default-image
বিজ্ঞাপন

মা-বাবা যখন দূরে কোথাও যান, কোনো এক সন্তানকে সবকিছুর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যান। দীর্ঘদিন আমার বাবার জন্য সেই এক সন্তান ছিলাম আমি। আমার বাবা যখন শ্বাসকষ্ট নিয়ে এক মাসে দ্বিতীয়বারের মতো হাসপাতালে ভর্তি হলেন, আমি তখন শহরে ছিলাম না। তিনি আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) গেলেন, আমি খুব দূরে দূরে থাকতাম। হাসপাতালে গেলেও আইসিইউতে দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে বসে থাকতাম, আগবাড়িয়ে কাছে যেতাম না। গত ২৭ অক্টোবর বেলা তিনটায় যখন শিডিউলের বাইরে আমাকে ডাকা হয়, আমি সহসাই বুঝতে পারলাম সময়টা চলে এসেছে। দীর্ঘদিন বাবা মিছেমিছি আমার হাতে ব্ল্যাংক চেক ধরিয়ে দেশে-বিদেশে ঘুরতে গেছেন। এবার সত্যি তিনি চলে যাচ্ছেন।

এই লেখাটা আমার বাবা ফুটবল রেফারি আবদুল আজীজকে নিয়ে। এই প্রজন্মের অনেকে হয়তো তাঁকে চেনেন না। তবে আশির দশকে যখন বাংলাদেশের ফুটবলের স্বর্ণযুগ চলছে, রেফারি আবদুল আজীজ একজন তারকা ছিলেন। সে সময়ের ফুটবলারদের চেয়ে তারকাখ্যাতি কম ছিল না আবদুল আজীজের। এই লেখায় কিছুটা শোনা, কিছুটা দেখা বাবাকে এক করার চেষ্টা মাত্র।

১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। আমার বড় বোন কেবল জন্মেছেন। গল্পটা আমার মায়ের মুখে শোনা। আম্মুকে হাসপাতাল থেকে বাসায় রেখে আমার বাবা গেছেন খেলা চালাতে ময়মনসিংহে। সে সময়ের যা রীতি ছিল, ফুটবল মানেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ। একজন রেফারি দুই পক্ষেরই শত্রু। রেফারিদের বাড়িতে নিয়মিত উড়ো চিঠি, ফোন কলে আসে নানা রকম হুমকি, এমনকি জীবননাশের হুমকিও। গুরুত্বপূর্ণ খেলা, ফলে ঢাকা থেকে আবদুল আজীজকেই নেওয়া হয়েছে রেফারি হিসেবে। খেলার মাঝখানে বিরাট ঝামেলা লাগল। কোনো এক পক্ষ ফাউল করেছে। আবদুল আজীজ পতাকা তুলে সিদ্ধান্ত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মাঠে খেলোয়াড়েরা ক্ষুব্ধ, মাঠে নেমে এসেছেন সমর্থকেরাও। আব্বু ঠায় দাঁড়িয়ে। ফাউল মানে ফাউল।

আব্বুকে কঠোর নিরাপত্তা দিয়ে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও মানুষে গিজগিজ করছে। পুলিশ প্রশাসন জানতে পারলেন, না, কেউ রেফারি আজীজকে আক্রমণ করতে আসেননি। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসেছেন, সেই রেফারিকে দেখতে যে এত কিছুর মধ্যে নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। পরদিন একটি জাতীয় দৈনিকে শিরোনাম হলো, ‘ব্যাটাই একখান আবদুল আজীজ’।

মহান মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, আব্বু দশম শ্রেণির ছাত্র। স্কাউটিং করেন, খেলাধুলা করেন, মিছিল করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে ডাকেন—স্লোগান মাস্টার। ২৫ মার্চ রাতে শুরু হলো অপারেশন সার্চলাইট। সেই রাতেই সূত্রাপুর থানা লুট করেন আব্বু। আব্বুর মাথার মূল্য নির্ধারিত হয়। আমার দাদা ছিলেন জগন্নাথ কলেজের উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষক। দাদাকে ধরে নিয়ে যায় মিলিটারিরা। আব্বুকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান তিনি। দাদা আব্বুকে খুঁজে বের করে বললেন, ‘তুই পালিয়ে যা, দেশ স্বাধীন করে বাড়ি ফিরিস। না হলে তোর মা অনেক কষ্ট পাবেন।’ আব্বুর এ সাহসিকতার কথা বাসন্তী গুহঠাকুরতার একাত্তরের স্মৃতি বইয়ে লেখা আছে। আব্বু যুদ্ধ করেছেন ঢাকার দোহারে, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সহযোদ্ধা হয়ে।

বিজ্ঞাপন
default-image

ছোটবেলায় যখন বাসায় বিদ্যুৎ চলে যেত, আব্বু আমাদের এসব গল্প বলতেন। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ভয় করেনি? আব্বু বললেন, ‘ভয় করেনি, তবে জানিস একটা বোকামি করেছিলাম। থানা লুট করে প্রথমে শুধু বন্দুক নিয়ে গেছি। গুলি যে আলাদা জায়গায় থাকে, জানতাম না। পরে আবার গিয়ে গুলি লুট করি। সেই গুলির বাক্স এত ভারী ছিল যে মাটিতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল। একবারও ভাবিনি, এই ঘষাতে বিস্ফোরণ হতে পারে। বুঝলি বাবু, শুধু সাহস থাকলে হয় না, বুদ্ধিও থাকা দরকার। বুদ্ধি না থাকলে সেই সাহসের কোনো মূল্য নেই।’

আমার আব্বু দুঃসাহসী ছিলেন। খেলার মাঠে সমর্থকেরা রেফারিদের উদ্দেশে বোতল, ইট-পাথর ইত্যাদি ছুড়ে মারত। রেফারি আজীজ সেগুলো কুড়িয়ে গ্যালারিতে ফেরত পাঠানোর জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

কন্যা হিসেবে সমর্থকদের রোষের মুখে আমরাও কম পড়িনি। সম্ভবত ১৯৯৪ সালের ঘটনা। আমরা গিয়েছি কক্সবাজার। আব্বু তত দিনে রেফারির পাট প্রায় গুটিয়ে ফেলেছেন, অগ্রণী ব্যাংকে চাকরি করেন। ব্যাংকের ফুটবল দলের প্রশিক্ষক তিনি। তো আমরা দলের সঙ্গেই গিয়েছিলাম। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই অগ্রণী ব্যাংক দল ঢাকায় ফিরে এল। আব্বুকে আয়োজকেরা রেখে দিলেন খেলা চালানোর জন্য। আমরা যে হোটেলে ছিলাম, তার ওপর তলাতেই একটা দল ছিল। রাতভর তাঁরা ভীষণ শব্দ করে বিরক্ত করল আমাদের। খেলা চলার মাঝখানে আমরা দুই বোন ও মা হোটেলে। হঠাৎ আব্বুর হাতে লেখা একটা চিঠি নিয়ে এক লোক হাজির, ‘খেলার অবস্থা ভালো না। মাহু (আমার মায়ের নাম মাহবুবা) তুমি মেয়েদের নিয়ে সরে যাও।’

default-image

অচেনা কক্সবাজার শহরে আমরা সারাটা বিকেল পালিয়ে বেড়ালাম। শেষে আমার মা সিদ্ধান্ত নিলেন অগ্রণী ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় চলে যাওয়ার। টেলিফোন ছাড়া সেই যুগে রাত নয়টায় আব্বু আমাদের খুঁজে বের করলেন সেখান থেকে।

যদিও আমরা স্কুলবাসে যাতায়াত করতাম, তারপরও প্রতিটা বড় ম্যাচের আগে তিনি আমাদের স্কুল থেকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতেন। আব্বু নিজে হাতে আমাদের বাড়ি রেখে না এলে খেলায় মন দিতে পারতেন না।

আব্বু চলতে-ফিরতে আমাদের ধারাবিবরণী দিতেন। কী করতে হবে, কেমন করে করতে হবে। একবার আমরা তখন বেশ বড়, তিনি ঠিক করলেন আমাদের সবাইকে প্লেনে করে বড় ফ্লাইটে বিদেশ নেওয়া হবে। আমরা তিন বোন, মা-বাবাসহ মোট পাঁচজনের প্লেনভাড়ায় আমার মা যারপরনাই বিরক্ত। এমন তো নয় যে আমরা বিদেশ বেড়াতে যাই না। কেন অযথা খরচ? আব্বু বললেন, প্লেনে করে বড় ট্যুর দিতে হবে, আমার মেয়েরা শিখবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কীভাবে সামলাতে হয়। এমনই অদ্ভুত একজন মানুষ ছিলেন আমার আব্বু।

১৯৮০ সালের ঘটনা, ১৫ আগস্ট। ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) খেলা শুরু হবে। জুতার ফিতা বাধার ছুতায় রেফারি আজীজ সব দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। যেহেতু মাঠে খেলোয়াড়েরা নীরবতা পালন করছেন, দর্শকেরাও করেন। এ ঘটনাটাও পত্রিকায় এসেছিল ২০০৮ বা ০৯ সালের দিকে। আব্বু বিশ্বাস করতেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য। তাই তিনি আমৃত্যু সনদ নেননি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো সুবিধাও চাননি।

২৭ অক্টোবর আমাকে আইসিইউ থেকে বলা হয় তিনি চলে যাচ্ছেন। আমি বললাম, যদি গিয়ে থাকো, খুব দূরে কোথাও যাওনি, কাছেই আছ। তুমি জেনে রাখো, তুমি তোমার কাজ করেছ, যা বাকি আছে আমি, আমরা শেষ করব। আব্বু চলে যাওয়ার পর আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করেছেন, আমাদের এত সাহসের উৎস কী? আমি ছোটবেলা থেকে আব্বুকে যেমন দেখেছি, মানুষ এর বাইরে অন্য কোনো রকম হতে পারে, আমার জানা নেই। সাহস বিষয়টা যোগ্যতা থেকে আসে। যখন মানুষ অনেক যোগ্য হন, তিনি সাহসী হন। তিনি নিজের জন্য করতে পারেন, অন্যদের জন্য প্রাণ খুলে করতে পারেন।

সমস্ত ক্রিয়াক্রম শেষে ২৭ তারিখ রাতেই আমার বাবাকে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। কোনো বিউগল বাজেনি, কেউ গার্ড অব অনার দেয়নি। আমার বাবা জীবনে অনেক তালি পেয়েছেন। ২০০০ সালে মোনেম মুন্নার চিকিৎসার জন্য তহবিল সংগ্রহে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে যখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রেফারি হিসেবে অবসর নেন, পরদিনও সবকিছু ছাপিয়ে রেফারি আজীজই ছিলেন শিরোনামে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0