরাধ

তানজিম আল ইসলাম

আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা

সাইবার মাধ্যম বা অনলাইনে বিভিন্ন উপায়ে হেয় করা, বিরক্ত বা হয়রানি করা, ভয় দেখানো, প্রলুব্ধ করা, মানহানি বা অপমান করা প্রভৃতিকে বলা হয় সাইবার বুলিং। প্রচলিত আইনে সাইবার বুলিং একটি গুরুতর অপরাধ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অনুযায়ী এই অপরাধের নির্ধারিত শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের জেল বা তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড। যদি মানহানিকর কোনো কিছু প্রকাশ পায়, তাহলে তিন বছরের জেল বা জরিমানা হতে পারে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা কিংবা দুটোই। এ আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির তারতম্য আছে। এ ছাড়া পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ অনুযায়ীও রয়েছে কঠিন শাস্তি।

যদি কেউ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন, তাহলে প্রথমইে তাঁকে আলামত বা প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সাইবার যেকোনো মাধ্যমেই হোক না কেন, প্রথমে স্ক্রিনশট এবং ওয়েব ঠিকানা (লিংক) রাখতে হবে। দ্রুত নিকটস্থ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে। তারপর প্রতিকারের জন্য ঢাকায় মেট্রাপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কাছে জিডির কপিসহ লিখিত অভিযোগ করা যায়। কেউ সরাসরি মামলা করতে চাইলে প্রথমে থানায় এজাহার দায়ের করতে হবে। থানায় মামলা না নিলে সাইবার ট্রাইব্যুনালে আইনজীবীর মাধ্যমেও মামলা করা যায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন