বিজ্ঞাপন

পাঠকের কাছ থেকে মনোজগৎ, ব্যক্তিজীবন ও সন্তান পালনের মতো সমস্যা নিয়ে ‘পাঠকের প্রশ্ন’ বিভাগে নানা রকমের প্রশ্ন এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম নির্বাচিত একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবার।

প্রশ্ন: আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত বেকার আমার বাবা। কিছুই করতে চান না। এত দিন তাঁর মায়ের জমি বিক্রি করে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। এখন তো সব শেষ। তিনি কোনো খরচই দিতে চান না। তিন বছর ধরে গ্রামে থাকেন। এর আগে বাসায় প্রতিদিন ঝগড়া-মারামারি হতো। আমিও ঝগড়া করতাম। আমাদেরও তিনি মারধর করতেন। ওনার ভাইবোনদের দিয়ে অপমান করাতেন আমাদের। এখন কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। অনেক কষ্ট করে এত দূর এসেছি। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় আমি প্রচণ্ড ডিপ্রেশনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছি আর তাই ফল খারাপ হলো। জিপিএ এত কম যে আমি মেডিকেল কলেজে পরীক্ষাও দিতে পারিনি। পরের বছর মানোন্নয়ন পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তাতে ফল সামান্য উন্নতি হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলাম কিন্তু হঠাৎ করে আমাদের ভর্তি বাতিল হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে আমার জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভালো কিছুই ভাবতে পারি না নিজেকে নিয়ে। আমি কি কিছুই করতে পারব না?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

উত্তর: শৈশব থেকেই তোমাকে যে পরিবারের এই অশান্ত পরিবেশে বড় হতে হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। পরিবার হচ্ছে আমাদের আশ্রয়স্থল এবং বাবা–মায়েরা নিজেদের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য সন্তানদের নিয়ে আসেন তাঁদের জীবনে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, প্রাক্‌–শৈশব থেকে সন্তান নিজে উপার্জনক্ষম হওয়া পর্যন্ত অভিভাবককে যে তার বিকাশে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে হবে, সেটি তাঁরা অনেক সময় খেয়াল করেও করেন না। অভিভাবকদের কেউ যখন বলেন, তোমাকে যেহেতু জন্ম দিয়েছি, তোমাকেই চেষ্টা করতে হবে আমাকে খুশি করার জন্য; এতে সন্তানেরা খুব কষ্ট পায়। সন্তানদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য যে তাদের সঙ্গে জন্মের পর থেকেই একটি চমৎকার বন্ধন তৈরি করা প্রয়োজন, সেটি অনেক অভিভাবক করেন না।

তোমার বাবা বহুদিন ধরে কেন বেকার থাকলেন তা জানি না। তবে এ কারণে তোমাদের অনেক বেশি ভোগান্তির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। তার ওপর তিনি এবং তাঁর ভাইবোনেরা মিলে তোমাদের অত্যাচার করেছেন। বাবা–মায়েরা যদি সন্তানদের জন্য রোল মডেল হতে পারতেন, তাহলে খুব ভালো হতো। যেহেতু তাঁর আর্থিক সংগতি ছিল না, সে কারণে সমাজের কাছেও তোমরা শ্রদ্ধাবঞ্চিত হয়েছ। এসব কারণে বিষণ্নতায় ভোগা ও পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না করতে পারার কারণে তুমি অনেকটাই হতাশার ভেতরে ঢুকে গেছ। তোমার মেধা, অদম্য ইচ্ছা ও স্বপ্ন থাকা সত্ত্বেও তুমি যে পদে পদে হোঁচট খেয়েছ, তাতে খুব কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক।

তবে তোমার প্রতি আমি অনেক শ্রদ্ধা অনুভব করছি এ কারণে যে তুমি কিন্তু সহজে হাল ছাড়তে চাওনি। ফলাফল উন্নয়নের জন্য তুমি দ্বিতীয়বার চেষ্টা করে তাতে সফল হয়েছো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য নির্বাচিতও হয়েছিলে। এটা কিন্তু প্রমাণ করে, তুমি যদি আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা কর, তাহলে পরবর্তী ধাপের পড়াশোনা নিশ্চয়ই করতে পারবে। এ ছাড়া আজকাল প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণ নেওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। যেগুলো সম্পর্কে তুমি খোঁজখবর নিতে পার।

বাবার প্রতি তোমার যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও রাগ তৈরি হয়েছে, সেটি মন থেকে ঝেড়ে ফেলা কঠিন হলেও তুমি ভেবে দেখতে পারো তাঁর প্রতি তোমার এই নেতিবাচক অনুভূতিগুলো তোমাকে দিন শেষে কেমন রাখছে। হয়তোবা তিনিও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য যে সহায়তা তার অভিভাবকদের কাছে চেয়েছেন, সেটি পাননি। এমনও হতে পারে, তিনি নিজেও বিষণ্নতায় ভুগেছেন বলে কোনো কাজে উৎসাহ বোধ করেননি এবং সে কারণে আত্মসম্মান নিয়ে বড়ও হতে পারেননি। তোমরা যখন অভিযোগ করেছ বা কিছুটা আক্রমণাত্মক হয়েছ, তখন নিজে একা সামাল দিতে পারেননি বলে তাঁর পরিবারকেও যুক্ত করেছেন।

তোমাকে যেহেতু মানসিক ও শারীরিকভাবে ভালো থাকতে হবে, তাই চেষ্টা কর, অতীতকে পেছনে রেখে ভবিষ্যতের কিছু পরিকল্পনা নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে। তোমার বয়স এখনো অনেক কম এবং তারুণ্যের উদ্যম ও শক্তি পুরো হারিয়ে যায়নি, কাজেই জীবনকে মূল্যায়ন করার ব্রত নাও। সৃষ্টিকর্তা তোমাকে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মস্তিষ্ক দিয়েছেন এবং প্রতিটি ইন্দ্রিয়, এখনো সচল রয়েছে। কাজেই স্বপ্নটিকে আবার নতুন করে সঙ্গে নিয়ে কিছু পরিকল্পনা করতে শুরু করো, কেমন।

পাঠকের প্রশ্ন পাঠানো যাবে ই–মেইলে, ডাকে এবং প্র অধুনার ফেসবুক পেজের ইনবক্সে।

ই–মেইল ঠিকানা: [email protected] (সাবজেক্ট হিসেবে লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)

ডাক ঠিকানা: প্র অধুনা, প্রথম আলো, প্রগতি ইনস্যুরেন্স ভবন, ২০–২১ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫।

(খামের ওপর লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’) ফেসবুক পেজ: fb.com/Adhuna.PA

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন