মানসিক চাপ কমিয়ে কমবয়সীদের থাকতে হবে ফুরফুরে। প্রতীকী এই ছবির মডেল: দৃনা,
মানসিক চাপ কমিয়ে কমবয়সীদের থাকতে হবে ফুরফুরে। প্রতীকী এই ছবির মডেল: দৃনা, ছবি: অধুনা

‘আহা রে! এত অল্প বয়সে চলে গেল! এত অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক! মা–বাবার না জানি কেমন লাগছে!’ বলার এবং নিজ সন্তান নিয়ে আতঙ্কিত অভিভাবক এখন আমাদের চেনা পরিচয়ের মধ্যেই। ৩০তম জন্মদিন পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারা আপাতসুস্থ ছেলেমেয়েদের হঠাৎ মৃত্যুতে আজকাল একটু বেশিই চমকাতে হচ্ছে আমাদের।

পত্রপত্রিকার খবর বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয়। অল্প বয়সে মৃত্যুর সংখ্যা আগের তুলনায় সত্যি সত্যিই বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১০ বছরে ৪০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার বছরে ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয়ে বেঁচে গেলেও নানা রকমের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়। যে তরুণ বা যুবকের দেশ বা সমাজকে দেওয়ার মতো অনেক কিছু ছিল, তাঁর অকালমৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু অল্প বয়সে এই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ছে কেন? ঝুঁকি কমাতে আমাদের কী কী করণীয়?

বিজ্ঞাপন

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা

পরিবারের কারও যদি উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকে, তবে অল্প বয়সী কিশোর বা তরুণটি উচ্চ রক্তচাপে ভোগার ঝুঁকিতে থাকেন। বেশি বয়সেই কেবল উচ্চ রক্তচাপে ভোগার সম্ভাবনা ভেবে অবহেলা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের পারিবারিক ইতিহাস থাকাদের নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে থাকা উচিত। যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাঁরা যেন অবশ্যই তা নিয়ন্ত্রণে রাখেন।

রক্তে কোলেস্টেরলের সঠিক মাত্রা বজায় রাখা

উচ্চ রক্তচাপের মতোই রক্তে মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টেরলের পারিবারিক ইতিহাস অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের একটি অন্যতম ঝুঁকি। তাই, কোলেস্টেরলের মাত্রা জানতে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল থাকলে জীবনাচার পরিবর্তন করতে হবে, বা প্রয়োজনে ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।

সঠিক শারীরিক ওজন বজায় রাখা

অতিরিক্ত শারীরিক ওজন বা স্থূলতা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায় বলে প্রয়োজনে ওজন কমানোর মাধ্যমে ঝুঁকি কমাতে হবে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করা

খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে শারীরিক ওজন, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ইত্যাদির সংযোগ রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে মূলত দারিদ্যসীমার নিচে থাকারাই অস্বাস্থ্যকর জাঙ্ক ফুডের দিকে ঝোঁকে। আমাদের দেশে তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়। আজকালকার ছেলেমেয়েরা বিস্ময়করভাবে জাঙ্ক ফুড গ্রহণকে স্ট্যাটাস সিম্বল মনে করতে শুরু করেছে। অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোমল পানীয়, অতিরিক্ত লবণযুক্ত ফাস্ট ফুড খাওয়ার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

নিয়মিত শারীরিক শ্রম বা ব্যায়াম করা

হৃদ্‌যন্ত্রে রক্তের সরবরাহ বাড়াতে এবং তার সামর্থ্য বাড়াতে ব্যায়াম বা শারীরিক শ্রম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়াও নিয়মিত শারীরিক শ্রমের মাধ্যমে শরীরের কাঙ্ক্ষিত ওজন বজায় রাখা, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানো এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, যা প্রকারান্তরে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়।

ধূমপান পরিহার করা

ধূমপান উচ্চ রক্তচাপ তৈরির মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই যাঁরা ধূমপান করেন না, তাঁরা অবশ্যই ধূমপান শুরু করবেন না এবং যাঁদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাঁরা এই অভ্যাস ত্যাগ করবেন। ধূমপান ত্যাগে প্রয়োজনে চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

মদ্যপান ও নেশাদ্রব্য পরিহার করা

উন্নত দেশগুলোতে অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয় মদ্যপান ও নেশাদ্রব্য গ্রহণকে। আমাদের দেশেও এর ব্যবহার বাড়তির দিকে থাকায় আমাদের ছেলেমেয়েরাও এই ঝুঁকির বাইরে নেই। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের দিকে খেয়াল রাখা, যেন তাঁরা সঙ্গদোষে খেলাচ্ছলেও মদ্যপান বা নেশার জগতে ঢুকে না পড়ে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা উচিত, প্রায় সব ক্ষেত্রেই ধূমপান নেশার জগতের গেটওয়ে বা প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা

ডায়াবেটিস রক্তনালি ও নার্ভের ক্ষতি করে বলে যাঁরা ডায়াবেটিসে ভোগেন, তাঁদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি থাকে। তাই ডায়াবেটিস আছে কি না, তা জানার জন্য বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিসের পারিবারিক ইতিহাস আছে, তাঁদেরকে নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত এবং ডায়াবেটিস থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।

মানসিক চাপ কমানো

মানসিক চাপ নানাভাবে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। ইদানীংকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রেমঘটিত বা চাকরি ক্ষেত্রে নানা ধরনের চাপ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মদ্যপান, নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ, অতিরিক্ত ভোজন, ধূমপানে আসক্ত হয়ে যেতে দেখা যায়, যা হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য খারাপ। তাই মানসিক চাপ কমাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যায়াম করা, খেলাধুলা করা, গান শোনা বা ধ্যানের অভ্যাস করতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমানো

পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমালে তা উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এবং এই তিনটিই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে অকারণে রাতজাগা বা সঠিক সময়ে ঘুমাতে যাবার সু–অভ্যাসের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কারও যদি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টার চেয়ে কম ঘুম হয়, তাহলে তাঁর উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক পরিমাণ ঘুমের সু–অভ্যাস গ্রহণ করা।

অল্প বয়সেও হার্ট অ্যাটাক এবং তা থেকে মৃত্যুর ঝুঁকি আছে, এটি আর অস্বীকারের উপায় নেই। এ থেকে বাঁচতে আমাদের চাই এই বিষয়ে সচেতনতা এবং সঠিক পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা।

মন্তব্য পড়ুন 0