বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অনেক সময়ই দেখা যায় পরিবারে দুই ছেলের বউয়ের সঙ্গে একই রকম আচরণ করতে পারেন না শ্বশুর-শাশুড়িরা। আবার অনেক সময় দেখা যায় শ্বশুর–শাশুড়ির দেখভাল নিয়ে দুই জায়ের দ্বন্দ্ব বাধে। আবার অনেক সময় শ্বশুরবাড়ির ‘মধ্যমণি’ হতে বা ‘ও করে না আমি করব কেন’-এমন সব প্রতিযোগিতায় দুই জায়ের সম্পর্কটাই হয়ে যায় নষ্ট। যেমনটা দেখা গেছে তৃণা ও মুনার ক্ষেত্রে। এই দুই জায়ের সবকিছুতেই প্রতিযোগিতা। দুজনেই স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকেন। নানা উৎসবে বছরে দুবার–তিনবার গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে যান তাঁরা। এরপরই শুরু হয়ে যায় দ্বন্দ্ব। তৃণা বলেন, ‘শ্বশুর–শাশুড়ি, ননদের জন্য যা–ই কিনি না কেন, মুনা বলবে “ঢাকার ফুটপাতে এগুলো খুব কমে পাওয়া যায়।” সব সময় আমাকে ছোট করতে উঠেপড়ে লাগে সে।’ অন্যদিকে মুনার অভিযোগ, ‘গ্রামে আসলে পটের বিবির মতো বসে থাকে তৃণা। মাঝে মাঝে শখ করে কিছু রান্নাও করে না। সে যদি না করে, তো আমি কেন করব!’ আবার এই দুই বউয়ের আলাদা অভিযোগ, শাশুড়ি তাঁদের দেখতে পারেন না। তৃণা বলেন, শ্বশুর-শাশুড়ি মুনাকে ভালোবাসেন, সবার সঙ্গে কেবল মুনার প্রশংসা করেন। আর মুনা বলেন, শ্বশুর-শাশুড়ি তৃণাকে সব সময় ভালোটা দেন। তাঁদের এ প্রতিযোগিতায় উৎসবটাই মাটি হয় পরিবারের।

বিয়ের পর দুই বছর শ্বশুর–শাশুড়ির সঙ্গে থেকেছেন সামিয়া। অভিজ্ঞতা ভালো নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা সামিয়া শ্বশুরবাড়িতে এসে বুঝতে পারেন তাঁর এত পড়াশোনাই পছন্দ নয় শ্বশুর–শাশুড়ির। সামিয়াকে অফিসে যাওয়ার আগে বাড়ির সব রান্না করতে হতো, এমনকি বেতনের টাকা কী করছেন, তা–ও জানতে চাইতেন তাঁরা। মা-বাবার বাসায় যেতেও পেতে হতো বাধা। অন্যদিকে বড় ছেলের বউ কিছু না করলেও তাঁকে কোনো কাজের কথা বলেন না শাশুড়ি। সবকিছুতে বড় বউয়ের পরামর্শ নিতেন। ভীষণ কষ্ট পেতে থাকেন সামিয়া। অন্য সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। তিনি কিছুদিনের মধ্যে দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে চলে যান।

default-image

আসলে একটি পরিবার টিকে থাকে সবার আলাদা অবদানের জন্য। ক্ষেত্রবিশেষে প্রত্যেককেই দিতে হয় ছাড়। শ্বশুর-শাশুড়িকে যেমন ছেলের বউদের মানিয়ে নেওয়ার সময় দিতে হবে। আবার মেয়েটিকে বুঝতে হবে নতুন পরিবেশে অনেক কিছুই একদম তাঁর মতো হবে না। যৌথ পরিবারগুলোতে আসলে অনেক পরিবারের মানুষকে একটি পরিবার বানাতে হয়। তাই এমন অবস্থায় ভাগাভাগি করে নিতে হয় সুখ–দুঃখ, ভালোলাগা-ভালোবাসা। এ ক্ষেত্রে বয়োজ্যেষ্ঠদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

রোমানা বেগমের ভরা সংসার। তিন ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি নিয়ে সুখের হাট। খিটমিট যে একদম লাগে না তা নয়, সংসার তো। তবে কমবেশি ভালোই আছেন তাঁরা। আর এর পেছনে মূল ভূমিকাটাই রেখেছেন রোমানা বেগম। সবাইকে স্বাধীনভাবে চলার সুযোগ দিয়ে সংসারের খুঁটিটা শক্ত করে ধরে রেখেছেন। তিন ছেলের বউয়ের কারও প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব করেন না। উৎসব-পার্বণে উপহারে করেন না তফাত। বিপদে পড়লে তিনজনকে ডেকে পরামর্শ নেন। ছেলের বউরাও চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছেন তাঁর সঙ্গে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাহ এহসান হাবিব বলেন, ‘শাশুড়ি-ছেলের বউ—এসব সামাজিক সম্পর্ক কেমন হবে, তা বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত অর্থনৈতিক নির্ভরতা, প্রত্যাশা, দ্বিতীয়ত শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক শ্রেণি, ক্ষমতায়নের ওপর। এ ছাড়া দুজনের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি কেমন তার ওপরও নির্ভর করে। সাধারণত দেখা যায় এ ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শাশুড়ি কর্তৃত্বের ভূমিকা নেন, ছেলের বউ অনুগত ভূমিকা নেন। তবে এ সম্পর্কের গতি–প্রকৃতি সব সময় এক রকম থাকে না। শাশুড়ি যখন শক্ত সমর্থ, তাঁর কর্তৃত্বে থাকে, পরিবারে তখন এক রকম আচরণ হয় দুই পক্ষের। আবার যখন তিনি কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন পাল্টে যায় দুই পক্ষের আচরণ। আসলে পরিবারের এই দুই পক্ষের নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্তৃত্ব সাংস্কৃতিক সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। তাই এ সম্পর্ক সব সময় এক রকম থাকে না।’

একটি পরিবারে যখন কয়েকজন ছেলের বউ থাকেন তখন কী হয়? শাহ এহসান হাবিব বললেন, তখন কার ওপর শ্বশুর বা শাশুড়ি বেশি সন্তুষ্ট হবেন, তা মূলত নির্ভর করে বিশ্বস্ততা, প্রত্যাশা, সেবা ও যত্নের ওপর। কে আসলে তাঁদের বেশি যত্ন করছেন, কে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এ বিষয়গুলো খুবই বড় ভূমিকা নেয়। আমার ছেলের বউয়ের ক্ষেত্রে যেটা হয়, শাশুড়ির কাছ থেকে কে কতটুকু স্বাধীনতা পাচ্ছেন, সেটার ওপর তাঁদের যত্ন বা ভালোবাসার বিষয়টি আসে। আর এই ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব হয় যখন শিক্ষাগতযোগ্যতা, পারিবারিক সংস্কৃতির তফাত বেশি থাকে। গ্রামাঞ্চলে অবশ্য আরেকটি বিষয় দেখা যায়, তা হলো অর্থনৈতিকভাবে কে সুবিধা দিচ্ছেন, সেটি। যে ছেলে সংসারে বেশি অর্থ দেন, তাঁর স্ত্রীর প্রতি বেশি সদয় মনোভাব থাকে। কোনো সন্তানের সঙ্গে মা–বাবার কেমন সম্পর্ক, তা–ও ভূমিকা রাখে তাঁদের স্ত্রীদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে। তবে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে পরিবারে। একেক জন মানুষের জীবনধারা আলাদা হয়, আবার একসঙ্গে থাকতে হলে কিছুটা ছাড় দিতেই হয়—এগুলো দুই পক্ষকেই বুঝতে হবে।

পরিবারে প্রতিযোগিতার চেয়ে সৌহার্দ্য জরুরি। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমও বড় ভূমিকা রাখে। সমাজবিজ্ঞানীর মতে, উত্তর ভারতের বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালে বউ–শাশুড়ির দ্বন্দ্বকে চরম পর্যায়ে দেখানো হয়। এ ধরনের বিষয়গুলো সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবার দক্ষিণ ভারতের সিনেমা–নাটকে এ সম্পর্ক অনেক সহজভাবে দেখানো হয়। এসব সিরিয়ালের দর্শক হিসেবে তার প্রভাব পড়ে সামাজিকভাবে ও পরিবারে পরিবারে।

পরিবারে সবার মানসিকতা এক রকম হবে না। তবে মানিয়ে চলার ইচ্ছা থাকতে হবে। এক রকম সংস্কৃতি ও অভ্যাসে বেড়ে ওঠা মেয়েটি যখন বিয়ের পর নতুন সংসারে আসবেন, সেখানে তাঁকে সহযোগিতা করা জরুরি। পরিবারের বাকি সদস্যরা নতুন বউকে হৃদ্যতার সঙ্গে আপন করে নিলে তাঁর জন্যও বিষয়টি সহজ হবে।

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন