দাম্পত্য জীবন সুখী করতে দুজনকে দুজনের বোঝা চাই। মডেল: শুভ ও জারা
দাম্পত্য জীবন সুখী করতে দুজনকে দুজনের বোঝা চাই। মডেল: শুভ ও জারাছবি: সুমন ইউসুফ

বন্ধুদের আড্ডায় হঠাৎ আরিফকে দেখে অবাক সবাই। ছোটবেলা থেকে এই আড্ডার মধ্যমণি আরিফ, অথচ বিয়ে করার পর থেকে গত পাঁচ মাসে এক দিনও পাওয়া যায়নি তাঁকে। একজন তো হাঁক দিয়ে বলেই বসল, ‘কী হে সোনার হরিণ, আজ এলে যে।’ লজ্জা পেয়ে একটু হেসে আরিফ জবাব দেন, ‘বউ আজ বাপের বাড়ি গেছে।’ ঘটনা হচ্ছে বিয়ের পর থেকেই আরিফের স্ত্রী সোমার কথা ‘সন্ধ্যাবেলা আড্ডা দিতে যাবে না। এখন সংসার হয়েছে, এখানে মনোযোগ দাও।’ নতুন সংসারজীবনে অশান্তি এড়াতেই চুপচাপ তা মেনে নিয়েছেন আরিফ।

নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, নতুন অভ্যাস নিয়ে শুরু হয় নতুন সংসার। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায় বলতে হয় ‘সংসার মানে অপেক্ষমাণ এক জোড়া চোখের দাবি, সংসার মানে সাজানো ভুবন, আঁচলের খোঁটে চাবি।’

আসলে এই সাজানো ভুবনের ভালোবাসার টানেই সুতো বাঁধে সংসারে। তবে সুতোয় বেশি টান দিলে তা ছিঁড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। দীর্ঘদিন প্রেম করে বিয়ে করার পরও দেখা যায় ভিন্ন রকম হয়ে যায় সম্পর্ক। সংসারে নিয়মশৃঙ্খলা লাগে। তবে তার মানে এটা নয় যে একে অপরের ওপর কর্তৃত্ব আরোপ করতে হবে। বিয়ের পরে প্রত্যেক মানুষের জীবনেই পরিবর্তন আসে। নতুন দায়িত্ববোধ জন্মায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অত্যধিক অধিকারবোধ বা অকারণ আশঙ্কা থেকে এক সঙ্গী অপর সঙ্গীর ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছেন। অনেকে মনে করেন, যাঁর সঙ্গে সম্পর্ক তাঁর ওপর অধিকার শুধু তাঁর একার।

পরিবারের পছন্দে রুনা ও তানভীরের বিয়ে হলেও তাঁরা পূর্বপরিচিত। পড়াশোনার সূত্রে দুজনেরই আলাদা আলাদা বন্ধুমহল রয়েছে। তবে রুনার বন্ধুদের দিয়ে খুব আপত্তি তানভীরের। এমনকি কেউ ফোন করলেও খুব বিরক্ত হন। প্রায়ই ঝগড়া বাধে দুজনের। ‘অমুক ভাইয়ের সঙ্গে তোমার এত কী কথা? অমুকের অনুষ্ঠানে কেন যেতে হবে।’ আরিফের কর্তৃত্বের চাপে তটস্থ রুনা। দিন দিন এই সমস্যা বেড়েই চলে, যা তাঁদের সংসারজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাধ্য হয়ে রুনাও আরিফের কথা মেনে নেন। একই রকম ঘটনা দেখা যায় সাইফ ও তুলির সংসারেও। বিয়ের পর সাইফ তুলির কাছে ফেসবুকের পাসওয়ার্ড চান। বিষয়টাতে প্রচণ্ড রেগে যান তুলি। তবে সাইফের এক কথা, ‘আমি তোমার স্বামী, তুমি আমার কাছে কেন গোপন করবে।’

সংসারে নানা দিক দিয়ে এই কর্তৃত্ব বিষয়টি চলে আসে। প্রায়ই দেখা যায় বিয়ের পর সঙ্গীর চলাফেরা, পোশাক–আশাক, কার সঙ্গে মিশবে বা না মিশবে—এসব কিছুর ওপর অধিকার ফলায় অপর সঙ্গী। ‘এই পোশাক পরা যাবে না, এভাবে বসো না, ওভাবে খেয়ো না, এই বাজারটা করলে কেন, ওকে টাকা দেবে না, ওর সঙ্গে ব্যবসা কোরো না, এই চাকরি করা যাবে না, এমন নানা রকম কর্তৃত্বের চাপ আসে দুই পক্ষ থেকেই। অনেক ক্ষেত্রেই তা রূপ নেয় বড় ধরনের পারিবারিক কলহে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা আর বন্ধুর মতো থাকে না। সম্পর্কের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপারটা হারিয়ে যায়। হয়তো চাপে পড়ে, মন রক্ষার তাগিদে একজন মেনে নেন, কিন্তু সম্পর্কে সম্মানের জায়গাটা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। তাই বলা যায়, সংসারে স্বামী ও স্ত্রী কাউকেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। ‘তার কাছে কেন সম্মতি চাইব? তাকে কেন সব বলব’—এভাবে না ভেবে বরং দুজনের বোঝাপড়াটা জরুরি। প্রতিটি সম্পর্কেই একটা সীমারেখা থাকে। যেকোনো সম্পর্কেই মনে রাখতে হবে কতটুকু আমি একজনকে বলতে পারি কিংবা কতটুকু তার ওপর নিজের সিদ্ধান্তটা প্রয়োগ করা যাবে, এর ওপরেই সম্পর্কের ভালো-মন্দ ব্যাপারটা নির্ভর করে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহমেদ হেলাল বলেন, ‘কর্তৃত্ব হলো একটি পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষা (অবজারভেশন লার্নিং)। শিশুরা ছোটবেলায় মা–বাবার কাছ থেকে শেখে, বড় হয় সে একই রকম আচরণ করে। আবার তাঁর সন্তানও তাঁর থেকে বিষয়টি শেখে। আসলে পরিবারের মতামত প্রকাশের বিষয়টি কীভাবে হচ্ছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সহমর্মিতার বিষয়টি প্রকাশ পায়। স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একে অপরকে মানসিকভাবে আঘাত না করে নিজের মত প্রকাশ করা।’

ভালো লাগা বা মন্দ লাগার অনুভূতি প্রকাশে আসলে বাধা নেই, তবে তা অপর সঙ্গী কীভাবে নেবে, সে বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। প্রতিটি সম্পর্কে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার থাকে, যা প্রত্যেকেরই মূল্যায়ন করা উচিত। এ ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সমস্যাগুলোর সমাধান করা উচিত। না হলে জীবনে বিষণ্নতা বা অনিরাপদ বোধ চলে আসে। কর্তৃত্বের ব্যাপারটা যে ভালো লাগেনি, স্পষ্টভাবে এটা বুঝিয়ে বলতে হবে সঙ্গীকে। এটা বলার জন্য সুসম্পর্কের সময়টা বেছে নেওয়া যেতে পারে। কোনোভাবেই উত্তেজিত হওয়া যাবে না। না হলে সংঘাত অনিবার্য।

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন