default-image

পরিবারের গুরুত্ব বোঝার বছর

দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে নানা ধরনের খবরে সয়লাব হতে থাকে চারপাশ। পরিবার বা কাছের মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা ও মন্দবাসা দুটোই পেয়েছে মানুষ। ভাইরাসের চরিত্রের কারণে হয়তো প্রিয়জনকে মাসের পর মাস না দেখে কাটাতে হয়েছে একই শহরে থাকা সন্তানকে। কেউ কেউ পরিবারের সুরক্ষার কথা ভেবে অনেকদিন পরিবার ছেড়ে বাইরে থেকেছেন। ঘরবন্দী সময়ে পুরোটা পরিবারের সঙ্গেই কেটেছে। এই সময়ে সন্তান যেমন বাবা–মাকে কাছে পেয়েছে সারাক্ষণ, স্বামী-স্ত্রীও নিজেদের সময় দিয়েছেন পর্যাপ্ত। যেকোনো বিপদে পরিবারই সবার আগে, সেই ভাবনা এসেছে বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে। তবে পরিবারের নিষ্ঠুরতার খবরও আছে। অসুস্থ বাবা-মাকে সেবা করেছেন অনেকে, সংখ্যায় কম হলেও কেউ আবার প্রিয়জনকে ফেলে গেছেন একা। তবে সব মিলিয়ে পরিবার যে ভরসার জায়গা, আস্থার জায়গা, সেই উপলব্ধি এসেছে নতুন করে।

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রযুক্তির প্রতি নির্ভরতা বেড়েছে

প্রযুক্তির নানামুখী সুবিধা যেন এই বছরই নিয়েছে মানুষ। প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে এত দিন সশরীরে উপস্থিত না হলে নানা অভিমানী কথা শোনা যেত। সেই আত্মীয়রাই হয়তো এবার বলছেন ভিন্নকথা, বাসায় না এসে ফোন বা ভিডিও কলে যোগাযোগ রাখাতেই খুশি তাঁরা। গোটা অফিসটাকে রাতারাতি টেনে নেওয়া হয়েছে বাসায়। ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ সম্ভব হয়েছেই প্রযুক্তির কারণে। শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অফিশিয়াল আলোচনা, জুম মিটিং, গুগল মিটে নানা রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কেউ পঞ্চগড় থেকে আবার কেউ বরিশালে বসে। যাঁর যাঁর ঘরে থেকে অফিস করার এই সুবিধা মিলেছে ইন্টারনেটের সুবিধার কারণে। টেলিমেডিসিন সেবাও জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবার।

মানুষ মানুষের জন্য

মানুষ যে মানুষের জন্য, সেই কথা মহামারির বছরে প্রবলভাবে ফিরে এসেছে। ঘরের কাজে সাহায্যকারী থেকে বাইরের দিনমজুর, নিম্ন আয়ের এমন সব মানুষের জন্য এগিয়ে এসেছে মানুষই। কেউ হয়তো গোপনে দান করেছেন, কেউ সাহায্য করেছেন প্রকাশ্যে। দলগতভাবে নানা ধরনের উদ্যেগ নিতে দেখা গেছে তরুণদের। বিভিন্ন সংগঠন থেকে খাবার, ওষুধ, অর্থ, পোশাকসহ নানা ধরনের সাহায্য করতে দেখা গেছে অসহায় মানুষকে। কারও হয়তো হাসপাতাল দরকার, কারও দরকার রক্ত, সেসবও ব্যবস্থা করতে দেখা গেছে অনেককে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ভাইরাসে আক্রান্ত লাশের সৎকার করতে দেখা গেছে নানা সংগঠন ও ব্যক্তিকে।

অনলাইন কেনাকাটায় আস্থা

ঘরে বসে পয়লা বৈশাখ, ঈদ, পূজার মতো নানা রকম উৎসবে কেনাকাটা করেছে মানুষ। ২০১৯ সালে যে দোকানে অনলাইন বিক্রির পরিমাণ ছিল, সব মিলিয়ে পাঁচ লাখ টাকার মতো, এবার সেই দোকানেই বিক্রি হয়েছে কোটি টাকার কাছাকাছি।

পোশাক, গয়নার মতো ফ্যাশন পণ্য ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করতেও অনেকে অনলাইনের ওপর ভরসা বাড়িয়েছেন। বেড়েছে অনলাইন দোকানপাটের সংখ্যাও। একটি অনলাইন গয়নার দোকানে কথা বলে জানা গেল, এবার তাদের পয়লা বৈশাখে বিক্রি হয়েছে ১৩ লাখ টাকার গয়না। ই-ক্যাবের হিসাবে, দেশে ই-কমার্সের বাজারের আকার এখন ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা জার্মান ওয়েব পোর্টাল স্ট্যাটিস্টার জুলাই মাসের হিসাবে, চলতি বছর বাংলাদেশে ই-কমার্সের আকার দাঁড়াবে ১৯৫ কোটি ডলারের বেশি।

ভোক্তারাও অনলাইনে কেনাকাটায় আস্থা বাড়িয়েছেন করোনাকালে। এখন যেকোনো জিনিস পাওয়া যায় ই–কমার্স বা এফ–কমার্সে।

ঘরেই বিনোদন

থিয়েটার বা সিনেমা হলের দরজা বছরের বেশির ভাগ সময় ছিল তালাবদ্ধ। তাই ঘরেই বিনোদনের জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবার। টেলিভিশনের দর্শক বেড়েছে এবার। ওটিটি (ওভার দ্য টপ) প্ল্যাটফর্মের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। বিবিসির খবর বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই সারা বিশ্বে নেটফ্লিক্সের নতুন গ্রাহক হয়েছেন ১ কোটি ৬০ লাখ (১৬ মিলিয়ন)। ইউটিউবেও নানা ধরনের নাটক, সিনেমা, তথ্যচিত্র, রান্নার ভিডিও, গানসহ নানা কিছু দেখা হয়েছে কোটি কোটি বার। দেশি ও ভারতীয় ওটিটি বঙ্গ, বিঞ্চ, হইচই, আড্ডা টাইমস, জি ফাইভের গ্রাহকও বেড়েছে এই বছর। সেখানে নানা ধরনের ওয়েব সিরিজ, সিনেমা ছিল বছরজুড়ে আলোচনায়। অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন অনলাইনে নিয়মিত অনুষ্ঠান করেছে বিশেষ দিবস উপলক্ষে। সেসব অনুষ্ঠান দেখেছেন হাজার হাজার দর্শক।

default-image

সবাই মিলে ঘরের কাজ

এত দিন যে কাজগুলো বাসার সহকারী দিয়ে করানো হতো, তা করছেন বাড়ির সবাই মিলে। নিজেদের সুরক্ষার জন্য কাজের লোক ছাড়িয়ে নিজেরাই হাত লাগিয়েছেন ঘরের কাজে। নারীদের পাশাপাশি পুরুষেরা সেসব কাজে আগের তুলনায় কিছুটা বেশি সময় দিয়েছেন। ঘরের কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করছে সন্তানেরা। অনেকে কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। রান্নার প্রতি অনেকের আগ্রহ বেড়েছে। নানা ধরনের নিরীক্ষাধর্মী খাবার রান্না করতে দেখা গেছে অনেককে।

default-image
বিজ্ঞাপন

বেড়েছে ইনডোর গেমের প্রচলন

লুডু, দাবা, ক্যারম, পাশা, কার্ড ইত্যাদি খেলা পুরো বছর ছিল জনপ্রিয়তায়। যেহেতু সবাই ঘরেই ছিলেন বেশির ভাগ সময়, তাই এসব খেলা নতুন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এই বছর। লুডুর বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় বিজ্ঞাপনও দিতেও দেখা গেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে। এসব খেলার অনলাইন সংস্করণ ডাউনলোড হয়েছে আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এ ছাড়া পাবজি, অ্যামং আস, ভ্যালোরেন্ট, ক্যান্ডি ক্রাশসহ নানা রকম অনলাইন গেমের প্রতি আসক্তি বেড়েছে মানুষের। লুডু বা দাবার মতো খেলার তো অনলাইনে রীতিমতো টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে দেখা গেছে অনলাইনে।

মনের স্বাস্থ্যে মনোযোগ

এবার অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মনোবিদের পরামর্শ নেওয়ার মতো ঘটনা চোখে পড়েছে। কয়েকজন মনোবিদের সঙ্গে কথা বলে সেটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেয় এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেও জানা যায়, অন্য বছরের তুলনায় এবার ব্যক্তিগতভাবে অনেকে কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হয়েছেন। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজ ও ব্যক্তিগত চাপে থাকা মানুষ তাঁদের মনের কথা খুলে বলেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদদের কাছে। অধুনার মন বিভাগেও পাঠকদের নানা ধরনের জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়েছেন মেহতাব খানম। অনেকেই যে কথা মনোবিদদের কাছে বলতে সংকোচ বোধ করতেন, এবার সেসব বিষয়েই আরও খোলামেলা আলোচনা করেছেন তাঁরা। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান মনের বন্ধুর তথ্যমতে, ইউএনডিপি–মনের বন্ধুর যৌথ উদ্যোগে গত পাঁচ মাসে ১১ হাজার ৬৯০টি ফোনকল এসেছে মানসিক সেবা সংক্রান্ত। এরমধ্যে ৭৩.০৪ শতাংশ সেবাই নিয়েছেন তরুণরা। এ ছাড়া নারীদের সেবা নেওয়ার পরিমাণ ছিলো ৬২.৯ শতাংশ।

default-image

যোগাসনে শরীর ঠিক

নিজের শরীর ঠিক রাখতে এবার যোগাসনের দিকে ঝুঁকেছেন অনেকে। এভারগ্রিন ইয়োগার যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক বাপ্পা শান্তনু জানালেন, অনেক ধরনের প্রফেশনে বাধ্যতামূলক যোগব্যায়াম করাতে দেখা গেছে। পুলিশ, ডাক্তারসহ নানা পেশার লোকজন নিয়মিত যোগব্যায়াম করেছেন।

ঘরের ভেতরেও স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে যোগব্যায়াম করতে দেখা গেছে ব্যক্তগতভাবে। যোগাসন ছাড়াও বুকডন, দড়িলাফ, শ্বাসের ব্যায়ামে আগ্রহ বেড়েছে মানুষের।

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন