হুটহাট বিচ্ছেদ নয়। দাম্পত্য টিকিয়ে রাখতে দরকার সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা। মডেল: বাপ্পা ও জুঁই
হুটহাট বিচ্ছেদ নয়। দাম্পত্য টিকিয়ে রাখতে দরকার সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা। মডেল: বাপ্পা ও জুঁইছবি: কবির হোসেন

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনের কাঙ্ক্ষিত পর্যায় হলো বিয়ে। সুখের সংসার হবে, দুজনে হবে দুজনার। হেসেখেলে, ঘুরেফিরে রোমান্টিক জীবন যাপন করবে, এমন স্বপ্ন থাকে সবার মনে। মা–বাবা সন্তানের সুখের জন্য সামর্থ্যমতো টাকা খরচ করে সন্তানদের দুই জোড়া হাত এক করে দেন। যাতে তারা ভালো থাকে। জীবনে সুখের জয়যাত্রার কেবল শুরু। কিন্তু এরই মধ্যে অনেক দাম্পত্যে দেখা দেয় অসুখ। ঘটা করে আয়োজন করা অনেক বিয়েও প্রথম বিবাহবার্ষিকী আসার আগে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আদ্যিকাল থেকেই সুখ-অসুখ চলছে পাশাপাশি। কিন্তু কোনো কোনো সুখসন্ধানী সংসারে দুই হাতের উষ্ণ স্পর্শ অল্প দিনের মধ্যেই কেমন যেন শীতল হয়ে যাচ্ছে। বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ছে। কিন্তু কেন?

বিজ্ঞাপন

কেস স্টাডি: ১

মা ও মেয়ে দুজন চেম্বারে এলেন। মেয়ের মুখ ভারী। মা স্বাভাবিক। মা নিজে থেকেই জানালেন, তাঁর মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে পারছেন না। মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার সঙ্গে কি কেউ খারাপ ব্যবহার করে? অত্যাচার করে? মেয়েটি বলল, না। সবাই ভালো। স্বামী, শাশুড়ি, দেবর, জা, ভাশুর—সবাই ভালো। কিন্তু সমস্যা আমার।

কী সমস্যা?মেয়েটি বলল, আমার স্বামীকে সন্দেহ হয়। কী ধরনের সন্দেহ? সে বলল, আমার মনে হয়, আমার স্বামীর তার ভাতিজির সঙ্গে সম্পর্ক আছে। আমি জানি, যা ভাবছি তা ঠিক নয়। কিন্তু কিছুতেই মন থেকে চিন্তা দূর করতে পারছি না। সারাক্ষণ তার সঙ্গে ঝগড়া করতে থাকি। একই কথা বারবার বলতে থাকি। ঝগড়া করে বাবার বাড়ি চলে এসেছি। ভাতিজির সঙ্গে কথা বলেছি, গল্প করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু নিজের কাছে হেরে গেছি। এখন লজ্জা লাগে। আমার মা–বাবাও ওদের পক্ষে। এভাবে বেশ কয়েকবার রাগারাগি করে চলে এসেছি। স্বামী এখন আমার ওপর বিরক্ত। সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। এবার চিকিৎসা করে যেতে বলেছে। ভালো না হলে অন্য চিন্তা করতে বলেছে আমার মা–বাবাকে।

এখানে বলে রাখাই ভালো, আসলে মেয়েটি অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি) রোগে ভুগছে। ওসিডি বা শুচিবাই রোগের কারণে এমন হাজার হাজার মানুষ ভুগছে। বেশির ভাগই বুঝতে পারে না, কী রোগ! সংসার ভেঙে যাচ্ছে। ভুল–বোঝাবুঝি বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

কেস স্টাডি: ২

ভদ্রমহিলা এক বড় প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক। স্বামী প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ছেলে প্রকৌশলী। ভালোবেসে বিয়ে করেছে এক মেধাবী চিকিৎসককে। মেয়েটি এমবিবিএস শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। বিয়ের বছর না ঘুরতেই প্রেমের বিয়েতে বাসা বাঁধল অসুখের ঘুণপোকা। শাশুড়ি শর্ত দিলেন, তিনি ছেলের বউকে চাকরি ও পড়াশোনা করতে দেবেন না। তাঁর কথা, মেয়েটির শ্বশুর-শাশুড়ির এত টাকাপয়সা। তার চাকরির কী দরকার। প্রেমিক সেই ছেলে ও ছেলের বাবাও একজোট। তারাও মেয়েটির চাকরি চায় না। মেয়েটি নাছোড়বান্দা। ভেঙে যায় কথিত প্রেমের সংসার।

বিজ্ঞাপন
আমার মেয়ে তার সন্তানকে ঠিকমতো দেখাশোনা করতে পারছে না। ঘুম, খাওয়াদাওয়া কোনোটাই ওর ঠিকমতো হচ্ছে না। উল্টাপাল্টা কথা বলছে। বাচ্চার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আর কাঁদে। বলে, বাচ্চাকে মেরে ফেলে সে–ও মরে যাবে। সে মনে করে, কেউ তার আপন নয়। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে আমাদের ফোন দিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসতে বলেছে। তবে নাতিকে দেবে না।

কেস স্টাডি: ৩

এবার একজন মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা বেশ আলুথালু বেশে চেম্বারে ঢুকলেন। তিনি বললেন, আপা, আমার মেয়ের সংসার বাঁচান। সমস্যা হলো, বিয়ের বছর না ঘুরতেই নাতির মুখ দেখলাম। দুই পরিবারের সবাই খুশি। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন বউ, নাতি নিয়ে গেল ঠিকই। কিন্তু আমার মেয়ে তার সন্তানকে ঠিকমতো দেখাশোনা করতে পারছে না। ঘুম, খাওয়াদাওয়া কোনোটাই ওর ঠিকমতো হচ্ছে না। উল্টাপাল্টা কথা বলছে। বাচ্চার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আর কাঁদে। বলে, বাচ্চাকে মেরে ফেলে সে–ও মরে যাবে। সে মনে করে, কেউ তার আপন নয়। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে আমাদের ফোন দিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসতে বলেছে। তবে নাতিকে দেবে না। সুস্থ হলে পরে কথা বলবে।

মেয়েটি প্রসবোত্তর সাইকোসিস টাইপের মানসিক রোগে ভুগছে। চিকিৎসা করলে এ অসুখ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। বাচ্চা, সংসার সবই রক্ষা পায়। অথচ অজ্ঞানতা আমাদের অন্ধ করে রেখেছে।

একজন চিকিৎসক হিসেবে কিছু ডাক্তারি গল্প বললাম। এর কারণ হলো, প্রতিটি বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে কারণ থাকে। আমরা সেসব কারণ অনেক সময় খতিয়ে দেখি না। অসচেতন থাকি। অনেক সময় কারণ বুঝতে পারি না। শুধু পারস্পরিক দোষারোপের মধ্যে চক্রাকারে ঘুরে সুখের সংসারকে অসুখী করে তোলা হয়। যার শেষ পরিণতি ঘটে বিচ্ছেদে।

প্রতিটি বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে কারণ থাকে। আমরা সেসব কারণ অনেক সময় খতিয়ে দেখি না। অসচেতন থাকি। অনেক সময় কারণ বুঝতে পারি না। শুধু পারস্পরিক দোষারোপের মধ্যে চক্রাকারে ঘুরে সুখের সংসারকে অসুখী করে তোলা হয়। যার শেষ পরিণতি ঘটে বিচ্ছেদে।
বিজ্ঞাপন

বিচ্ছেদের নানা কারণ

নেশা, পর্নোগ্রাফি, মোবাইল, পরকীয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটা বড় সমস্যা। নেশা মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। শুধু মাদকই নয়, আসক্তি অনেক রকমের হতে পারে। আসক্তির ব্যাপারে পরিবারের লোকজনকে সচেতন হতে হবে। নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা কমাতে হবে। বিয়ে জীবনের একটা গুরত্বপূর্ণ অধ্যায়। মা–বাবা, ভাই-বোনের সঙ্গে মানুষ ১৮-২০ বছর অবিচ্ছেদ্য আবহে কাটায়। জীবনের বাকি অংশ কাটায় স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে একই ছাদের নিচে। কাজেই বন্ধন বেশি দেখা যাচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর অংশে। কিন্তু বর্তমান সমাজে কোনো কোনো পরিবারে ভাঙনের সুর বিয়ের বছরখানেকের মধ্যেই বাজতে শুরু করে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ প্রবণতা আগে এতটা ছিল না।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এক দশক আগে ৭০ শতাংশ বিচ্ছেদ হতো ছেলের দিক থেকে। আর সাম্প্রতিক কালে ৮০ শতাংশ বিবাহবিচ্ছেদ হয় মেয়েপক্ষ থেকে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে গত ৬ বছরে ৫০ হাজার বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় একটি বিচ্ছেদ মামলা হয়। খুলনা সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যান বলছে, গত সাড়ে ১০ বছরে প্রতি ১০টি বিচ্ছেদ আবেদনের মধ্যে ৭টিই হয়েছে মেয়েপক্ষ থেকে।

বিজ্ঞাপন

বিচ্ছেদের কারণ

মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন, বিত্তবৈষম্য, কুসংস্কার, অজ্ঞানতা ও অশিক্ষার কারণে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। দম্পতির কেউ একজন পেশাগত কারণে দূরে অথবা প্রবাসে থাকলে নিজেদের অজান্তেই দূরত্ব বাড়ে। এ ছাড়া যৌন বিকৃতি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে এর জন্য দায়ী মনে করা হয়। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অর্থনৈতিক উন্নতি অনেক ক্ষেত্রে স্বামী বা তার পরিবারের চক্ষুশূল। অনেক বিবাহবিচ্ছেদে এই মানসিক সংকট ও টানাপোড়েন প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।

তবে মানসিক রোগের কারণে কত যে ডিভোর্স হচ্ছে, তার কোনো হিসাব নেই। এর মধ্যে ওসিডি, বাইপোলার, পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, মাদকাসক্তি অন্যতম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমাজে প্রবল অসচেতনতা কাজ করে। মাদকাসক্তে যেখানে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করা প্রয়োজন, অদ্ভুত এক বিশ্বাসে উল্টো এসব রোগীকে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় করণীয়

  • বিবাহবিচ্ছেদের আগে কেন তারা বিয়ে ভাঙতে চাইছেন, সে কারণ খুঁজতে হবে। আগে পরিবারের সদস্যরা মিলে আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে সুরাহার চেষ্টা করতেন। জ্যেষ্ঠ স্বজনেরা এ ক্ষেত্রে দুর্দান্ত ভূমিকা দেখাতেন। এটা কিন্তু সব সময়ই বিচ্ছেদ ঠেকানোর ভালো কৌশল। এ চর্চা সব পরিবারে থাকা দরকার।

  • একটি পরিবারের বৃহৎ পরিসরে বন্ধন অটুট না থাকলে উপকার পাওয়া যায় না। এখন নগরে, মহানগরে মূল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছোট পরিবার বাড়ছে। এ ধরনের সংসারে বিচ্ছেদ আসন্ন হলে পরিবারের অন্যদের পরামর্শ নিতে পারেন। পেশাদার মনোরোগ চিকিৎসক ও কাউন্সেলরদের কাছেও যেতে পারেন।

  • একে অপরকে সন্দেহ করার আগে তার কারণ খুঁজে বের করুন। অকারণ সন্দেহ নয়।

  • দুজনই পরিবারে সময় দিন। ভালোবাসা বাড়ান দুজনের মধ্যে।

  • সুস্থ, সুন্দর, উন্নত সমাজ গঠনে পুরুষের উচ্চশিক্ষা, আয়–উন্নতি যেমন কাঙ্ক্ষিত; তেমনি নারীর উচ্চশিক্ষা ও আয়-উন্নতি কাঙ্ক্ষিত। পরিবারে পুরুষের ক্ষমতায়ন যেমন ইতিবাচক, তেমনি নারীর ক্ষমতায়নও ইতিবাচক। নারীর উন্নতি বিবাহবিচ্ছেদের কারণ নয়। পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলুন। নারীর উন্নতি একটি পরিবারের ভিত্তিকে মজবুত করে।

  • দাম্পত্যে কোনো সমস্যাকে বড় করে দেখার আগে আত্মবিশ্লেষণ ও উপলব্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করুন। আপনার কী কী ভুল আছে, সেটাও বুঝুন। দুই পক্ষের ভুলগুলো নিয়ে নিজেরাই বসুন। আলোচনা করুন। নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার অঙ্গীকার করুন এবং চেষ্টা করুন। তারপর অন্য পক্ষের ভুল শোধরানোর তাগাদা দিন।

  • দম্পতির কাছের স্বজনেরাও দুই পক্ষের ভুলগুলো আমলে নিন। আপনার সন্তানের ভুলত্রুটিগুলো শোধরাতে বলুন। একের ভুল অন্যের ওপর চাপিয়ে বা কোনো ভুল ধামাচাপা দেবেন না। দুই পরিবার একত্রে বসার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সমস্যা দেখা দেয়। এতে সংসার জোড়া লাগার বদলে ভেঙে যায়।

  • অনেক সময় বিবাহবিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে ওঠে অবুঝ ভুলের জন্য। সেসব আমলে নিন। সামলে চলার চেষ্টা করুন।

  • সারা বিশ্বের মনোবিদেরাই সুস্থ সংসারের পক্ষে। বিবাহবন্ধন অপূর্ব এক সুরক্ষা, আত্মরক্ষা; জীবনগতির সচল সক্ষম চাকা। এই সংসার নির্বন্ধ এখনো বিশ্বজুড়ে জীবনযাপনের সেরা ও অব্যর্থ টনিক। বিবাহবন্ধনের মধ্যেই আছে যৌথ মুক্তির আশ্বাস। এ বিশ্বাসকে মজবুত করুন।

  • ইউরোপীয় এক মনোরোগ চিকিৎসকের মোক্ষম কথা হলো, ‘ভাঙার জন্যই তো সংসার ভাঙছ না। ভাঙছ নতুন কিছু গড়ার জন্য। আবার শুরুর জন্য। যদি তা–ই হয়, তবে যে ভিত্তি এত দিন ধরে তিলে তিলে গড়ে তুললে, সেটা আরও মজবুত করে নিচ্ছ না কেন!’

ডা. সুলতানা আলগিন : সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ এবং ওসিডি ক্লিনিক কনসালট্যান্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

মন্তব্য পড়ুন 0