default-image

জীবনে একটা মিনিটও কাজ ছাড়া বসে থাকিনি কখনো। আর এখন? ‘বসে থাকা’র সময়গুলো পার করার জন্য ‘কাজ’ খুঁজে বের করি আমি। জীবনটা যে বদলে গেছে আমার। আগে নিয়মিতই ভোর সাড়ে চারটা-পাঁচটার দিকে দিন শুরু হতো আমার। নাচের ক্লাস, নাটক, কবিতার মহড়া—এসব নিয়ে দারুণ ব্যস্ততায় কাটত দিন, যখন সুস্থ ছিলাম। আর এখন বসে থাকতে হয়, হাঁটতে খুব কষ্ট হয়। কখনো দেয়াল ধরে হাঁটি। পারলে গাছের একটু পরিচর্যা করি কিংবা ঘরের টুকিটাকি কাজ করতে চেষ্টা করি। কখনো কবিতা লিখি, সুন্দর কোনো সিনেমা খুঁজে দেখি। আগের সেই ব্যস্ততা, সেই কর্মপরিসরের কিছুই নেই। জীবনই বদলে গেছে। আর এই বদলটা খুব কষ্টের। ক্যানসারকে বন্ধু বানিয়ে বশে আনার চেষ্টা করছি।

যেভাবে বদলে গেল দিন

শুরু থেকেই বলি আমার বদলে যাওয়া জীবনের গল্প। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের কথা। স্তনে অনুভব করলাম ছোট্ট একটা বিচির মতো গোটা। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলাম। করোনা মহামারির সময় বলে শুরুতে ভিডিও কলের মাধ্যমে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলো। এরপর করা হলো নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। চিকিৎসক জানালেন, আমার ক্যানসার হয়েছে। রোগনির্ণয়ের পর শুরু হলো রোগের বিরুদ্ধে আমার যুদ্ধ।

ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচবার কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে। কেমোথেরাপি নেওয়া খুব কষ্টের, এটা জানতাম। কিন্তু সেই কষ্ট যে এতটা তীব্র, তা জানতাম না। বাহ্যিক কিছু পরিবর্তনও এসেছে। প্রথমবার কেমোথেরাপি নেওয়ার সপ্তাহ দুই পর হঠাৎ চুলের গোড়ায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলাম, আলতো করে হাত দিলাম মাথায়। মুঠো ভরে চুল এল। চুল পড়ে যাচ্ছে। এরপর চুল কামিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। নখগুলো কালো হয়ে গেল। তবে বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়িনি, জীবনের মূল্য তো অনেক বেশি। এখন চুল ছাড়া হলোই নাহয় অন্য রকম একটা ‘লুক’, সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর আবার তো চুল গজাবে।

খাবার খেতে না পারা, মুখে সংক্রমণ, গলায় সংক্রমণ, বমি, দুর্বলতা—নানান রকম কষ্ট। তবে শেষ দুবার কেমোথেরাপি নেওয়ার পর ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। প্রচণ্ড ব্যথা হয়, উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক প্রয়োজন হয়। তবে কেমোথেরাপি–পরবর্তী শারীরিক অবস্থায় চিকিৎসকেরা সন্তুষ্ট। অবশ্য আরও একটি কেমো এখনো বাকি, সেটার পর আবার পরীক্ষা করে দেখা হবে এবং অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হবে। রেডিওথেরাপিও প্রয়োজন হবে বলে চিকিৎসক জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

যে জীবন যাপন করছি

আগে নানান কাজে ডুবে থাকতাম। এখন কানাডার শীতের এই বিশাল রাতগুলো কাটাতেই কষ্ট হয় আমার। শরীরে জ্বালাপোড়া করে, ঘুমাতে কষ্ট হয়। ব্যথায় মেঝেতে গড়িয়ে কেঁদেছি কত রাত। এ দেশে (কানাডা) আমার কয়েকজন আত্মীয়স্বজন রয়েছেন, তবে মহামারি পরিস্থিতিতে তাঁরা তেমনভাবে আসতে পারেননি আমার কাছে। একসময় খুব ভেঙে পড়েছিলাম। যন্ত্রণাক্লিষ্ট অবস্থার একপর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তাও এসেছে আমার মনে। কিন্তু আমি জানি, জীবন কত মূল্যবান। এমন কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি বলেই জীবনের মূল্য আরও বেশি করে বুঝতে পারছি। সবার সঙ্গে নির্দ্বিধায় ভাগ করে নিতে পারছি আমার যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা। সুস্থ অবস্থায় যত দূর সম্ভব, চেষ্টা করেছি মানুষের জন্য কিছু করতে। আবার সুস্থ হলে নিশ্চয়ই মানুষের জন্য আরও বেশি করে নিজেকে সঁপে দেওয়ার চেষ্টা করবে।

ক্যানসার হয়েছে বলেই ভেঙে পড়তে হবে?ক্যানসার মানেই কি জীবনের শেষ? নিশ্চয়ই নয়। ক্যানসারের চিকিৎসা আছে। চিকিৎসায় ক্যানসার ভালো হয়। তবে চিকিৎসার প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টকর। তাই মনে জোর রাখতে হবে। জীবনে বিপদ আসতেই পারে, তাই বলে বিপদের মোকাবিলা করব না? লড়তে হবে অবশ্যই। মন থেকে হেরে গেলে চলবে না। শুধু আমিই নই, সব ক্যানসার রোগীর জন্যই বিষয়টা এমন।

default-image

জানুন, সচেতন হোন

ক্যানসার ধরা পড়া কিন্তু কোনো অভিশাপ নয়। বরং যার রোগ ধরা পড়ল, তিনি ভাগ্যবান। তিনি চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন, লড়াইয়ে নামতে পারছেন। ক্যানসার ধরা পড়ার পর বদলে যাওয়া জীবন অবশ্য খুব সহজে আগের অবস্থায় ফেরে না। যেমন আমি হয়তো আগামী এক-দুই বছর আর আগের মতো করে কাজ করতে পারব না। কিন্তু জীবন এভাবে বদলে যাচ্ছে বলে ভেঙে পড়া যাবে না। সুস্থ জীবনে ফেরার জন্য চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আর সুস্থ হয়ে গেলে নিজের পুরোনো কাজে ফেরার সুযোগ যেমন থাকে, তেমনি থাকে নতুন ধরনের ভালো কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগও।

‘ক্যানসার’ শব্দটাতেই অনেকের মনে একধরনের ঋণাত্মকভাব তৈরি হয়। অথচ ক্যানসার কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। ক্যানসার হওয়াটা কোনো লজ্জার বিষয়ও নয়। ক্যানসার রোগীর নিজের চেহারা বদলে যাওয়া, লাবণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হওয়া, জীবনধারায় চলে আসে এমনই নানান কষ্টকর পরিবর্তন। তাই এসব নিয়ে কথা বলতে সংকোচ করেন কেউ কেউ। কিন্তু ক্যানসারে আক্রান্ত একজন ব্যক্তিই কিন্তু আরেকজনকে সাহায্য করতে পারেন দারুণভাবে।

চিকিৎসা চলার সময় একজন রোগীর কেমন কষ্ট হয়েছে, তা যদি নতুন আরেকজন রোগী জানতে পারেন, এটাও কিন্তু নতুন রোগীটির জন্য একধরনের মানসিক সমর্থন। একজনের গল্পের সঙ্গে আরেকজনেরটা মিলেও যেতে পারে। চিকিৎসাকালীন কষ্ট সম্পর্কে আমার বন্ধু আমাকে বলতেন। অনলাইনেও ক্যানসার রোগীদের জীবনের গল্প জানা যায়। ক্যানসার মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। দেশের বাইরে ক্যানসারজয়ীদের সংগঠন রয়েছে। এই বিজয়ী যোদ্ধারাই অন্যদের সাহায্য করতে থাকেন, সংগঠনের মাধ্যমে কাজ করতে থাকেন অন্য রোগীদের জন্য। নিজের বিপদে ধৈর্য রাখা, অন্যের বিপদে সাহায্য করার মধ্যেই তো মানবতার প্রকৃত অর্থ লুকিয়ে আছে। তাই ক্যানসারকে জানুন, লড়াই করুন ক্যানসারের বিরুদ্ধে, ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর পাশে থাকুন। মানবতার জয় হোক।

লেখক: নৃত্যশিল্পী, বর্তমানে কানাডাপ্রবাসী

বিজ্ঞাপন
প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন