উদ্যোক্তা

উদ্যোগ

গিন্নি বাড়ির গিন্নি আমার মা

করোনার প্রভাবে ঘরে বসে মনোয়ারা বেগম ব্যস্ত গিন্নি বাড়ির উদ্যোগ নিয়ে
করোনার প্রভাবে ঘরে বসে মনোয়ারা বেগম ব্যস্ত গিন্নি বাড়ির উদ্যোগ নিয়েছবি: সংগৃহীত
বিজ্ঞাপন

মনোয়ারা বেগম আমার মা। মায়ের ডাকনাম নাজমা। ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর বয়স হবে ৫২। পেশায় শিক্ষক। আমার দেখা অন্যতম মেধাবী মানুষ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই বয়সে এসেও যেকোনো নতুন জিনিস শেখার প্রতি, কোনো নতুন জিনিস করার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ। পত্রিকার পাতায় সুডোকু মেলান তিনি অবসরে বসে, শব্দঘর পূরণ করেন। ইংরেজি অভিধান থেকে নতুন নতুন শব্দ শেখেন। তবে তাঁর জীবনের গল্প শুনলে বোঝা যাবে এটা নতুন কিছু নয়।

ফিরে যাই ৩৬ বছর আগে, আমার মামাদের কাছ থেকে শোনা গল্প। ১৯৮৪ সাল, মায়ের এসএসসি পরীক্ষা। আমার মায়ের পরিবারের মেয়েদের স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ার কোনো নিয়ম ছিল না। অঙ্ক খুব ভয় পেতেন আমার মা। কারণ, নবম-দশম দুই বছরে অঙ্কের কিছুই করেননি তিনি। স্কুলেও পড়াশোনা হয়নি। যারা পড়েছে, তারা প্রাইভেটে পড়েছে। মায়ের প্রাইভেটও ছিল না, পড়াও হয়নি। পরীক্ষা যত কাছে আসছিল, ভয় বাড়ছিল তত। নানা অনুনয়ের পর ঠিক হলো, বড় ভাইয়ের প্রাইভেট টিউটরের কাছে পরীক্ষার আগের দুই মাস অঙ্ক করবেন মা। করলেন। পরীক্ষা দিলেন।

ফলাফল প্রকাশের দিন মা ছিলেন ভীষণ চিন্তায়। ঢাকার কল্যাণপুর গার্লস স্কুলের এক শিক্ষক সেদিন এলেন আমার নানার বাসায়। ‘নাজমা কই? নাজমা?’ আমার মা তো ভাবলেন কি-না-কি যেন। ফেল করে বসেছেন নাকি! পরীক্ষা তো অতটা খারাপ হয়নি। কিন্তু যখন জানতে পারলেন মোহাম্মদপুর থানায় অঙ্কে তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন, বিশ্বাস করতে পারলেন না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চিকিৎসক হওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পড়তে হয়েছিল মানবিক বিভাগে। এইচএসসির পর ১৮ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর স্নাতক ডিগ্রি নিলেন। এরপর বিএডও করে নিলেন। নিজের আগ্রহে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে আঁকাআঁকিও শিখে নিলেন।

তারপর ২০ বছর ধরে আমার মা চাকরি করছেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। প্রথমে আর্টের শিক্ষক হিসেবে, পরে ছোট শ্রেণির শিক্ষক হিসেবে। শিশুদের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা তাঁর। শিশুদের পড়ানো যতটা তাঁর পেশা, এর চেয়ে বেশি নেশা।

আমার মায়ের সবচেয়ে বড় প্রতিভার প্রমাণ পাওয়া যায় বোধ হয় তাঁর হাতের কাজে। সেই স্কুলে পড়ার সময়েই বান্ধবীদের চারুপাঠের সেলাইয়ের কাজ আমার মা করে দিতেন স্বেচ্ছায়। জন্মের পর থেকেই আমি আর আমার দুই ভাই যেসব জামাকাপড় পরেছি ফতুয়া, পাজামা, পাঞ্জাবি—তার অধিকাংশই আমার মায়ের চাকরি আর টিউশন পড়ানোর অবসরে সেলাই করা। চাকরিবাকরির বাইরে, আমার মা একদম যাকে বলে পাকা গিন্নি। ঘরের সবকিছুর প্রতি তাঁর সযত্ন খেয়াল। সামান্য জিনিস এদিক-ওদিক হতে পারে না। ফেলনা জিনিস দিয়ে অবসরে বসে তৈরি করেন টেবিলম্যাট, ওয়ালম্যাটসহ ঘর সাজানোর নানান সামগ্রী। আমার আত্মীয়দের মধ্যে এমন কোনো শিশুই বোধ হয় নেই, যে আমার মায়ের সেলাই করা জামাকাপড় পরেনি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মা এই কাজে তুমুল আনন্দ পান। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক বাচ্চাই তো ফুলের মতো। আর সুন্দর সুন্দর কাপড় পরালে ফুলগুলোও কী সুন্দর ফুটে ওঠে! তাতেই আমার আনন্দ।’

দেশে করোনা এল গত মার্চে। তারপর থেকে মায়ের স্কুল বন্ধ। বাসায় যে কয়জন ছেলেমেয়ে এসে পড়ত, তাদের পড়ানোও বন্ধ। বাবা সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। আমি সদ্য স্নাতক, বেকার। আমার টিউশনও বন্ধ হয়ে গেছে করোনায়। ছোট ভাই এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কেবল বড় ভাইয়ের বেতনের টাকায় আমাদের পরিবারের চলার পথের মসৃণতা কিছুটা হলেও কমে গেছে।

আমার মাকে ফেসবুক প্রোফাইল খুলে দিয়েছিলাম তিন-চার মাস আগে। খুলে দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বুঝে যান ফেসবুকের প্রায় সবকিছু। সুন্দর বাংলা টাইপও করতে শিখে যান ফেসবুকের কল্যাণে। ফেসবুকের বিভিন্ন পেজে ঘুরেফিরে একটা বুদ্ধি বের করলেন শিশুদের জন্য তাঁর সেলাই করা জামাকাপড় দিয়ে অনলাইনে একটা পেজ খোলার। বাবা আর আমরা তিন ভাই বললাম, অবশ্যই ভালো হয়।

প্রথমে কিছু কাপড় কিনে এনে মা তাঁর পছন্দমতো নকশায় ১০টা নিমা বানিয়ে পোস্ট করে দিলেন পেজ থেকে। পেজের নাম পরিবারের সবাই মিলে মিটিং করে দেওয়া হলো ‘গিন্নি বাড়ি’ (www.facebook.com/ginnibari) । আমার ছোট ভাই পেজ সামলানোর দায়িত্ব নিল। আশ্চর্যের বিষয়, প্রথম দিনই ১০টা জামা বিক্রি হয়ে গেল!

তারপর আরও কাপড় আনা হলো, সেলাই করা হলো আরও জামা। আমার মা, তাঁর মমতার, সৃজনশীলতার সবটুকু দিয়ে প্রতিটা জামা তৈরি করতে লাগলেন। সেলাই করে সেগুলোতে আবার ফুটিয়ে তুললেন নানা রকমের বাহারি নকশা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পোশাকের সঙ্গে ধীরে ধীরে পেজে যোগ হলো নকশিকাঁথা। এখন প্রায় প্রতিদিন কিছু না কিছু অর্ডার আসছে। এই পর্যন্ত শতাধিক পোশাক তৈরি করেছেন তিনি অর্ডারে। আমি যখন এই লেখাটা লিখছি, তখন আমার মা আছেন ভীষণ ব্যস্ত। যাঁরা পোশাক নিচ্ছেন, তাঁরাও খুশি হচ্ছেন। স্পষ্টতই গিন্নি বাড়ির পোশাকে আমার মায়ের সারা জীবনের অভিজ্ঞতা ধরা পড়ছে। ক্রেতারা খুশি হয়ে বলছেন দামের তুলনায় পণ্যের মানে তাঁরা সন্তুষ্ট। তবে আমার মা সন্তুষ্ট নন। ইউটিউবে নিত্যনতুন ভিডিও দেখছেন কীভাবে সেলাইকে আরও উন্নত করা যায়। কীভাবে ‘গিন্নি বাড়ি’র জামাকাপড়ের গুণগত মান আরও বাড়ানো যায়।

কাজের অবসরে আমাদের একদিন বললেন, ‘ভেবেছিলাম জীবনের এতকাল পরে এসে কী করা যায়। তোরা সবাই বড় হয়ে গেলি, নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবি। এখন না হোক, আর পাঁচ বছরের মধ্যে সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবি। তখন বেকার বসে থাকা লাগবে। ভাগ্যিস, এই গিন্নি বাড়ির বুদ্ধিটা এসেছিল মাথায়। এখন গিন্নি বাড়িই যেন আমার মায়ের বুড়ো বয়সের নতুন সন্তান। তাকে তিনি সযতনে বড় করে তুলতে চান। আপাতত এটাই তাঁর একমাত্র ইচ্ছা।

আমার মতো ২৫-২৬ বছর বয়সী ছেলেমেয়েরাও যেখানে জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে যাই, সেখানে আমার মায়ের মতো ৫০ পেরোনা মানুষেরা চাইছেন নতুন কিছু একটা করতে। এই স্পৃহা, এই অদম্য ইচ্ছাটা একটা বড় শিক্ষা আমার কাছে। আমার মা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন