বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

ঘরে আমার ছেলেমেয়েদের দেওয়া স্মার্টফোন, কিন্তু মূল কাজ চলে আমার সেই পুরোনো ফোনে। তবে আমি কম এগিয়েছি, সেটাও বলা যাবে না। আমার ডেস্কটপ, ল্যাপটপ দিয়ে ফেসবুক আর জুম, স্ট্রিমইয়ার্ডের আলোচনায় অংশ নিই। ঘরে বসে সম্মেলনে দেশ-বিদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের এক বড় মাধ্যম হলো ডিজিটাল প্রযুক্তি। একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে। আমি পৃথিবীর অনেক দেশে এত অগ্রসর প্রযুক্তি পাইনি।

জাতিসংঘ প্রবীণদের জন্য প্রতিবছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ঘোষণা করেছে। আর সেই দিবসের এ বছরের থিম, ‘সব বয়সীর জন্য ডিজিটাল সমতা’। অনেক স্থানে ইন্টারনেটের অধিকার না থাকাতে বাড়ছে ডিজিটাল–বৈষম্য। জোর দেওয়া হচ্ছে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি। তাঁদেরকে এর আওতায় আনা শুধু নয়, তাঁদের অংশগ্রহণ যাতে অর্থবহ হয়, সেদিকেও জোর দেওয়া হয়েছে।

করোনাকালে অনেক তরুণ ছাত্রছাত্রী থেকে গেছে ইন্টারনেটের আওতার বাইরে। আর প্রবীণদের অধিকাংশ যে এই জগতে প্রবেশই করতে পারেননি, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সবার স্মার্টফোন বা কম্পিউটার থাকবে, সেটা ভাবা তো দুরাশা।

আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে ঘটেছে দ্রুত ডিজিটাল উদ্ভাবন। যা আমাদের বেঁচে থাকার ধরন, কাজ করা—সবকিছুতে এনেছে পরিবর্তন। টেকসই উন্নয়নের জন্য এ এক মাইলফলক। কিন্তু আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন বলছে, নারী আর প্রবীণদের মধ্যে ডিজিটাল ক্ষেত্রে বিশাল বৈষম্য। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ইন্টারনেটে তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ আর ভাগাভাগি করার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়লেও অনেক নারী এবং বৃদ্ধ সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাঁরা সেসবের আওতায় নেই বা প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুবিধা পাচ্ছেন না। অথচ সব মানুষের জন্য এর ব্যবহার হচ্ছে আজকাল ব্যাপক হারে।

করোনার এই সময়ে অনলাইন অফিস, অনলাইন স্কুল, পরিবার আর বন্ধুদের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রযুক্তির জুড়ি নেই। প্রবীণদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমে নির্ভরতা দৈনন্দিন অনেক কাজ করে দিতে পারে আরও সহজ। যে বাড়িতে প্রবীণ একা থাকেন বা তাঁরা স্বামী-স্ত্রী মিলে থাকেন, সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার তাঁদের জীবনকে আরও আরামদায়ক করে দিতে পরে। ডিজিটাল পরিষেবার কথা যদি বলি, ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন লার্নিং, টেলিমেডিসিন, বাজারঘাট থেকে শুরু করে কাজে সাহায্যকারী—সবই ডেকে আনা সম্ভব কারও সাহায্য ছাড়া।

বয়স হয়ে গেলে অনেক সময় মনে হয়, আমি অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি, যা অনেকের ভালো লাগে না। তিনি যদি প্রযুক্তিবান্ধব হন, তাহলে সেই নির্ভরশীলতা সহজেই কমিয়ে আনতে পারেন। এখনো পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ এর ব্যবহার করে মাত্র। আমি নিজেই অনেক কিছু জানি না। তবে গুগল করে বা ইউটিউব টিউটোরিয়ালের মাধ্যমেও অনেক কিছু শিখে নেওয়া যায় কারও সাহায্য ছাড়া। বাড়িতে নাতি-নাতনি, সন্তানেরা থাকলে তাদের সাহায্য নিয়েও শেখা যেতে পারে।

প্রবীণদের কেবল প্রযুক্তির আওতায় আনা নয়, হাতে-কলমে শিক্ষা দিলে ভালো। কারণ, সারা বিশ্বেই প্রবীণদের অবদান রাখার সম্ভাবনা বিপুল। তাই তাঁদেরকে আধুনিক হাতিয়ারে সজ্জিত করলে সেটা হবে সম্ভাবনার বিশাল আধার। ষাটোর্ধ্ব মানুষ পৃথিবীতে এখন ৭০ কোটি। ২০৫০ সালে সেটা হতে পারে ২০০ কোটি। সংখ্যার দিক থেকে সেটা কিন্তু কম নয়। তাঁরা যেন সম্মান আর মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারেন আর সমাজে নাগরিক হিসেবে পূর্ণ অধিকার নিয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন, সেই উদ্যোগ জরুরি। প্রবীণদের অবস্থা পরিবার আর সমাজে বটবৃক্ষের মতো। আমরা অনেক সময় তাঁদের অবজ্ঞা-অবহেলা করি। আর এসব নতুন প্রযুক্তি তাঁরা শিখে চালাতে পারবেন না ভেবে অবজ্ঞা করি। অনেক সময় প্রবীণেরা নিজেও ভয়ে ভয়ে থাকেন। তবে একবার সাহস করে সামনে আসুন, আপনার প্রজ্ঞা আর মেধা দিয়ে সব জয় করতে পারবেন।

আমি একজন প্রবীণ হিসেবে ডিজিটাল দুনিয়াতে চাই সম-অধিকার। যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য। আমিও অন্যদের মতো এর আওতায় এসে ব্যবহার করব সব হাতিয়ার। কেবল স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা নয়, দৈনন্দিন সব কাজের ব্যবহার করতে পারব। প্লেনের টিকিট কাটা, অনলাইনে কেনাকাটা কিংবা জমা টাকার মুনাফার খোঁজ নিতে ব্যাংকে গিয়ে লম্বা লাইন ধরার বদলে অনলাইনেই এক ক্লিকে দেখে নেওয়ার মতো সুবিধাগুলো শুধু ধরতে পারতে হবে। আর একবার সেটা ধরতে পারলে বাড়িতে বসেও বাইরে টোটো করে ঘুরে বেড়ানো সন্তানের ওপর ছড়ি ঘোরাতে খুব একটা অসুবিধা হবে না (এটা ভেবে মিটিমিটি হাসতে পারেন)।

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন