default-image

অনেক আগের খুব সম্ভব বিষ্ণু দে বা অন্য কারও স্মৃতি কাহিনিতে পড়েছিলাম সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বাসায় গিয়ে দেখেন আনমারি বা তাকে সাজানো মাটির পুতুল। নাগরিক জীবনে লোকায়ত শিল্পের সংগ্রহ তাঁদের অবাক করেছিল। পরে দেখি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনও সংগ্রহ করেছেন মাটির পুতুল। আমার মনেও তা ছাপ ফেলেছিল, আমিও সংগ্রহ শুরু করি। যখন যেখানে গেছি, তখন সেখান থেকে একটি বা দুটি পুতুল সংগ্রহ করেছি। কমপক্ষে ৫০টি দেশের প্রায় ২৫০টি পুতুলের এক সংগ্রহ গড়ে উঠেছে। যখন তাকাই সেদিকে, তখন একেকটি দেশ, তার কৃষ্টি, সব ভেসে ওঠে একটি পুতুলের মধ্যে। তবে একটি কথা বলে রাখা ভালো, পুতুল শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে শিশুদের নানা রকম খেলনাই অভিধা পায় পুতুলের। আমি এখানে সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করছি। পুরুষ বা নারীর প্রতিমূর্তিই পুতুল। পাশ্চাত্যের পুতুল তৈরির উপাদান নানা রকমের। এখন অবশ্য তা কাঠ বা প্লাস্টিকে এসে ঠেকেছে। সেখানে মাটির পুতুলের স্থান প্রায় নেই। অন্যদিকে এই বদ্বীপের বা বাংলার পুতুল বলতে মাটির পুতুলই বুঝি। অন্যান্য উপাদানও আছে, যেমন কাঠ বা কাপড় (এখন প্লাস্টিক)। কিন্তু এখন বাংলার পুতুল বললে মাটির পুতুলই প্রাধান্য পায়।

বিজ্ঞাপন
default-image

পুতুলের সংজ্ঞা নির্ধারণে আঁদ্রে মালরোর একটি মন্তব্য বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর সরল বাংলায় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাক্যটি হলো, ‘ইমেজ থেকে দৈব কিংবা দেবতা খসে গেলে পুতুল হয়।’ একই মাটিতে তৈরি, কিন্তু দেবতা হিসেবে যখন কুমার তৈরি করেন, তখন তাঁর দেখার ভঙ্গিটি অন্য রকম, বিশ্বাস বা উক্তি যার উৎস। এ মনোভঙ্গি যখন থাকে না, তখন তৈরি করেন পুতুল—যা জীবিকার উৎস।

কুমার আলাদা পেশারূপেই বাংলায় গড়ে উঠেছে। বদ্বীপে কাদামাটি শিল্পের বড় উপাদান। যে কারণে বলতে পারি, টেরাকোটা বাংলার আদি শিল্প। আড়াই হাজার বছর আগে তৈরি মাটির ফলক বা পুতুল এখনো নান্দনিক দিক থেকে অসামান্য। এ অঞ্চলের মানুষ হদ্দ গরিব, কুমার তো বটেই, কাদা–মাটি তাঁর প্রধান উপাদান। তাই দিয়ে ফিগার (পুতুল) গড়ে তোলেন। মাঝেমধ্যে আঙুলে টিপে তার আকৃতি দেন, সে জন্য পূর্ববঙ্গের পুতুল ‘টেপা পুতুল’ নামেও খ্যাত। এসব পুতুল রোদে শুকানো বা আগুনে পোড়ানো। তবে গনগনে আগুনে নয়, কম আগুনে। আর পুতুল তৈরির উপাদান লাগে সামান্যই।

পুতুলের রকমফের ছিল দুই রকম। একটি বাস্তবসম্মত ইমেজ, অন্যটি প্রতীকী। সারা পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশেই পুতুল নির্মিত হতো। আগে ছিল সব পোড়ামাটির। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘বাস্তবসম্মত’ পুতুলে রঙের ব্যবহার শুরু হয়। কোনো কোনো কুমারের ধারণা হয়, এই পুতুল যাবে নগরের কোনো বাড়ির বসার ঘরে দ্রষ্টব্য হিসেবে। তাঁর অনুমান ঠিক, আর প্রতীকী পুতুলে কখনো রং দেখিনি। গত শতকের সত্তর দশকে ঢাকার রায়েরবাজারের সরাচাঁদ বিভিন্ন আকারের প্রতীকী পুতুল (জ্যামিতিক ফর্ম) তৈরি করতে থাকেন। অনেকে সেগুলো শৌখিন পুতুল হিসেবে সংগ্রহ করেছেন। এখনো করেন।

এই শতকে পুতুলের কদর তেমন নেই। কুম্ভকারেরা পেশা বদলেছেন। যাঁরা আছেন, তাঁরা হাঁড়ি–পাতিল, টব নির্মাণেই ব্যস্ত। তবে প্লাস্টিকের আক্রমণে খুব শিগগির এসব মাটির তৈরি সাংসারিক জিনিসপত্র উঠে যাবে। যেমন উঠে যাচ্ছে মাটির তৈরি পুতুলও। এমনকি প্রতীকী পুতুলও। কারণ, একই ফর্মের পুনরাবৃত্তি সৃষ্টি করে একরকমের খাঁটি টেপা পুতুল এখন প্রায় বিলুপ্ত। কারণ, শিশুরা আর টেপা পুতুল দিয়ে খেলে না। তবে, এখনো বিভিন্ন মেলায় ফিরে ফিরে আসে মাটির খেলনা, পুতুল, গরিব–গুরবাদের জন্য বা লোকাজ সংগ্রাহকদের জন্য।

এই বিলুপ্তপ্রায় শিল্প সম্পর্কে প্রণিধানযোগ্য বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের মন্তব্য—‘খেলনা পুতুল নিছক আনন্দের প্রকাশ, পাঁচবার ভালোলাগার বলীয়ানতায় উদ্ভাসিত। শিল্পীর কবজিতে ধরা দেয় খুশি। সুখের সওগাত সে তখন বানায়, খান্‌চায় খান্‌চায় বানায় পুতুল, হাতি–ঘোড়া, পাখি: চোখের চেনা বাস্তব, চোখে গাঁথা নিসর্গ, লাবণ্য আর সরলতা, শৈশব সারল্যের বর্ণনা আর বিবরণী।’

লেখক: অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ

লেখাটি ২০২০ সালে প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন বর্ণিল বৈশাখে ছাপা হয়েছিল
মন্তব্য করুন