বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্কুল–কলেজ খুলেছে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, হচ্ছে সরাসরি কথা বলার সুযোগ। মজা, হাসি-আনন্দ, খানিক দৌড়ঝাঁপও হয়তো থাকবে। শিক্ষকদের সান্নিধ্যে আবার ক্লাসরুমে বসছে শিক্ষার্থীরা। মহামারি পরিস্থিতিতে গৃহবন্দী সময়ে অনেক শিশু ভুগেছে মানসিক চাপে। জীবন হয়ে পড়েছিল একঘেয়ে, অল্পেই হয়তো মেজাজ বিগড়েছে, অনেকেরই ডিজিটাল ডিভাইস নির্ভরতা বেড়েছে। কারও কারও হয়তো পারিবারিক সময়গুলোও মধুর থাকেনি।

ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. রশিদুল হক বলেন, এখন হয়তো সপ্তাহে সব দিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাবে না শিক্ষার্থীরা। তবে এই ‘শুরু’ বিষয়টি শিশুর মনোবল অনেকটা দৃঢ় করবে, মানসিক চাপও কমাবে। ভেতর থেকে সতেজ ও প্রফুল্ল হয়ে উঠবে শিশু। স্কুল খুলে যাওয়া মানেই আবার শিশুমনের জানালাগুলো খুলে যাওয়া।

সহজ ভাবনায় সহজ জীবন

default-image

করোনা মহামারির ব্যাপ্তি এখনো পেরোতে পারিনি আমরা। মেনে চলতে হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি। শিশুরা স্কুলে গিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারবে কি না, তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবে কি না—এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা হলেও দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখুন। সন্তান স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে কোনো ভয় নেই—এই বিশ্বাস অভিভাবকেরা মনে ধারণ করুন। সন্তানের মনেও বুনে দিন এমন বিজ্ঞানসম্মত ভাবনার বীজ। শিশু স্কুলে যাবে, এটাই তো স্বাভাবিক। ‘নতুন স্বাভাবিক’ জীবনে স্কুল হোক প্রাণের মিলনমেলা। সেই আগের মতো। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই নতুন স্বাভাবিকতার সঙ্গে মানিয়ে নিন। করোনাকালের অনলাইন ক্লাস-অ্যাসাইনমেন্টের দিন পেরিয়ে শুরু হোক প্রাণোচ্ছল স্কুলজীবন।

যাচ্ছি যখন স্কুলে

মাস্ক তো পরতে হবেই, সম্ভব হলে একটু বড় ছেলেমেয়েদের ফেসশিল্ডও দিতে পারেন। স্কুলব্যাগে স্যানিটাইজার রাখা যেতে পারে। তবে যে শিশু এর ব্যবহারবিধি বোঝে, কেবল তাকেই দিন। ব্যাগে দিয়ে দিন টিস্যু পেপার। শিখিয়ে দিন হাঁচি-কাশির আদবকেতা। টিস্যু পেপার কোথায় ফেলতে হবে, তা বুঝিয়ে দিন। নিয়মমাফিক হাত ধুতে শিখুক শিশু, স্কুলে তো হাত ধোয়ার সুবন্দোবস্ত আছেই। কাপড়ের মাস্ক ভিজে গেলে তা খুলে রাখার জন্য প্লাস্টিকের জিপারব্যাগ দিয়ে দিতে পারেন। আলাদা প্যাকেটে বাড়তি মাস্ক দিয়ে রাখুন, প্রয়োজনে ব্যবহার করবে। সার্জিক্যাল মাস্ক একবার ব্যবহারের পরই কোথায় ফেলতে হবে, সেটিও বুঝিয়ে বলুন। মাস্ক পরা ও খোলার সময় সাবধানে মাস্কের স্ট্র্যাপ ধরে পরে নেওয়ার কৌশল শিখিয়ে দিন তাকে। মাস্ক পরার সময় শিশুর হাত পরিষ্কার রাখার কৌশল শেখান। কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করলে টিফিন-পানি খাওয়ার সময় তা খুলে (মাস্কের ভেতরের অংশ ভেতর দিকেই রেখে ভাঁজ করে) কাগজের প্যাকেটে রেখে আবার পরা যাবে। এ জন্য আলাদা কাগজের প্যাকেটও দিতে হবে তার ব্যাগে।

ফেরার পর

স্কুল থেকে ফেরার পর বাড়ির প্রবেশমুখে রাখা স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে বলুন। সন্তানকে শেখান, ফিরেই দৌড়ে গিয়ে মাকে বা বাড়ির অন্য কাউকে জড়িয়ে ধরা যাবে না। হাত পরিষ্কার করার আগে বাড়ির কোনো জিনিসও ছোঁয়া যাবে না। স্কুলড্রেস, জুতা-মোজা প্রভৃতি একবার ব্যবহারের পর বাসায় এসে ধুয়ে ফেলতে হবে। ধোয়ার মতো উপকরণে তৈরি জুতা নিতান্তই না পরা গেলে জুতাও মুছতে হবে জীবাণুনাশক দ্রবণ দিয়ে। প্রবেশমুখের কোথাও একটা আলাদা জায়গায় শিশু স্কুলব্যাগ রাখতে পারে, যা পরে জীবাণুনাশক দ্রবণ দিয়ে মুছে ঘরে আনতে হবে।

সবচেয়ে ভালো হয় ব্যাগের ভেতরের সব জিনিস বের করে একবারে শিশুর পোশাক ও অন্য সামগ্রী, যা ধোয়া হবে; তা ধোয়ার জায়গায় রেখে দিতে হবে। সম্ভব হলে একাধিক ব্যাগ ব্যবহার করা ভালো। ব্যাগের ভেতরের জিনিসগুলো জীবাণুনাশক দ্রবণ দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। বই-খাতা-কাগজের ক্ষেত্রে অবশ্য তা করার সুযোগ নেই। এগুলো আলাদা জায়গায় রেখে দেওয়া ভালো। যেখানে কেউ সেগুলো স্পর্শ করবে না। শিশু হাত পরিষ্কার করে সোজা চলে যাক গোসলখানায়। জামা-জুতা প্রভৃতি ধোয়ার জায়গায় রেখে (শিশুর নিজে ধোয়ার অভ্যাস না থাকলে) নিজে গোসল করে নিক সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে। চাইলে এসব সেরে এসে এরপর শিশু নিজে বাকি জিনিস জীবাণুমুক্ত করার কাজে হাত লাগাতে পারে। তবে এ কাজের পরও তার হাত ধোয়া নিশ্চিত করতে হবে।

জোরাজুরি নয়, সময় দিন

ঘুম ভেঙে উঠে স্কুলের জন্য তৈরি হওয়ার তাড়া ছিল না এত দিন। রোজনামচার নতুন হিসাব-নিকাশে অভ্যস্ত হতে শিশুকে একটু সময় দিন। অল্প কিছু শিশু স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে আলসেমির কারণে কিংবা সংক্রমণের ভয়ে। অভিভাবক হিসেবে স্কুলে যেতে উৎসাহ দিন, ইতিবাচক দিকগুলো বুঝিয়ে বলুন। বন্ধুরা সবাই আসবে, সবার সঙ্গে দেখা হবে—এই ভাবনাগুলো অধিকাংশ শিশুকে আগ্রহী করে তুলবে। নিজে সঙ্গে করে নিয়ে যান স্কুল প্রাঙ্গণে। স্কুলের জীবনটা কী ভীষণ আনন্দের, সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন শিশুর সঙ্গে। তবে পড়ালেখায় গতি আনতে চাপ প্রয়োগ করবেন না। শিশু স্কুলে যেতে অভ্যস্ত হোক, তার সুষ্ঠু মানসিক বিকাশ হোক। ধীরে ধীরে পড়ালেখাতেও আগ্রহ আসবে। একটু বড় শিশু হয়তো নিজেই বুঝে নেবে অনেকটা, তবে অন্যদের ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নিতে সময় দিতে হবে।

স্কুল ও বাড়িতে

বাড়িতে তো শরীর-মনের সুস্থতার জন্য আবশ্যক সবকিছু শেখাতে হবেই। স্কুলেও মনে করিয়ে দেবেন শিক্ষকেরা। রোজ আলাদা ক্লাসও হতে পারে স্বাস্থ্যবিধির ওপর। স্কুলের প্রবেশপথে স্যানিটাইজার ব্যবহার এবং তাপমাত্রা পরিমাপ হোক। স্কুল প্রাঙ্গণে মজার ছবি ও আকর্ষণীয় লেখার মাধ্যমে শিশুকে স্বাস্থ্যবিধি স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। অসুস্থ শিশুকে স্কুলে পাঠানো যাবে না। স্কুলে গিয়ে শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে। প্রয়োজনে প্রাথমিকভাবে আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থাও থাকা উচিত। শিশুদের টিকা–সংক্রান্ত জাতীয় নির্দেশনা মেনে চলাও আবশ্যক।

বন্ধুর থেকে নাহয় দূরে বসতে হলো, নাই–বা হলো একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা। তবু একই শ্রেণিকক্ষে বসে কথা বলার কয়েকটা দিন তো পাওয়া গেল। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইতিবাচকতার নান্দনিক পরশ বুলিয়ে দিন শিশুর কোমল মনে। শিশুবান্ধব পরিবেশে এভাবেই বেড়ে উঠুক মানবিক গুণসম্পন্ন শিশু।

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন