default-image

২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে হঠাৎ করেই আমার শরীরে ধরা পড়ে ইনভেসিভ ডাক্টাল সেল কার্সিনোমা, গ্রেড-২। মানে ক্যানসার।

ঘরে-বাইরে প্রচণ্ড ব্যস্ততার কারণে নিজেকে অনেকটাই অবহেলা করেছি আমি। কখনো টেরই পাইনি শরীরে ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। যখন জানতে পারলাম, তখন অনেকটা সময় পার করে ফেলেছি। প্রথম ধাক্কায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। ভীষণ অনিশ্চয়তা ঘিরে ফেলল। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া শুরু হলো। অসহায়ের মতো আমার জীবনসঙ্গী অধ্যাপক ডা. ফরহাদ মনজুর ও দুই ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেই সঙ্গে অপেক্ষা করতে থাকলাম হিস্টোপ্যাথোলজি রিপোর্টের জন্য।

কিছুদিন পরই ছিল বড় ছেলের এসএসসি পরীক্ষা। কোনো কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। মাথা পুরোই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে রিপোর্ট পেয়ে বুঝতে পারলাম, যা ঘটার ঘটে গেছে। কেন এমন হলো! এখন আর ভেবে লাভ নেই। জীবন যেটা আমাকে দিয়েছে, সেটা মেনে নিলে কষ্ট কম হবে।

এমন একটা সময়ে আমার ক্যানসার ধরা পড়ল, যখন আমি গবেষণার কাজ শেষ করে থিসিস লেখার কাজে ব্যস্ত। ১৬ বছরের কর্মজীবন আমার। এর প্রায় পুরোটাই আছি ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগে। পাঠদানের পাশাপাশি জড়িত আছি বিভাগের বিভিন্ন ছাত্রবিষয়ক কার্যক্রমে। ভীষণ পছন্দের কাজ হচ্ছে ওষুধ আর অসুখ নিয়ে গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা। দেশি-বিদেশি জার্নালে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে আমার ২২টি গবেষণাপত্র। ৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে জার্মানি, ভারতসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে।

২০১৫ সাল থেকে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা। ২০১৬ সালে সেখানে পিএইচডি শুরু করি ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিষয়ে। ক্রনিক কিডনি রোগের ওপর আমার গবেষণা।

বিজ্ঞাপন
default-image

দেশেই চিকিৎসা

ভেবে নিলাম, আরও খারাপ কিছু হতে পারত। মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করলাম। যা হয়ে গেছে, সেটা তো আমি বদলাতে পারব না, কিন্তু লড়তে তো পারব। শক্ত হাতে আমাকে ধরে রাখল ফরহাদ। পরিবারের বাকি সদস্যরা পাশে এসে দাঁড়াল। পাশে পেলাম আমার দ্বিতীয় পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের। বন্ধুবান্ধব ঘিরে রাখল আমাকে। প্রিয় মানুষেরা অস্থির হয়ে গেল আমাকে কীভাবে সাহায্য করবে সেটা ভেবে।

বিদেশ থেকে আমার পুরোনো ছাত্রছাত্রী, বন্ধু–আত্মীয়দের মেসেজে মোবাইল ভেসে যাচ্ছিল। সবার একটাই কথা, ‘আপনাকে সুস্থ হতে হবে, আমরা আপনার পাশে আছি।’ এত ভালোবাসা আমাকে অভিভূত করে ফেলল। একটা সময় মনে হতে লাগল, আমি আসলেই অনেক ভাগ্যবান। মরে যদি যেতেই হয়, লড়াই করেই মরব। অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলো অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীনের হাতে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডা. মেহেরুন্নেসা—দুজনই আমার আত্মীয়। অনেকেই পরামর্শ দিলেন আশপাশের দেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে। সেটা আমার জন্য খুব সহজও ছিল। কিন্তু মন টানছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল, নিজের দেশে, নিজের মানুষের মধ্যে থেকে চিকিৎসা নেব। পরিবারে বেশ কয়েকজন চিকিৎসক থাকায়, প্রথম থেকেই বাংলাদেশের চিকিৎসার ওপর আমি ছিলাম বেশ আস্থাশীল।

দুঃখের দিনে স্বজনদের নির্ভরতা

অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেনের তত্ত্বাবধানে শুরু হলো কেমোথেরাপি। হাসিমুখে থেরাপি নিয়ে বাসায় আসি, মনকে বারবারই বোঝাই, এটা কিছু না, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, ভেতরে ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। কেমোথেরাপি দেওয়ার পরের ১০-১২ দিন প্রচণ্ড কষ্টে কাটে। ধীরে ধীরে যখন সুস্থ হয়ে উঠি, ঠিক তখনই পরবর্তী ডোজের সময় হয়ে যায়। দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক ভর করত।

মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে চাইনি বলে কর্মস্থল থেকে ছুটি না নিয়েই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে লাগলাম। প্রতিটি মুহূর্তে চেষ্টা ছিল, আমার ভেতরের কষ্ট যেন কেউ বুঝতে না পারে। ভুলে যেতে চাইতাম কেমোথেরাপির কথা, ব্যস্ত থেকে পার্শ্ব প্রিতিক্রিয়ার কথা মন থেকে কমাতে চাইতাম। এই সময় আমার ফার্মাসি বিভাগের কিছু সহকর্মীর অবদান ভুলে যাওয়ার নয়। আমার চিকিৎসক শ্বশুর মাহফুজুর রহমান আর মাদলের উদ্যোক্তা আমার ভাবি মাসুমা খাতুন হয়ে গেলেন নির্ভরতার স্থান। আমার রিপোর্ট নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেছে আমার ভাগনে ডা. সালমান সালেহীন। যে এখন দ্য ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস মেডিকেল ব্রাঞ্চে (গেলভাস্টন) রেসিডেন্সি হিসেবে কর্মরত। উন্নত বিশ্বে কী চিকিৎসা চলছে, আমার কী কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, প্রতিটি বিষয় নিয়ে সে আমাকে কাউন্সেলিং করেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে।

default-image

অটুট মনোবলে এগিয়ে চলা

কেমোথেরাপি চলার সময় থিসিসের কাজও চালিয়ে যাচ্ছিলাম। একেকটা কেমো নিয়ে ফিরি আর গবেষণার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ওই সময়ে আমার একটি গবেষণাপত্র বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়। এরই মধ্যে শুরু হলো করোনা মহামারির তাণ্ডব। একদিকে এই কঠিন চিকিৎসা, আরেক দিকে পিএইচডির কাজ। আমি শুধু দিন গুনে কাটাই, কবে শেষ হবে আমার চিকিৎসা।

শাহবাগের আজিজ সুপারমার্কেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছি থিসিস বাইন্ডিংেয়র সময়। আমার পিএইচডি শেষ হচ্ছে, আনন্দে আমি ভুলেই গিয়েছি চিকিৎসার কথা। বাসায় ফিরে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতে দিতেই রাজ্যের কষ্ট আর অশান্তি আমাকে ঘিরে ধরেছে। রাতের পর রাত নির্ঘুম কেটেছে, ভোর হয়ে গেছে, অসহ্য যন্ত্রণা শরীরের ভেতর, সেই সঙ্গে অনিশ্চয়তা। চিকিৎসক স্বামী, তাই ছিল করোনার আতঙ্কও।

আবার ভাবি, আদৌ পিএইচডির ডিফেন্স হবে কি না, হলে কবে হবে? রাতের আঁধার কেটে যায়, ভোরের আলো ফোটে, নির্ঘুম আমি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিই, এভাবে আমার জীবনেও একদিন আলো ফুটবে। তেমনি একদিন, হঠাৎ করে আমার থিসিসের সুপারভাইজার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তপন চ্যাটার্জি আমাকে ফোনে বললেন, ভারতীয় ইউজিসি অনলাইন ভাইভার অনুমতি দিয়েছে।’ ডিসেম্বর ২০১৯ সালের ডিফেন্স হলো ২০২০ সালের জুলাই মাসে। স্যার পরীক্ষকদের অনুমতি নিয়ে আমাকে ড. ফারহানা রিজওয়ান বলে অভিনন্দন জানালেন, সঙ্গে উপস্থিত সবাই। আমি মনে মনে পরম করুণাময়ের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম।

ক্যানসার চিকিৎসা শেষ। এখন মেইনটেনেন্স থেরাপি চলছে। অসম্ভব মানসিক সাপোর্ট দিলেন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য মোহাম্মাদ ফরাসউদ্দিন স্যার। খুশি হয়ে মেইল পাঠালেন আমাকে, লিখলেন, ‘তোমার এই ডিগ্রি আমার জন্য বেস্ট ঈদ গিফট।’

ক্লান্তি ভুলে সবার অভিনন্দনে আমি ভীষণভাবে আপ্লুত এক ক্যানসার যোদ্ধা। আমার প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তিকে ক্যানসারের কাছে হারতে দিইনি। সুস্থ শরীরে, ফুরফুরে মন নিয়ে অনলাইন ক্লাস নিচ্ছি, ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি গবেষণাপত্র লেখায়, আর ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনায়। ভালো লাগে ছাত্রদের নিয়ে কাজ করতে, ছাত্রদের জন্য কাজ করতে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মাসি বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন
প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন