default-image

জয় এল স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে

রাজেদা আজিজের প্রসববেদনা শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সকালে। ব্যথায় ছটফট করছেন তিনি। সারা দিন গিয়ে রাত গভীর হয়, সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে তাঁর ব্যথা। ওদিকে ঢাকায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলা করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। গোলাগুলির শব্দে প্রকম্পিত চরাচর। ভোররাতে ঢাকার গোলাগুলি আর চিৎকার যখন কিছুটা কমে এসেছে, মানিকগঞ্জের আয়নাপুর গ্রামে রাজেদা আজিজের কোলজুড়ে তখন এক ফুটফুটে শিশু। ২৬ মার্চ ভোর চারটার দিকে জন্ম নিলেন—জয়। পুরো নাম জাহাঙ্গীর আলম জয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপন করা হবে এক দিন পর। এদিন জয়েরও সুবর্ণজয়ন্তী। জয়ের জন্মের সময় বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম আবদুল আজিজ ছিলেন কর্মস্থলে, সেখানে থেকে পরে তিনি যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধের আগে পুলিশ কর্মকর্তা এ কে এম আবদুল আজিজ কর্মরত ছিলেন ময়মনসিংহে। স্ত্রী রাজেদা ও আড়াই বছর বয়সী একমাত্র সন্তান তখন আজিজের সঙ্গে ময়মনসিংহে থাকেন। দেশের অবস্থা উত্তপ্ত হতে শুরু করলে সন্তানসম্ভবা স্ত্রী ও ছেলেকে মানিকগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে রেখে যান। আজিজ যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। এদিকে ২৬ মার্চ ভোরেই রাজেদা আজিজের কোলজুড়ে আসে আরেক সন্তান। দিন যায়, মাস যায়, যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়তে থাকে। ছোট ছোট দুই ছেলে নিয়ে রাজেদা আজিজের দিন কাটে স্বামীর চিন্তায়। ‘যেদিন শুনি মিলিটারি আসবে, সন্ধ্যার পর গিয়ে লুকিয়ে পড়ি মাঠের মধ্যে পাটখেতে। সারা রাত ভয়ে ভয়ে কাটে শাশুড়ির সঙ্গে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে। একদিন তো স্বামী মুক্তিযোদ্ধা জানতে পেরে রাজাকাররা এসে আমার কোলের ছেলেকে (জয়) কেড়ে নিয়ে গেল। এদিকে বুকের দুধের চাপ বাড়ছে, ব্যথা করছে, ওদিকে আমার সন্তানকে ওরা না খাইয়ে রেখেছে। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পর ছেলেকে উদ্ধার করতে পেরেছিলাম।’ স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেন রাজেদা বেগম।

মাসের পর মাস যায় কিন্তু স্বামীর কোনো খোঁজ মেলে না। হঠাৎ একদিন খবর এল আবদুল আজিজ যুদ্ধে মারা গেছেন। খবর শুনে আকাশ ভেঙে পড়ল রাজেদা আজিজের মাথায়। তবে সেসব উড়ো খবর ভুল প্রমাণ করে আজিজ একদিন ফিরে এলেন বাড়িতে। তত দিনে তিনি যুদ্ধ করতে করতে নিজের জেলায় চলে এসেছেন। ভালো আছেন জানিয়েই আবার ছুটে গেলেন। দেশ স্বাধীন হলে আবদুল আজিজ ফিরে এসে ছোট ছেলের নাম রাখলেন জয়।

বাবা আবদুল আজিজ মারা গেছেন ২০১৯ সালে। জয় এখন নিজে দুই সন্তানের বাবা। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঢাকার মিরপুরে থাকেন। চাকরি করছেন ব্যাবিলন গ্রুপের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হিসেবে। জয় বলেন, ‘এমন একটি দিনে আমার জন্ম হয়েছে, ভেবে গর্বিত হই। ছোটবেলা থেকেই বন্ধু ও পরিবারের সবাই আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়। দেশের ইতিহাসের সঙ্গে নিজের জন্মদিন জড়িয়ে থাকায় নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।’

জয়ের বাবা আবদুল আজিজ মারা যান ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। মা থাকেন মানিকগঞ্জে।

বিজ্ঞাপন
default-image

বিজয় দিবসে জন্মেছিলেন বিজয়

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অ্যারোনটিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর ছিলেন মো. আবদুল মান্নান। ছয় সন্তান আর স্ত্রী দৌলতন নেসাকে নিয়ে থাকতেন পাকিস্তানের করাচির কৌরঙ্গি ক্রিক সেনানিবাসে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁরা সেখানে গৃহবন্দী হয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলো, সেদিন ভোররাতে জন্ম নিলেন আবদুল মান্নানের সপ্তম সন্তান। শত্রুর দেশে জন্ম নিলেন বিজয়, পুরো নাম—ফাহিম আবদুল্লাহ বাশার বিজয়।

মা দৌলতন নেসার এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেদিনের কথা, ‘১৫ ডিসেম্বর আমার ব্যথা উঠতে শুরু করে। ক্যাম্পের ভেতরে পাহাড়ের ওপরে একটা হাসপাতালে গিয়ে উঠলাম। ১৬ ডিসেম্বর রাত দুইটার দিকে জন্ম হলো আমার ছেলের।’

দৌলতন নেসাদের মতো এমন অনেক বাঙালি পরিবারকে সেখানে একইভাবে কার্যত গৃহবন্দী থাকতে হয়েছে দীর্ঘদিন। তাঁরা সবাই মিলে নতুন এই সন্তানের নাম রাখেন বিজয়। ১৯৭৩ সালে বন্দী বিনিময় চুক্তির পর অন্যদের মতো দেশে ফিরেছিল বিজয়ের পরিবারও। তবে দেশে ফেরার আগেই ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের প্রথম জন্মদিন উদ্‌যাপন ছিল এক বিশেষ ঘটনা।

সেই সময়ের কথা বিজয়ের মনে না থাকাই স্বাভাবিক। বাবাও মারা গেছেন ২০১০ সালে। তাই সেই সময়ের কথা শোনা হলো বিজয়ের বড় ভাই সাখাওয়াত হোসেনের কাছে। তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হলেও আমরা তখন পাকিস্তানে গৃহবন্দী। তাই ১৯৭২ সালে প্রথম বিজয় দিবস নিয়ে সবার মধ্যে একধরনের চাপা উত্তেজনা। পাকিস্তানিদের চোখ এড়িয়ে ঘরের মধ্যে আমরা সেদিন বিজয়ের জন্মদিনের মোড়কে মূলত দেশের বিজয়কে উদ্‌যাপন করলাম। এই আয়োজনে আমাদের প্রতিবেশী পরিবারগুলোও একে একে পাকিস্তানিদের চোখ এড়িয়ে উপস্থিত হলো।’

বিজয়ের নিজেরও গর্ব হয় ১৬ ডিসেম্বরে জন্ম নিয়ে। প্রতিবছর পুরো দেশে জাতীয়ভাবে বিজয় দিবস উদ্‌যাপিত হয়, সেই সঙ্গে যেন নিজের জন্মদিনকে মিশিয়ে ফেলেন বিজয়। ব্যক্তিজীবনে তিনি এক সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন ঢাকায়। সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস পড়ে যিনি যৌবনে চা-বাগানের চাকরি নিয়েছিলেন। এখন পুরোদস্তুর উদ্যোক্তা। বিজয় বলেন, ‘প্রতিবছর জন্মদিন এলে পরিবার থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব—কেউ সেটা ভোলে না। মাঝরাত থেকেই শুভেচ্ছা পেতে থাকি। এবার তো একটু বিশেষ। হাফ সেঞ্চুরি হতে যাচ্ছে আমারও। পরিকল্পনা আছে বিশেষভাবে এবারের জন্মদিন উদ্‌যাপন করার।’

default-image

বিজয়ের দিনে মুক্তি

পোশাকি নাম আজমেরি আক্তার। তবে সবাই চেনেন মুক্তি নামে। কারণ, মুক্তির নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জন্ম। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে মুক্তির জন্ম হয় ময়মনসিংহ সদরের গুলকিবাড়িতে। মুক্তির জন্মের দেড় মাস পরই মারা যান বাবা আবদুল আক্তার আহমেদ। ২০১৬ সালে মারা গেছেন মা লতিফা আক্তারও। ছয় ভাইবোনের মধ্যে এখন বেঁচে আছেন মুক্তি ও তাঁর আরেক ভাই পান্না।

পান্না বলেন, ‘আমি মুক্তির চেয়ে কয়েক বছরের বড়। ওর যখন জন্ম হয়, সেই সময়ের কথা আমারই তেমন মনে নেই। শুধু মনে পড়ে, মাঝেমধ্যে সবাই মিলে বাড়িতে খুঁড়ে রাখা বাংকারে গিয়ে লুকিয়ে পড়ত। আমিও মায়ের আঁচল ধরে নেমে পড়তাম। একদিন সেখান থেকে উঠে আসতে খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার। বাড়ির অন্যরা আমাকে টেনে তুলেছিল। মায়েরও বাংকারে ওঠানামা করতে খুব কষ্ট হতো, এটুকু মনে পড়ে।’

মুক্তি এখন ঢাকার বাড্ডায় থাকেন তিন মেয়ে ও স্বামীর সঙ্গে। এ বছরের ১৬ ডিসেম্বর তাঁরও বয়স ৫০ পূর্ণ হবে। বিষয়টা নিয়ে ছোটবেলার মতো উচ্ছ্বসিত তিনি। জানালেন, প্রতিবছর অন্যদের জন্মদিন ভুলে গেলেও আমার জন্মদিন কেউ ভোলে না। সবাই ফোন করে শুভেচ্ছা জানায়। ভাই, মেয়েরা, স্বামী—সবাই কেক নিয়ে আসে। কমপক্ষে তিনটি কেক কাটি প্রতিবার। ছোটবেলা স্কুলে ১৬ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠান হলেও মনে হতো আমার জন্মদিন উপলক্ষে এ আয়োজন করা হয়েছে।’

এক সুর মিশেছে এক স্রোতে

তিনটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় এই তিনজন জন্ম নিলেও তাঁদের মূল সুর যেন এক স্রোতে এসে মিশে গেছে। একটি দেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে আছে তাঁদের জন্মক্ষণ। তাঁদের নামগুলোও যেন এককথায় বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রকাশ ঘটায়। জয়, বিজয় বা মুক্তি—সে তো বাংলাদেশেরই!

বিজ্ঞাপন
প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন