করোনাকালে নিজেদের বাসার বারান্দায় ক্রিকেটার সৌম্য সরকার ও প্রিয়ন্তী দেবনাথ
করোনাকালে নিজেদের বাসার বারান্দায় ক্রিকেটার সৌম্য সরকার ও প্রিয়ন্তী দেবনাথছবি: শামসুল হক

২০১৭ সালের এক ভোররাতে সৌম্য সরকার প্রেমের প্রস্তাব দেন পূজাকে। তখনো পূজার কাছে সৌম্য শুধু একজন তরুণ, যিনি ‘হ্যান্ডসাম অ্যান্ড টল’। যাঁর ক্রিকেট পরিচিতি তখনো বিশেষ কিছু হয়ে ওঠেনি। আর পূজাও ক্রিকেট খেলা বোঝেন না, খুব একটা দেখেনও না। তার মানে তো তারকা ক্রিকেটার সৌম্য সরকারের লুকানো প্রতিভা ‘ভালো প্রেমিকও’। ফোনের অপর প্রান্তে পূজা হাসলেন, ‘সেটা ঠিক। আমরা এখনো আগের মতো প্রেমিক-প্রেমিকাই আছি। মাঝে সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে আমরা পরিবার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছি।’

পূজার কথায় বোঝা যায় প্রেমের ২২ গজেও ভালো ব্যাটসম্যান সৌম্য সরকার। কিন্তু একটা হিসাব মিলছে না। পূজা যদি ক্রিকেটই না বোঝেন, তাহলে প্রেমটা শুরু হলো কীভাবে? আর কেই–বা প্রথম এসেছিলেন কাছে?

এই প্রশ্নের মীমাংসা যে সহজে করা সম্ভব না, সেটা সৌম্যের কথাতেই পরিষ্কার। ফোনে বলে যান, ‘পূজার আইডি থেকেই আমার কাছে প্রথম নক এসেছিল। তবে সেটা পূজার কাছ থেকে না। পূজার এক কাছের বন্ধু ওর অনুমতি নিয়েই ২০১৬ সালে আমাকে মেসেজ পাঠায়। আমি সেটা তখন খেয়াল করিনি। এক বছর পর সেটা আমার চোখে পড়ে। আমি সেই মেসেজের রিপ্লাই দিই ২০১৭ সালে।’

সৌম্যের মেসেজের রিপ্লাই দিতে পূজা অবশ্য এক বছর সময় নেননি। দ্রুতই মেসেজ পাঠান। ফিরতি মেসেজটায় সৌম্যর নাকি মজাই লেগেছিল। পরে দিলেন ফোন। ওপার থেকে প্রথম প্রশ্ন ‘এত রাতে কেন?’ সৌম্যর তখন শান্ত জবাব, ‘আমিও যখন নক পেয়েছিলাম, সেটা রাতেই ছিল তো, তাই।’ কথা এগোতে থাকে।

সৌম্যের প্রেমে পড়ার ক্ষেত্রে পূজাকে ইন্ধন জুগিয়েছিল আরও একটি বিষয়। সেটা মায়ের প্রতি সৌম্যর ভালোবাসা। তাঁর মতে, ‘যে ছেলে মাকে এত ভালোবাসে, সে নিশ্চয় স্ত্রীকেও ভালোবাসবে।’

বিজ্ঞাপন
default-image

২০১৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর পূজার বোনের বিয়ের রিসেপশন ছিল। ভোররাতে ফোনে কথা বলতে বলতেই সৌম্য জানান, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ পূজা হঠাৎ থেমে যান। কিছুটা সময় নেন। প্রায় ৩০ মিনিট পর হ্যাঁ বলেছিলেন তখনকার এ–লেভেলে পড়ুয়া পূজা।

সৌম্য যে ক্রিকেট খেলেন, পূজা সেটা জানতেন। তবে তাঁর যে এত পরিচিতি, সেটা জানতেন না। আর তাই দেশ–বিদেশে খেলার শিডিউল, খেলা না থাকলে অনুশীলন। এসব ব্যস্ততার ফাঁকে খুব বেশি দেখা হতো না দুজনের। মাঝেমধ্যে গাড়ি নিয়ে লালমাটিয়ায় পূজার স্কুলের সামনে যেতেন সৌম্য। দেখা হতো দুজনের। তবে বিপত্তি হতো মোটরসাইকেল নিয়ে গেলে। বাইকপ্রেমী এই ক্রিকেটার তখন প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন হেলমেট পরেই। এভাবেই চলছিল। আর দশটা প্রেমের মতো সৌম্য-পূজার প্রেমের পর বিয়ে নিয়ে এক দফা বাধা এসেছিল। তবে সেটা বড় কিছু নয়। সৌম্য বলেন, ‘আমি পূজাকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার আগেই বাড়িতে ওর ছবি দেখিয়েছিলাম। সবাই পছন্দ করেছিল।’ অপর দিকে প্রেমের অনেক দিন পর পূজা তাঁর যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বোনকে প্রথম জানিয়েছিলেন। বোনই বাড়িতে বলেছিলেন। পাত্রের কথা শোনার পর বেঁকে বসেন পূজার মা। তাঁর কথা, ‘এই ছেলে তো আজ নাক ফাটিয়ে আসবে, কাল পা ভাঙবে।’

শেষমেশ অবশ্য কোনো বাধাই আটকাতে পারেনি। বিয়ের তারিখ নিয়েও হয়েছিল মহা ঝামেলা। সৌম্য বলেন, ‘একে তো আমার খেলার লম্বা শিডিউল তার ওপর আবার আমাদের শুভক্ষণের বাছাই।’ সব হিসাব মিলিয়ে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখ বিয়ে করলেন সৌম্য ও পূজা। বিয়ের কয়েক দিন পরই সৌম্য চলে যান ক্রিকেট মাঠে, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে।

default-image

ব্যস্ততা থেকে হঠাৎ মেলে অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটি। করোনাকালের ঘরবন্দী সেই সময় কেমন কেটেছে পূজা-সৌম্যর। পূজা বলেন, ‘শুরুতে তো বেশ লাগছিল। খাওয়া, ঘুমানো, ঘুম থেকে ওঠা—কোনো রুটিন ছিল না। তবে কিছুদিন যাওয়ার পর নিজের ফিটনেস ঠিক রাখতে ও (সৌম্য) বাসায় শরীরচর্চা শুরু করে। আমি রান্নাবান্নায় হাত পাকানোর চেষ্টা করেছি। শাশুড়ি ও মায়ের কাছে শুনে, ভিডিও দেখে বিভিন্ন রান্না করেছি।’

রান্নার চেষ্টা সৌম্যও করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবিও অনেকে দেখেছেন। তবে প্রথমবার বানানো সেই ডিম–পরোটায় হালকা লবণ কম হওয়া ছাড়া আর কোনো খুঁত ধরা যায়নি বলে জানান পূজা। একসঙ্গে কাটানো সময়ে খুনসুটি হয় মাঝেমধ্যে, তবে কোনো বড় ঝগড়া না। হাসতে হাসতে সৌম্য জানালেন, ‘এত দিন শুনে এসেছি একজন রেগে গেলে আরেকজন চুপ থাকতে হয়। তবে আমাদের ক্ষেত্রে এই থেরাপি চলবে না। পূজা যখন রেগে যায়, একটার পর একটা প্রশ্ন করতে থাকে। আর উত্তর না পেলে আরও রেগে যায়। তাই আমার চুপ থাকার কোনো সুযোগ নেই।’

প্রেমের শুরু থেকেই সৌম্য খেলার মাঠে ভালো করলে তাকে চিঠি লেখেন পূজা। জানালেন, ‘ক্রিকেট বুঝতাম না এটা সত্য। তবে সে ভালো করলে আমারও ভালো লাগত। ক্রিকেট অনেক লম্বা সময়ের খেলা, তাই আগ্রহ পেতাম না। আর বাসায়ও কেউ দেখত না। তবে এখন কিছুটা বোঝার চেষ্টা করছি। বুঝিও।’

পূজা যে খেলা তেমন বোঝেন না, তাতে সৌম্যর তো বেশি সুবিধা হওয়ার কথা। বাড়িতে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা তেমন হয় না। সৌম্য বললেন, ‘সুবিধা ওইটুকুই। তবে অসুবিধাও আছে। আমি যখন মাঠ থেকে সেঞ্চুরি করে বাসায় ফিরি, ওর কাছ থেকেও তো শুভেচ্ছা পেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি হয়তো বাসায় ফেরার পরই ও বলবে, “আজ তো অনেক রান করেছ, অনেক পরিশ্রম হয়েছে। শুয়ে পড়ো, বিশ্রাম নাও।” আবার যেদিন শূন্য রানে আউট হয়ে ফিরছি, সে হয়তো বলবে, “আজ তো কষ্ট কম হয়েছে। চলো বাইরে যাই।”’

বিজ্ঞাপন
প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন