পরিবার

পরিবারই ভরসা

পরিবারই সবচেয়ে আপন—করোনা মহামািরর দুঃসময়ে সেটা আবারও প্রবলভাবে বোঝা গেল। মডেল: দিলু মজুমদার, শামা, উল্কা হোসাইন ও বাপ্পা। কৃতজ্ঞতা: ঠিকানা ডে আউটার্স অ্যান্ড ক্যাফে
পরিবারই সবচেয়ে আপন—করোনা মহামািরর দুঃসময়ে সেটা আবারও প্রবলভাবে বোঝা গেল। মডেল: দিলু মজুমদার, শামা, উল্কা হোসাইন ও বাপ্পা। কৃতজ্ঞতা: ঠিকানা ডে আউটার্স অ্যান্ড ক্যাফেছবি: সুমন ইউসুফ
বিজ্ঞাপন

জানালার পাশের সিটে বসে আছি। সাঁই সাঁই করে বাস ছুটে চলেছে। পেছনে ফেলে যাচ্ছে টিনের ঘর, টংয়ের দোকান, বাজার, ফাঁকা মাঠ, সারি সারি গাছ, মানুষ, ধানখেত, খেজুরগাছ, পুকুর, জনজীবনের টুকরা টুকরা গল্প। বিকেলের আমেজ ছড়িয়ে আছে প্রকৃতিজুড়ে। বাসের মানুষ কেউ গল্প করছে, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ চুপচাপ ঘুমাচ্ছে।

ঠিক পাঁচ মাস আগে, ১৯ মার্চ। এই একই পথের উল্টো দিকে এমনই একটি বাসের জানালার সিটে বসে বাড়ি ফিরেছিলাম যশোরের কেশবপুরে। সেদিন সবার মনেই ছিল অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি আর উদ্বেগ। কারণ, বাংলাদেশে মার্চে শুরু হয় করোনা মহামারি। অচেনা ভাইরাসের ভয়ে আমারই মতো অনিশ্চয়তা নিয়ে সেদিন বাসে অনেকেই ঢাকা ছেড়েছিলেন। পৃথিবীতে এই সময়ে জীবিত সব মানুষই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটিয়েছে গত কয়েক মাস, কাটাচ্ছে এখনো।

বিশ্বব্যাপী মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন বেড়েছে। জীবিত সবাই নিজেকে, পরিবারকে আর প্রিয়জনকে নিয়ে আতঙ্কে ভুগেছে। বাইরে যাওয়া হয়ে পড়ে সীমিত। সাধারণ ছুটিতে নিজেদের আটকে রেখেছে চার দেয়ালের মধ্যে।

প্রথমবারের মতো এত দীর্ঘ সময়ের জন্য অধিকাংশ মানুষ ঘরের মধ্যে কাটিয়েছে গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে করেছে বাজার-সদাই বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ। শহরের রাস্তায় ঘুরেছে পশু–পাখি, গাছগুলো ছেয়ে যায় সবুজে, সৈকতে খেলে ছিল ডলফিন, নদীতে বেড়ে গিয়েছিল মাছ। আর মানুষ ছিল গৃহবন্দী।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। করোনার সময়ে ক্লাসরুম ছেড়ে গেলেও অনলাইনে কাজ বন্ধ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের কিছুদিনের মধ্যেই আমার প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। আমাদেরও ফিরতে হয় জুম ক্লাসে। পড়ানো, ছোট ছোট অনলাইন পরীক্ষা নেওয়া, সেগুলো যাচাই করে নম্বর দেওয়াসহ নিয়মিত সব কাজই চলতে থাকে অনলাইনে। আমি প্রতিদিন চাকরি–সংক্রান্ত কাজ সেরে ফিরে আসতাম নিজের জগতে। আমার ঘর, মা, প্রকৃতিতে। এই ছিল আমার নিয়মিত রুটিন।

করোনার ভয় আর অনলাইনের কাজের সময়গুলোতে আমি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করি। মনে হতো, এই মুহূর্ত যে বেঁচে আছি, এটাই বুঝি বোনাস। খুব ছোট ছোট জিনিসে আমি খুশি হওয়া শিখি। যেমন আমগাছের ডালে দোয়েল বসে আছে, কিংবা টিনের চালে হনুমান বসে সফেদা ফল খেয়ে ফেলছে, মা গরুর দুধ দুইছেন ইত্যাদি সব সাধারণ বিষয় প্রচণ্ড বিস্ময় তৈরি করত। ঢাকায় প্রচণ্ড ব্যস্ত জীবনে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার মতো গ্রামের মেয়ের পাখির ডাক শুনে ঘুম থেকে ওঠার এক পুরোনো অভ্যাস আছে।

নদীর জলে কচুরিপানা, পাড়ে ঘাসের ওপর বসা, চোখ বন্ধ করে নারকেলের পাতা বাতাসে নড়ার শব্দ শোনা, নিজের খেত থেকে ফসল তুলে রান্না করা—আমাকে নতুন এক আমির সন্ধান দেয়। যে আমিকে শহুরে জীবনে হারিয়ে ফেলেছিলাম কাজের চাপে। আমার লেখা সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটা আমি এই করোনাকালেই লিখেছি। আমার গ্রামে বসে।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে থাকতে থাকতে আমরা শিখে গিয়েছি কীভাবে করোনাকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচতে হয়। স্বাস্থ্যবিধি মানার অভ্যস্থতা আমাদের নতুন স্বভাবিক অবস্থায় চলতে সাহস জোগাচ্ছে। ক্ষুধা, জীবিকার প্রয়োজন আর আমাদের নিত্যদিনের জীবনাচরণের অভ্যাস আমাদের আবার রাস্তায়, অফিস-আদালতে, বাস-ট্রেনে টেনে নামিয়েছে। প্রয়োজনের দোহাই দিয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে প্রায় সবাই। সেই দলে আছি আমিও।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

২০১৩ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সে বছর জানুয়ারিতে ঢাকায় আসি। প্রথমবার বাড়ির বাইরে। নতুন শহর, নতুন সবকিছু। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, পড়াশোনার চাপ, বন্ধু-আড্ডা, পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টা, চাকরি শুরু করে সেখানেও নতুনভাবে নিজেকে অভ্যস্থ করার সাত বছরের এক লম্বা যাত্রা। থামার ফুরসত মিলেছে ওই ঈদের ছুটিগুলোতে। তা–ও সেই বাঁধাধরা কয়েক দিন। জীবনযাত্রায় দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম প্রায়। প্রতিদিন রুটিন কাজের ফাঁকে বাবা–মায়ের খোঁজ না নিতে পারাটাই হয়ে গিয়েছিল প্রতিদিনকার অভ্যাস।

ঠিক এমন এক সময়ে, মহামারির আকাল আমাকে থমকে দিল। জীবাণুর ঝুঁকিতে যখন নিশ্বাস হয়ে আসছিল ভারী, পদে পদে ভয়, আমি তেমন একদিনে বাড়ি যাওয়ার বাসের টিকিট কেটেছিলাম। যেখানে আমার জন্য অধীর অপেক্ষায় বসে আছে আমার পরিবার। দিনের শেষে পরিবারই যে সবচেয়ে সত্য, সেটা আবার মনে হলো বাড়িতে থাকার এই সময়ে।

আজ ফিরতি পথে মনে আসছে সেই সব সময়ের অমূল্য স্মৃতিগুলো। দুর্দিনে আমি বারবার টের পেয়েছি, পরিবার আর বাড়িতে আমার ঘরটা জীবনের সবচেয়ে নির্ভরতার স্থান। ঢাকাকে যখন স্বজনহীন অনিরাপদ বিপৎসংকুল মনে হয়েছিল, আমি তখন ফিরে গেছি মায়ের কাছে, আমার নিজস্ব বাড়ি-উঠান-প্রকৃতির কাছে। গ্রামের বাড়িতে নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে অনেক সময় উঠানের শেষ কোনায় বাঁশতলায় বসেও ক্লাস নিয়েছি। কিন্তু কখনো বিরক্তি তৈরি হয়নি। কারণ, সারা দিন কাজের পরেও আমি মায়ের হাতের রান্না খেয়েছি। মায়ের পেছনে পেছনে অকারণে ‘মা মা’ ডেকে খুনসুটি করেছি, রাতে মায়ের সঙ্গে ঘুমিয়েছি শান্তির ঘুম।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বভাবিক কর্মক্লান্ত জীবনে আমি প্রায়ই ভাবতাম, আর কি কোনো দিন কৈশোরের মতো বাড়িতে গিয়ে থাকাতে পারব? মহামারির দুঃসময় আমাকে সেই সুযোগটুকু দিয়েছিল, যা আমার এই ছোট্ট জীবনে বিশেষ ঘটনাগুলোর একটি।

এই বিশেষ ছুটির শেষ হলো। বাড়ি থেকে বের হলাম কর্মক্ষেত্র ঢাকার উদ্দেশে। আসার সময় বাবা–মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। অজান্তেই বুকটা ভারী হয়ে চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকল। বাসে উঠে বসলাম, মা আর বাবা বাসের দরজা বরাবর দাঁড়িয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল।

এখন সন্ধ্যা। জানালার পাশের সিটে আমি বসে এসবই ভাবছি। জানালার আকাশে এক খণ্ড বাঁকা চাঁদ। কানে ইয়ারফোন। বেজে চলেছে সুবীর নন্দীর বিখ্যাত গান, ‘পাখি রে তুই দূরে থাকলে কিছুই আমার ভালো লাগে না’। আমার মনে ভাসছে আমার প্রিয় সব মানুষের মুখ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন