বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নতুন জীবনের যাত্রার প্রস্তুতিতেও তিক্ত কথা তিশার পিছু ছাড়েনি। কখনো পাশের বাসার মধ্যবয়সী আন্টি ‘আগে সংসার সামলাও’ উপদেশ দিয়েছেন। আবার কখনো ভরদুপুরে বাড়ি ভরে গেছে এমন সব আত্মীয়স্বজনে, যাঁরা মিষ্টি কণ্ঠে জানিয়েছেন ‘বিয়ের পর আসলে মেয়েদের কী করা উচিত’।

সমবয়সী বন্ধুরাও কেন যেন হাসি-ঠাট্টার ফাঁকে ‘লং ডিসট্যান্স’ সম্পর্কের নেতিবাচক ফলাফল কী কী হতে পারে, সেসব নিয়ে সতর্কবাণী শুনিয়েছে। তাই বোধ হয় প্রাপ্তির আনন্দ তিশাকে ঠিক উদ্বেলিত করে না। হৃদয়ের খুব কাছাকাছি থাকা প্রিয় মুখ, আজীবন স্নেহাশ্রয় দিয়ে রাখা মা-বাবা, ভাইবোন—সবাইকে রেখে দূরদেশে পাড়ি জমানোর এ যাত্রায় দুঃখবোধের উপস্থিতি অনিবার্য সত্য। তবে শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে এক্ষেত্রে তিশার বাড়তি প্রাপ্তি ছিল তিক্ত কথার ভার, অহেতুক গ্লানিবোধ আর আসন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র আশঙ্কা।

বিয়ের পর বিদেশে পড়তে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করার সময় তাই ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির পিএইচডি প্রোগ্রামের ছাত্রী তিশা বলেই ফেলেন, ‘বিশ্বের সেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া যে একটি অর্জন, সেটিই যেন কেউ স্বীকার করতে চাইছিল না। আমার অর্জনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার লৈঙ্গিক পরিচয়। আমার মনে হয়েছিল “নারী” বলে আমি অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্যতাটুকুও হারিয়েছি।’

তিশার মতোই নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন বর্তমানে নেদারল্যান্ডসের আইন্ডহোভেন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে পিএইচডির শিক্ষার্থী তাসফিয়া ওয়াসেল কবীর। দীর্ঘদিন তাঁকে শুনতে হয়েছে ‘আসল সংসার কবে করবে?’ আবার অস্ট্রেলিয়ার আরেক বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী আনিসা (ছদ্মনাম) বলছিলেন, ‘আমি যখন বিদেশে পড়তে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সবাই আমাকে ও আমার স্বামীকে ভর্ৎসনা করছিল। আমরা যেহেতু সমবয়সী এবং একই ক্ষেত্রের পেশাজীবী, তাই তাঁদের যুক্তি ছিল, আমি আগে স্নাতকোত্তর করতে বিদেশে এলে আমার স্বামীর চেয়ে এগিয়ে যাব। যেটি নারী হিসেবে আমার একেবারেই উচিত হবে না।’

তিশা, তাসফিয়া বা আনিসার সঙ্গে কথা বলে আসলে যে খুব অবাক হই, তা কিন্তু নয়। এ দেশের অন্য নারীদের মতো আমিও তো জানি, আমাদের স্বপ্নপূরণের পথে বাধার শেষ নেই। বিয়ের আগে আমরা নিরাপত্তার অভাবে আর পিছিয়ে থাকা মূল্যবোধের সুবাদে ডানা মেলে ওড়ার সম্মতি ও সাহস কোনোটাই পাই না। আর বিয়ের পর মেয়েদের মাথার ওপর জাঁকিয়ে বসে প্রত্যাশার বোঝা। সেই সব প্রত্যাশার তালিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কথা নেই; বরং আছে গুছিয়ে সংসার সাজানোর কথা। জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে যে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে মেয়েরা, সেসব কাজে লাগানোকেও এই সমাজ ঠিক ‘দায়িত্ব’ ভাবে না; বরং সন্তান জন্মদান করা সমাজের চোখে মেয়েদের ‘প্রকৃত দায়িত্ব’। সমাজের এই প্রত্যাশা ও দায়িত্বের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘প্রাচীনকালে নারীকে শুধু সন্তান জন্মদানের মাধ্যম হিসেবেই দেখা হতো। সেখান থেকেই নারীকে অধীনস্থ করে রাখার প্রথার শুরু। তবে সভ্য, শিক্ষিত সমাজ প্রকৃত শিক্ষা ও মূল্যবোধের উন্নয়নের মাধ্যমে এই আদিম প্রথাকে দূর করতে পারে।’

গোটা পৃথিবী যখন নারীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছে, আমাদের দেশীয় নারীরাও যখন অর্জনের তালিকায় শ্রেষ্ঠ থেকে শ্রেষ্ঠতর মাইলফলক যোগ করছেন, তখনো কেন আমরা এ প্রথা দূর করতে পারছি না? কেন আমাদের সমাজ এখনো মেয়েদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাখতে চায়?

প্রশ্নগুলোর উত্তরে এ আই মাহবুব উদ্দীন আহমেদ দুটো বিষয়কে চিহ্নিত করেন। প্রথমটি হলো পারিবারিক শিক্ষা। তাঁর মতে, ‘এখনো বেশির ভাগ পরিবারে বাবার তুলনায় মায়ের ভূমিকা দুর্বল। কোনো কোনো পরিবারে মায়েরা, নারীরা নিগৃহীত, বঞ্চিত, এমনকি নির্যাতিত। ফলে নারীকে নিয়ন্ত্রণাধীন রাখার যে আদিম প্রবণতা, সেটি শৈশবেই আমাদের মূল্যবোধের অংশ হয়ে যাচ্ছে।’

এ আই মাহবুব উদ্দীন আহমেদের উল্লিখিত দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, শিল্প, সাহিত্য ও সংবাদমাধ্যমের প্রভাব। বলিউডের সিনেমায় নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সেই প্রাচীনকাল থেকে শিল্প, সাহিত্য, সংবাদমাধ্যমে বেশির ভাগ সময়ে নারীর উপস্থিতি কেবল সৌন্দর্যের উপকরণ হিসেবে। এই উপস্থাপনের ধারা আমাদের অজান্তেই সমাজকে সম্মিলতি এক অজ্ঞানতার (কালেকটিভ আনকনশাসনেস) দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই অজ্ঞানতার ফলে আমরা নারীকে “মানুষ” হিসেবে ভাবতে পারি না, আমাদের কাছে নারী হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণযোগ্য, অধীনস্থ এক উপকরণ মাত্র।’

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার এক পর্যায়ে তাসফিয়া বলেছিলেন, ‘ইউরোপে পড়ার সময় আমি বিভিন্ন দেশ ঘুরেছি। এ নিয়ে আমার স্বামী বা পরিবারের কোনো নেতিবাচক মনোভাব না থাকলেও, আত্মীয়-প্রতিবেশীরা আমাকে মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি যে স্বামী-সংসার ফেলে এভাবে আনন্দ করা ঠিক হচ্ছে না।’

সত্যি তো তাই, স্বামী ও সংসারের বাইরেও যে নারীদের জীবনের কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে, স্বামী ও সংসার ছাড়াও যে নারীর আনন্দের কোনো উপলক্ষ হতে পারে, তা আমাদের সমাজ মানতে নারাজ। ১৯৭৪ সালে লেখা বিশ্বখ্যাত সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন উপন্যাসে বুচি এমেচেতাও এমন বিষয় তুলে ধরেছিলেন। তৎকালীন সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘নারী হলো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’। ২০২১-এ দাঁড়িয়েও উচ্চশিক্ষায় পাড়ি জমানো নারীদের অভিজ্ঞতা শুনে মনে হয়, আমরা এখনো সেই দ্বিতীয় সারিতেই পড়ে আছি। পরিবর্তনের ঢেউ হয়তো এসেছে, তবে তাতে জোয়ারের চেয়ে ভাটার টান এখনো তীব্র।

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন