কয়েক মাস বন্ধের পর আবার খুলতে শুরু করেছে রেস্তোরাঁ, তবে বদলে গেছে পরিবেশ। কৃতজ্ঞতা: ভিলা আজুর
কয়েক মাস বন্ধের পর আবার খুলতে শুরু করেছে রেস্তোরাঁ, তবে বদলে গেছে পরিবেশ। কৃতজ্ঞতা: ভিলা আজুরছবি: খালেদ সরকার
default-image

ছয় মাস আগেও রেস্তোরাঁয় ঢুকে চোখ আগে খুঁজত ফাঁকা চেয়ার। তারপর দুম করে বসে, মেন্যুকার্ড হাতে নিয়ে পছন্দের খাবারের ফরমাশ। চারদিকে চামচের টুংটাং, আড্ডার গমগমে আওয়াজ, কোথাও পটভূমিতে হালকা সুর–সংগীত। গত পাঁচ মাস টানা ঘরের ভেতর কেটেছে অনেকেরই। এখন অনেকে বের হচ্ছে প্রয়োজনেই। তাই শপিং মলের মতো খাবারের দোকানগুলোতেও বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। তবে সেখানে বদলে গেছে মানুষের অভ্যাস, সময়টা যে এখন নতুন স্বাভাবিকের।

শহুরে জীবনে গত কয়েক বছরে হু হু করে বেড়েছে বাইরে খাওয়ার সংস্কৃতি। নগরজুড়ে তাই গড়ে ওঠে চেনা–অচেনা নানা রকম রেস্তোরাঁ। মাঝেমধ্যে তো জনপ্রিয় রেস্তোরাঁগুলোতে খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াত মানুষ। সেই দৃশ্য এখন নেই। তবে অল্পবিস্তর মানুষ বাইরে খেতে বের হচ্ছে। অফিস খুলে যাওয়ার কারণেও মানুষ বাইরে খাচ্ছে। তবে নতুন স্বাভাবিক অবস্থায় পা ফেলতে হচ্ছে বুঝেশুনে। বাসা থেকে বের হতে হচ্ছে মাস্ক আর গ্লাভস পরে। রেস্তোরাঁয় ঢোকার আগেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হচ্ছে ঠিকঠাক। সম্প্রতি ঢাকার বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা গেল এই চিত্র।

বনানীর ১৫ নম্বর সড়কের ৬১ নম্বর বাড়িতে মার্চ মাসে যাত্রা শুরু করে ইতালীয় আবহের রেস্তোরাঁ ভিলা আজুর। রেস্তোরাঁ চালুর কয়েক দিন পরই করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বন্ধ করে দিতে হয়। কিছুদিন হলো আবার চালু হয়েছে ভিলা আজুর। মানুষও আসছে এখানে খাবারের স্বাদ নিতে। রেস্তোরাঁর উদ্যোক্তা জাফর ইকবাল বলেন, ‘বেশ কিছুদিন বন্ধ রাখার পর আমরা এটি চালু করেছি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে। গ্রাহক আসার পর প্রথমে তাপমাত্রা মাপা হয়। এরপর হাত–পা জীবাণুমুক্ত করে ভেতরে বসানো হয়। চেয়ার–টেবিলগুলো নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা হয়। রেস্তোরাঁর কর্মীদের থাকার জন্য নিজস্ব একটা ব্যবস্থা আছে আমাদের। এ ছাড়া তাঁদের সারাক্ষণ চলতে হয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে।’

বিজ্ঞাপন
default-image

যাঁরা বাইরে খেয়ে অভ্যস্ত, তাঁদের অনেকের টানা ঘরের খাবারে একঘেয়েমি চলে এসেছে। তাই একবেলা বাইরে কাটানোর পাশাপাশি বাইরের খাবারের স্বাদ নিতে সোজা চলে আসছেন রেস্তোরাঁয়। তবে প্রাণঘাতি ভাইরাসের ভয় আছে তাঁদেরও। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের গ্রিন হাউস রেস্তোরাঁয় দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে খেতে এসেছিলেন ফেরদৌস আহমেদ। তিনি বললেন, ‘করোনার আগে আমরা প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার বাইরে খেতাম। কিন্তু গত কয়েক মাসে বাসাতেই ছিলাম পুরোপুরি। এখন অফিস খুলেছে, বাইরে বের হচ্ছি। তাই ভাবলাম সবাইকে নিয়ে একটু বাইরে খেয়ে আসি।’

চমৎকার অন্দরসজ্জার এই গ্রিন হাউস রেস্তোরাঁয় নিজেদের টেবিলের আশপাশেও তাঁরা উঠে গিয়ে ছবি তুললেন। খাবার আসার আগে একবার বেসিনে হাত ধুয়ে আবার খাওয়ার আগে স্যানিটাইজার ব্যবহার করলেন হাতে।

ঢাকার অনেক রেস্তোরাঁর অন্দরসজ্জা চোখধাঁধানো। খাবার উপভোগের পাশাপাশি অনেকেই ভেতরে নানা ধরনের ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন। এখন সেটা কিছুটা কমে গেছে। তবে এরপরও মানুষ ছবি তুলছে, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে দিচ্ছে। সেসব ছবিতে কিছুটা নতুন ধরনের কমেন্টও চোখে পড়ছে। যেমন একজনের পোস্ট করা রেস্তোরাঁর ছবিতে তারান্নুম বীথি নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘ওখানে কি অনেক মানুষের ভিড় হয়? কত দিন রেস্টুরেন্টে খাই না।’

আগে যে রেস্তোরাঁয় ভিড় বেশি, সেখানেই যেতে দেখা যেত অনেককে। হয় সেখানকার আবহ বা অন্দরসজ্জা টানত, নাহলে খাবারের সুনাম। কিন্তু এখন বেশি ভিড় দেখলেই সেসব রেস্তোরাঁয় যেতে চাচ্ছে না অনেকে। বরং নিরিবিলি কোনো জায়গা বেছে নিচ্ছে। গুলশান ২ নম্বরের রেস্তোরাঁ স্টেক রিপাবলিক যেমন কমিয়ে ফেলেছে আসনসংখ্যা। গুরুত্ব দিচ্ছে সামাজিক দূরত্ব এবং সুরক্ষার দিকে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরদার তাওহিদ আহমেদ জানালেন, ‘দেশে সাধারণ ছুটির পর আমরা রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়ার সুবিধা বন্ধ করে দিই। চালু রেখেছিলাম হোম ডেলিভারি। এখন আবার রেস্তোরাঁ খুলেছি। তবে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব ধরনের গাইডলাইন মেনে খাবার পরিবেশন করছি আমরা। আগে যেখানে ১৪০ জন মানুষের বসার ব্যবস্থা ছিল, সেই একই পরিসরে এখন বসার ব্যবস্থা মাত্র ৪০ জনের।’

অনেক রেস্তোরাঁ বাড়িতে খাবার সরবরাহের (হোম ডেলিভারি) সুবিধা চালু করে করোনাকালের শুরু থেকে। এতে অল্প কিছু আয় হলেও কর্মীদের বেতন দিতে সাহায্য করেছে। আবার নতুন নতুন খাবারেরও দেখা মিলেছে অনেক রেস্তোরাঁয়। এই যেমন, মূলত ইতালীয়, থাই আর কন্টিনেন্টাল রেস্তোরাঁ হিসেবে পরিচিত ভিলা আজুরের স্টেক খেতে ভালোবাসেন অনেক ক্রেতা। করোনার সময় সেই রেস্তোরাঁ থেকে হোম ডেলিভারি করা হয়েছে ইরানি বিরিয়ানি। যার স্বাদের প্রশংসা পাওয়া গেছে ক্রেতাদের ফোনকল থেকে। অনেক রেস্তোরাঁ যখন খরচ টানতে না পেরে বন্ধ করে দিচ্ছেন মালিকেরা, তখন কেউ কেউ আবার টিকে থাকার চেষ্টা করছেন এমন নতুন খাবার তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

অন্দরসজ্জার চাকচিক্য দেখে খাবারের দোকানে এখন ক্রেতা টানা মুশকিল হবে বলে মনে করেন অনেক রেস্তোরাঁর উদ্যোক্তা। তাঁদের মতে, নতুন স্বাভাবিকে নিশ্চিত করতে হবে সুরক্ষা। যিনি খেতে আসবেন, তিনি যেন পুরোটা সময় ভয় বা শঙ্কামুক্ত থাকতে পারেন, সেই সেবা তাঁকে দিতে হবে সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করে। হোটেলের প্রত্যেক কর্মীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা গেল, দুপুরের তুলনায় রাতে কিছুটা ভিড় বাড়ে। অনেকেই সন্ধ্যার পর বাইরে খেতে বের হচ্ছেন। খাবার খেতে এসে যেসব রেস্তোরাঁয় আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত আড্ডায়, সেসব খুব কম চোখে পড়ছে এখন। তবে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েও যে এত ধরনের নিয়ম মানতে হচ্ছে, তাতে কেউ বিরক্ত হচ্ছেন না বলে জানালেন একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক আবুল কাশেম। অনেকে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ফোন করে টেবিল বুক করছেন। এরপর রেস্তোরাঁয় ঢোকার মুখ থেকে বসা পর্যন্ত সব ধরনের নিয়ম মেনে খাবার খাচ্ছেন।

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন