default-image

স্কুল ও পাড়ার ক্রিকেট মাঠের দুই তারকা খেলোয়াড় প্রিয়রঞ্জন আর পলাশ। নবম শ্রেণির সহপাঠী বন্ধু। হরিহর আত্মা। স্কুল শেষে কাঁধে হাত দিয়ে ঘরে ফেরা চাই। বিকেলের মাঠেও যেতে হবে একসঙ্গে। দুজন খেলবে দুই দলে। একজন হারলেও আরেকজনের জয় দুই বন্ধু ভাগাভাগি করে নেয়। এই আনন্দ নিয়েই সন্ধ্যার আগে বাদাম খেতে খেতে দুই বন্ধু ফিরবে শ্মশানের ভেতর দিয়ে। সেখানে শিমুলের ডালে বিকেলফেরত হুজ্জতি পাখিদের সুর তাদের খুব টানে। ডানপিটে প্রিয় মানে প্রিয়রঞ্জনের পাখিদের সুর নকল করার নেশা। যেন সে পাখির সঙ্গে কথা বলে।

সেদিন প্রিয়কে কোনো বাধা দেয়নি পলাশ, তারও ছিল না ঘরে ফেরার তাড়া। বিকেলের আগেই খাঁ খাঁ দুপুরে স্কুল ছুটির পর তারা ঘুরপথে ঢুকে গিয়েছিল শ্মশানের ভেতর। উদ্দেশ্য, কান পেতে হাঁড়িচাচা পাখির সুর শোনা। হাঁড়িচাচার খোঁজ করতে করতে সামনে দাঁড়ায় এক বাদামি রঙের কুকুর। পলাশ আধপোড়া বাঁশ নিয়ে তাড়া করে। খ্যাপা কুকুর প্রিয়র হাঁটুর কাছে কামড় বসায়। চিকিৎসক বাবার ভয়ে আর ব্যথায় কেঁদে ফেলে প্রিয়। বন্ধুর কান্নায় পলাশের বুকের ভেতর গুমরে ওঠে। বুনো ঝোপ থেকে বিষকাটালির পাতার রস পলাশ লাগিয়ে দেয় বন্ধুর ক্ষতে। দুই বন্ধু প্রতিজ্ঞা করে—এ ঘটনা কাউকে বলবে না; এমনি সেরে যাবে ব্যথা। সেদিন হাঁড়িচাচা পাখির সুর না শুনেই ক্ষত নিয়ে বাড়ি ফেরে তারা।

এক দিন পর থেকেই প্রিয়র ব্যথা বাড়ে। জ্বরও আসে। স্কুলে আসে না। পলাশ খবর নিয়ে জানতে পারে প্রিয় শব্দ, এমনকি বাতাসও সইতে পারছে না। সারা দিন বিড়বিড় করে মাটিতে ছক আঁকে, কাউকে দেখলেই পাখিদের সুর নকল করে ডাকে। কয়েক দিন পর জানা গেল, প্রিয় পানি দেখলেই ভয় পায়। পানিতে ভেসে ওঠে বন্ধু পলাশের মুখ। বন্ধুকে গিলতে পারবে না বলে প্রিয় এক ফোঁটা পানিও খায়নি কয়েক দিন। শেষমেশ জলাতঙ্কে মৃত্যু হয় প্রিয়র।

বিজ্ঞাপন

প্রিয়র এই মৃত্যু মানতে পারেনি পলাশ। উদাসীন হয়ে পড়ে। নিজেকে অপরাধী মনে হয় তার। পুরোনো বন্ধুদের এড়িয়ে চলে। কোনোরকমে মাধ্যমিক পাস করলেও টানা দুবার উচ্চমাধ্যমিকে ফেল করে পরিবারের বড় ছেলে পলাশ। মা–বাবার অনুরোধে পুরোনো বন্ধুরাই এগিয়ে আসে। পলাশকে পড়াশোনায় ফেরায়। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণি নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন পলাশ। এখন অনেকটাই ভালো হলেও সেই পুরোনো উদাসীনতা রয়ে গেছে তাঁর। একটা কলেজে শিক্ষকতার চাকরিও হয়। কিন্তু উদাসীনতার কারণে সেই চাকরি ছেড়ে ফেরেন গ্রামে। এখন বেকার। এই মধ্যবয়সেও প্রিয় বন্ধু হারানোর শোকে হঠাৎ মন চাইলেই সবার থেকে আলাদা হয়ে, কয়েক দিনের জন্য হারিয়ে যান পলাশ।

কথা হয় পলাশের সঙ্গে। বলেন, সেদিন প্রিয়কে বাধা দিলে বা কুকুরকে তাড়া না করলে হয়তো আজ আমাদের দুজনের বয়স একই থাকত। তা আর হলো না। প্রিয় ছোটই থেকে গেল, আর আমি বড় হলাম। প্রিয় নেই বলে এখন আর সুর শুনে বলতে পারি না, এটা কোন পাখির ডাক। সামনে এগোতে পারি না, যখন গাছে গাছে ডেকে ওঠে পাখি। চেষ্টা করেছি, তবু প্রিয়র স্মৃতি ভুলতে পারিনি। পারব না হয়তো কোনো দিন।

যদি কখনো প্রিয়জন নিয়ে চলে যায় সন্ধ্যার ট্রেন, তবে প্ল্যাটফর্মজুড়ে তুমিও পেতে পারো হারানোর গন্ধ। সমস্ত স্পর্শ নিয়ে ট্রেন চলে গেলে যেভাবে একলা হয়ে পড়ে স্টেশন, তার বিষণ্নতায় দাঁড়ালে বেজে ওঠে বেদনার সুর। বেদনার এ সুর দূরত্বজ্ঞাপক। আর দূর ভাবলেই নিশ্চিন্তে চলে যায় প্রিয়তম মানুষের হাসি, ঝলমলে দিন। এ তো গেল প্রিয়জন চোখের আড়াল হওয়ার ব্যথা। কিন্তু খুব কাছের বন্ধু-মানুষ যদি চিরতরে হারিয়ে যায় জীবন থেকে! এর ব্যথা কতটা হতে পারে, সেই ব্যথা জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে, তা হয়তো নিজের কেউ না হারালে বোঝা যাবে না। তবে পলাশের মতো কাউকে দেখে হয়তো অনুমান করা যাবে।

কিন্তু এ অনুমান পালকখসা পাখির কষ্ট আর কতটা ধরতে পারে। মায়ের মৃত্যুর শোক তাই পঞ্চগড়ের এই কাঞ্চন-রোদের দিনও ঢেকে দেয় অন্ধকারে, যা অনায়াসে ঠেলে দেয় দুই আত্মজাকে মৃত্যুর দিকে (১১ নভেম্বর, প্রথম আলো)। প্রিয়জনের মৃত্যুতে বয়স্ক মাত্রেরই এমন প্রতিক্রিয়া হতে পারে। বেঁচে থাকা বাকি প্রিয়জনদের তাই বন্ধু হয়ে কাছে আসতে হয়, রাখতে হয় আশ্বাসের হাত, যেন অজানিতে কোনো অন্ধকার তাকে গ্রাস না করে।

আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকে ঘরবন্দী অমলের জানালার পাশ দিয়ে মল ঝমঝম করে হেঁটে ফুল তুলতে যাওয়া শশী মালিনীর মেয়ে সুধার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। একটু আলাপেই অসুস্থ অমলের সঙ্গে যার ভাব জমে গিয়েছিল। অমলের সঙ্গে বন্দী হয়ে বেনে-বউ পুতুলের বিয়ে দিতে চেয়ে সেদিনের মতো ফুল তুলতে গিয়েছিল সুধা। অপেক্ষায় ছিল অমল। সুধা যখন আবার ফুল হাতে অমলের কাছে ফিরে এসেছে, ততক্ষণে প্রদীপের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। আকাশের তারা থেকে জ্বলজ্বলে আলো আসছে ঘরে। অমল ঘুমিয়েছে চিরঘুম। রাজকবিরাজকে ফুলগুলো দিয়ে হাহাকার নিয়ে সুধা কেবল বলেছে, যদি ও কখনো জাগে ‘বোলো যে, সুধা তোমাকে ভোলেনি।’

বাস্তবে গিনি আর রাসেলের পরিস্থিতি কিছুটা অন্য রকম। তাঁরা দুজনে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিভাগের শিক্ষাসফরে গিয়ে সাগরে ডুবে মৃত্যু হয় রাসেলের। এই শোক মানতে পারেননি রাসেলকে নিয়ে সংসারের স্বপ্ন দেখা গিনি। ক্যাম্পাসে ফিরে ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন তিনি। বন্ধু ও কাছের মানুষদের আর চিনতে পারছিলেন না। পরে বাবা ক্যাম্পাস থেকে গিনিকে বাড়ি নিয়ে যান একেবারে। তারপর গিনির আর খোঁজ জানা হয়নি। শুধু মনে পড়ে, বাবার সঙ্গে বাসে ওঠার আগমুহূর্ত পর্যন্ত গিনি বিড়বিড় করে আঙুলে সমুদ্রের ঢেউ গুনছিলেন। আমরা জানি না গিনি কি রাসেলকে ভুলেছে এখন? তার শেষ হয়েছে কি না সমুদ্রের ঢেউ গোনার মৌসুম; আমরা জানি না, তাঁর গোপন কান্না ঠিক কতটা নিঝুম।

বিজ্ঞাপন

শোক কাটাতে দরকার সামাজিক সহযোগিতা

ডা. মো. জোবায়ের মিয়া

সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোরোগ বিভাগ, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর।

আপনজনের আকস্মিক মৃত্যুর শোকে কেউ বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। কেউ এমন মৃত্যু খুব কাছ থেকে দেখলে তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, এমনকি আত্মহত্যার চেষ্টাও কেউ কেউ করতে পারেন। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। অনেকে দুই-তিন মাসের মধ্যে নিজে থেকেই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু যদি সমস্যা দীর্ঘদিন থাকে, তাহলে তা রোগে পরিণত হয়। এই রোগকে বলা হয় পোস্ট ট্রমাটিক ডিজঅর্ডার। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সহযোগিতা।

রোগীকে শুরুতে পরিবারের সদস্য বা কাছের বন্ধুদের একটু বেশি সময় দিতে হবে। যাতে তিনি শোক কাটিয়ে নতুন বাস্তবতায় খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনায় স্বজনের মৃত্যুর বিষয়টি না তুলে অন্য বিষয়ে আলাপ করতে হবে। বিশেষ করে শোক ভুলতে তাঁকে অন্য নানা কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করাতে হবে।

যদি রোগীর ঘুম অনিয়মিত হয় এবং তাঁর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা গভীরভাবে লক্ষ করা যায়, তাহলে তাঁকে রিলাক্স থেরাপি নিতে হবে ও ওষুধ খেতে হবে। এ জন্য রোগীকে একজন মনোচিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0