default-image
বিজ্ঞাপন

যখন বিয়ে হয়, তখন সেই বন্ধন সারা জীবন অটুট থাকবে—এমন ইচ্ছাই থাকে বর কিংবা বধূর। দম্পতি হিসেবে আমৃত্যু থেকেছেন দুজন দুজনার হয়ে, এমন উদাহরণই বেশি। এরপরও স্ত্রী বা স্বামীবিয়োগ, বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যাদি কারণে অনেকেই সিদ্ধান্ত নেন দ্বিতীয় বিয়ে করার। তবে বিয়ে তো একটি আইনি প্রক্রিয়া। দ্বিতীয় বিয়ে যদি করতেই হয়, তবে আইনগত দিকগুলো বুঝে নিতে হবে আগে। আরও কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে দ্বিতীয় বিয়ের আগে।

মুসলিম শরিয়াহ আইন অনুযায়ী একজন পুরুষ একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী রাখতে পারেন। হিন্দুদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন অনুযায়ী যেকোনো সংখ্যক বিয়ে করার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। হিন্দু ও ইসলাম—দুই ধর্মেই বহুবিবাহের অনুমতি রয়েছে শুধু পুরুষদের ক্ষেত্রে। ব্যতিক্রম শুধু হিন্দু ও মুসলিম নারীদের ওপর প্রযোজ্য। তবে আইনানুগভাবে বিবাহবিচ্ছেদ করলে পুরুষ বা নারীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বা একাধিক বিয়ে করতে কোনো বাধা নেই।

পুরুষের ক্ষেত্রে বহুবিবাহ আইন

আইন অনুযায়ী, এক স্ত্রীর বর্তমানে আরেকটি বা একাধিক বিয়ে করাকে বহুবিবাহ বলে। কোনো ব্যক্তির স্ত্রী বর্তমান থাকাকালে আরেকটি বিয়ে করার প্রয়োজন হয়, তবে তিনি বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের মধ্যে সর্বশেষ স্ত্রীর এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে আরেকটি বিয়ে করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে পারবেন।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ ধারামতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিসি পরিষদের কাছে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবে না। অনুমতির জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের অনুমতি দিতে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে—১. বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব ২.মারাত্মক শারীরিক দুর্বলতা ৩.দাম্পত্যজীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা ৪.দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য আদালত থেকে প্রদত্ত কোনো আদেশ বা ডিক্রি বর্জন ও ৫. মানসিকভাবে অসুস্থতা ইত্যাদি।

কোনো পুরুষ যদি সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি অবিলম্বে তাঁর বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের আশু বা বিলম্বিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে। বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীরা আদালতে মামলা করে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করার অধিকার রাখেন। দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে প্রথম স্ত্রী আলাদা বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি ভরণপোষণ পাবেন। এ ক্ষেত্রে নাবালক সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে হবে বাবাকে। ভরণপোষণের পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানদের উত্তরাধিকারীর অধিকার কোনো অবস্থাতেই খর্ব হবে না। এ ছাড়া স্বামী অনুমতি না নেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত জেল ও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

স্বামী থাকা অবস্থায় কি একজন নারী আরেকটি বিয়ে করতে পারেন?

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, প্রথম স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা অবস্থায় স্ত্রী যদি আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তাহলে সেই দ্বিতীয় বিয়ে আইনত অবৈধ, অকার্যকর ও বাতিল বলে গণ্য হবে। স্ত্রী দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে তাঁকে অবশ্যই আগে প্রথম স্বামীর সঙ্গে যথাযথ আইন মেনে বিবাহবিচ্ছেদ করতে হবে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুসারে, প্রথম স্বামীকে তালাকের নোটিশ প্রদানপূর্বক ৯০ দিন ইদ্দত পালন শেষে তালাক কার্যকর হয়। এই আইনগত বিধান মেনে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করা যেতে পারে।

এই বিধান লঙ্ঘন করে প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় স্ত্রী যদি অন্য কাউকে বিয়ে করেন, সে ক্ষেত্রে প্রথম স্বামী সেই স্ত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে স্ত্রী ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড পেতে পারেন এবং সেই সঙ্গে জরিমানাও হতে পারে। তবে স্ত্রী যদি তাঁর পূর্বের স্বামীর সাত বছর যাবৎ কোনো খোঁজখবর না পান, অথবা তিনি জীবিত থাকতে পারেন—এমন কোনো তথ্য যদি জানা না যায়, তাহলে পরবর্তী স্বামীকে সত্যি ঘটনা জানিয়ে তাঁর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন। এটি দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারার বিধানের ব্যতিক্রম আর এই ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে স্ত্রীর দ্বিতীয় বিয়ে শাস্তিযোগ্য হবে না। অন্যদিকে স্ত্রী যদি দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়ে করার সময় যাকে বিয়ে করছেন, তাঁর কাছে পূর্বের বিয়ের কথা গোপন করেন, তাহলে সেটি দণ্ডবিধির ৪৯৫ ধারা অনুসারে একটি অপরাধ। এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা।

শেষ কথা

বিয়েসংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নিকটস্থ থানা বা আদালতে অভিযোগ করতে পারেন। থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর এজাহার দাখিল করা যায়। বিয়েসংক্রান্ত নানা ধরনের অভিযোগ নিয়ে লোকজন আমার চেম্বারে আসেন; যা দেখে সাদা চোখেই বুঝতে পারছি, বিয়ে নিয়ে প্রতারণা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। বিয়ের কথা গোপন রেখে তালাক সম্পন্ন না করে পুনরায় বিয়ে, ভুয়া কাবিননামা তৈরি করে বিয়ের অভিনয় করা, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা, এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। বিয়েসংক্রান্ত প্রতারণা বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই যেকোনো বিয়ের ক্ষেত্রে বিয়ের উভয় পক্ষকে সচেতন থাকতে হবে। বিয়ের নিবন্ধন করতে হবে এবং বিয়ের সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলতে হবে। তাহলেই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং লিগ্যাল কাউন্সেলের অংশীদার

বিজ্ঞাপন
প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন