default-image

প্রতিদিনের রান্নায় অপরিহার্য উপকরণ হলো তেল। তবে এর ব্যবহার নিয়ে রয়েছে নানা মতপার্থক্য। খাবারের স্বাদ বাড়াতে তেলের যেমন ভূমিকা রয়েছে, বেশি তেলে রান্না নিয়ে তেমন আছে ভয়। খাবারে তেলের উপকারিতা বা অপকারিতা নিয়ে এখন অনেকেই মাথা ঘামান।

প্রচলিত তেলগুলোর মধ্যে কোনটি খাওয়া উচিত আর কোনটি উচিত নয়, এ বিষয়েও চাই সচেতনতা। শর্ষে, সয়াবিন কিংবা পাম থেকে তৈরি তেলই বেশি ব্যবহৃত হয় আমাদের দেশে। তবে কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে জনপ্রিয় হতে শুরু করছে ধানের কুঁড়ার (রাইস ব্র্যান) তেল। ধানের তুষ আলাদা করে ফেললে যে চাল পাওয়া যায়, তার ওপর একটি খোসা থাকে। সেই খোসাই কুঁড়া বা রাইস ব্র্যান। বিশেষ উপায়ে এই কুঁড়া পিষে তেল পাওয়া যায়। এই তেলে ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান। তবে নেই ক্ষতিকর ফ্যাট। তাই রান্নায় ভাবনাহীনভাবে ব্যবহার করতে পারেন ধানের কুঁড়ার তেল।

বিজ্ঞাপন

২০০৫ সালে আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন-এ প্রকাশিত এক গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী রাইস ব্র্যান তেল প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া এই তেলে প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। আর স্থূলতার জন্য যেসব উপাদানকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়, তার মধ্যে অন্যতম মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট রাইস ব্র্যান তেলে একদমই থাকে না।

সাজেদা ফাউন্ডেশন হাসপাতালের পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান বলেন, ‘অন্য যেকোনো তেলের তুলনায় রাইস ব্র্যান অয়েল ভালো, তবে বাজার থেকে দেখেশুনে কিনতে হবে। রান্নায় পরিমাণেও কম লাগে এই তেল। রান্নায় নিয়মিত এই তেল খাওয়ার অভ্যাস করলে বাতসহ যেকোনো শারীরিক ব্যথা কমে যায়। ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগসহ নানা ধরনের সমস্যায় অত্যন্ত উপকারী রাইস ব্র্যান অয়েল।’

ধান থেকে চাল তৈরি করলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ কুঁড়া পাওয়া যায়। আর কুঁড়ায় ২০ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পাওয়া যায়। সেটাকে পরিশোধনের পর বোতলজাত করে বিপণন করা হয়। গড়ে সাড়ে ৬ কেজি কুঁড়া থেকে ১ লিটার তেল তৈরি করা যায়। কুঁড়া সরাসরি পশুখাদ্য তৈরিতে আর কুঁড়া থেকে উৎপাদিত তেল মানুষের খাদ্যে ব্যবহার করা হয়। এই কুঁড়া ফার্মেন্টেশন করে তারপর শুকিয়ে ব্যবহার করলে এর ক্ষতিকর উপাদান কমে, খাবারের গুণাগুণ বৃদ্ধি করে। হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য উপকারী কোনো তেলের কথা বলতে গেলেই রাইস ব্র্যানের কথা আগে আসবে।

বাংলাদেশের এডিবল অয়েল লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ বিপণন ব্যবস্থাপক ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘ভারতের মিনিস্ট্রি অব হেলথ এবং ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ২০০৮ সালে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে প্রতি ১০০ গ্রাম রাইস ব্র্যান অয়েলে ১০০০ মিলিগ্রাম ওরাইজেনল রাখার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। তাই ভোক্তাদের উচিত রাইস ব্র্যান অয়েল কেনার আগে অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া জরুরি, প্রতি ১০০ গ্রাম রাইস ব্র্যান অয়েলে ১০০০ মিলিগ্রাম পরিমাণে ওরাইজেনলের উপস্থিতি রয়েছে কি না।’

গবেষণায় দেখা গেছে, রাইস ব্র্যান তেল আনুমানিক ১৪৪ ঘণ্টা ধরে রান্না করলেও ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের (এফএফএ) পরিমাণ প্রায় একই থাকে।

বিশেষ করে কোনো তেলে ফাস্ট ফুডজাতীয় খাবার ভাজার পর দ্বিতীয় দফায় সেই তেলে কিছু ভাজা ঠিক স্বাস্থ্যসম্মত না। তবে রাইস ব্র্যান তেলে ভাজলে সেটা আপনি পুনরায় ব্যবহার করার সুবিধা নিতে পারেন। কারণ, রাইস ব্র্যান তেলে তখনো গুণমান অনেকটা ঠিক থাকে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে এই তেলে কোনো কোলেস্টেরল নেই। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রাইস ব্র্যান অয়েলের স্বাস্থ্যগত সুবিধা ও রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া এতে রয়েছে ওরাইজেনল, গামা ওরাইজেনল, ভিটামিন ই, টোকো ট্রাইনলস, গামা ও ডেল্টা টাকো ট্রাইনলস, ফাইটিক এবং ফেরলিক অ্যাসিড, ওলিয়িক অ্যাসিড এবং লিনোলিক অ্যাসিড, ওমেগা–৬ ও ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ইত্যাদি। মানবদেহে এগুলোর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব নেই।

  • রাইস ব্র্যান তেলে আনুপাতিক হারে ওমেগা–৬ বেশি থাকে এবং ওমেগা–৩ কম থাকে। এ ভারসাম্য রক্ষার ফলে ডায়াবেটিস, ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়।

  • এই তেলে প্রাকৃতিক গুণসম্পন্ন উচ্চমানের ভিটামিন ই তরল অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেহের ফ্রি রেডিক্যাল প্রতিরোধ করে এবং ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে।

  • এই তেলে প্রচুর প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে বিধায় চর্মরোগ প্রতিরোধ করে ত্বকের মসৃণতা বৃদ্ধি করে।

  • রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রেখে রক্তচাপ কমায় এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে পরিচিত ভিটামিন ই গোত্রের টোকো ট্রাইনলসও রয়েছে এই তেলে; যা কার্ডিওভাস্কুলার রোগ প্রতিরোধ করে।

  • ওরাইজেনল থাকায় এই তেলে, অধিক তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় রান্না করলেও এফএফএর পরিমাণ প্রায় একই থাকে। এই তেল রান্নায় কম ব্যবহার করলেও চলে।

  • ওরাইজেনল একধরনের অতি উচ্চমানের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি দেহের বিপাকক্রিয়া উন্নত করতে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে এটি দেহের ওজন কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। ওরাইজেনল খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায়, ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়ায় এবং শরীরে কম কোলেস্টেরল তৈরি হতে দেয়।

  • বয়স্ক নারীদের মেনোপজের প্রভাব কমাতে রাইস ব্র্যান অয়েল ভূমিকা রাখতে পারে।

  • রাইস ব্র্যান অয়েলের আঠালো ভাব কম। এ কারণে এটি খাবারে আটকে থাকে না। ফলে খাবারের তৈলাক্ত ভাব কম হয় ও সহজে তেল ঝরানো যায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0