default-image

বাংলাদেশের সুপরিচিত দৈনিক প্রথম আলোতে একজন নতুন কলাম লেখক হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় ১৯ বছর আগে। মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রথম পর্যায়টি শেষ করে যখন সরাসরি রোগীদের সঙ্গে কাজ শুরু করি, তখন নিজের ভেতরে প্রচণ্ড তাগিদ তৈরি হয়েছিল অভিজ্ঞতা গুলো লেখার মাধ্যমে তুলে ধরার। এই উপলব্ধি থেকে লেখা আমার বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রথম আলোর মনস্তত্ত্ব বিভাগে ছাপা হওয়ার পর সম্পাদক মহোদয় আমাকে অনুরোধ করলেন মানসিক বিষয় নিয়ে পাঠকদের প্রশ্নোত্তর দেওয়ার জন্য। তাঁর এই প্রস্তাব খুব মনঃপূত হলেও আমি একটু ভাবার জন্য সময় চেয়েছিলাম। কারণ ছিল, সাইকোথেরাপি বা মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিংয়ের সময় উপদেশ, সিদ্ধান্ত বা সমস্যার সমাধান দেওয়া হয় না। আমার উত্তরে যদি সে ধরনের কোনো ছোঁয়া থাকে, তবে জনমনে এই বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়াটি নিয়ে কিছু ভুল ধারণা সৃষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মানসিক স্বাস্থ্য বলতে আমরা সাধারণত অসুস্থতা বা পাগলামি বুঝে থাকি। জটিল কোনো মানসিক রোগের শিকার না হলেও, কেউ যে তার অনিচ্ছায় আশপাশের মানুষদের জন্য কতটা হুমকি তৈরি করতে পারে, তা আমরা গভীরে গিয়ে বুঝতেও পারছি না। শুধু ওষুধ প্রয়োগে একজন রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা যে খুব কম ক্ষেত্রে সম্ভব হয়, তা বেশির ভাগ মানুষেরই জানা নেই। এসব ভেবে মনে হলো, যদি আমি বিষয়গুলো পাঠকদের চিঠির জবাবের মাধ্যমে তুলে ধরতে পারি, তাহলে সমাজে এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে সহায়তা করা যাবে।

এরপর থেকে একনাগাড়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ছুটির দিনে–র ‘মনের জানালা’ বিভাগে চিঠির উত্তর লিখেছি। আমি ভাবতেই পারিনি মানুষ তাদের মনের গভীরে লুকিয়ে রাখা কথাগুলো এতটা নিঃসংকোচে চিঠিতে প্রকাশ করবে। চিঠিগুলো অফিসের যে বাক্সটিতে রাখা হতো, সেটিতে জায়গা সংকুলান সম্ভব হতো না। তরুণ ছেলেমেয়েদের চিঠিগুলোর উত্তর লিখতে গিয়ে মনে হতো, আমি ওদের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি এবং আমার সঙ্গে ওদের একটি সহমর্মী সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। পত্রলেখকের অনুভূতির সঙ্গে আমি একাত্ম হয়েছি।

মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া অসহায় মানুষেরা কেবল ওষুধ খাচ্ছে দিনের পর দিন কিন্তু ওদের পরিবারের সদস্যদের বিজ্ঞানসম্মতভাবে ফ্যামিলি থেরাপি এবং গ্রুপ থেরাপি দেওয়ার কোনো দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করা হচ্ছে না, তা নিয়ে আমি অনেক হতাশায় ভুগেছি। অনেকে আমাকে ওষুধের ব্যবস্থাপত্রের ফটোকপি পাঠিয়েছেন, যা অনুসরণ করে তিনি ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন, কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে আরোগ্য লাভ হয়নি।

বর্তমান সময়ে আমি প্রথম আলোর বুধবারের ‘অধুনা’য় চিঠিপত্রের জবাব লিখছি। এখন প্রতি মাসে বা প্রতি সপ্তাহে লেখা হচ্ছে না আগের মতো নানা কারণেই। ‘মনের জানালা’ বিভাগের সঙ্গে আমার যেহেতু আত্মিক ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তাই মাঝেমধ্যে সেটি খুব মিস করি। পাঠকদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী, কারণ অনেকেই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখে অনুযোগ করেছেন কেন তাঁদের চিঠির উত্তর দেওয়া হয়নি। শুধু প্রথম আলো নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় অফিসেও পাঠকের অনেক চিঠি এসেছে। সেগুলোর প্রতি সুবিচার করা হয়নি বলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

পরিশেষে প্রথম আলোর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাকে মানুষের মনের এত কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। যেসব ছেলেমেয়ে ১০-১১ বছর বয়স থেকেই এই উত্তরগুলো পড়েছে, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় দেখা হলে তারা যখন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করে, তখন আমি মনে করি প্রথম আলো পত্রিকায় সম্পৃক্ত মানুষদেরই এটি প্রাপ্য, আমার নয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0