বিজ্ঞাপন

৬. ইডিপাস: গ্রিক নাট্যকারেরা বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবন তার ভাগ্য বা নিয়তির নির্দেশেই চলে। সফোক্লিসের নাটক ইডিপাস (সৈয়দ আলী আহসানের অনুবাদ) পড়ে সত্যিকার অর্থেই গ্রিক ট্র্যাজেডি নামের এক বিপন্ন বিস্ময়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। রাজা লেয়াস দৈববাণী শুনেছিলেন, তাঁর সন্তান জন্মালে সে পিতার হত্যাকারী হবে এবং নিজের মাকে বিয়ে করবে। রাজা এই আসন্ন সর্বনাশকে ঠেকানোর সব রকম চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। কী অসাধারণ রচনাকৌশলে গ্রিক নাট্যকার এই পরিণতিকে সম্ভব করে তোলেন, মুগ্ধ হয়ে তা লক্ষ করি।

৭. কৃষ্ণকান্তের উইল: ‘আমাদের দৃঢ়তর বিশ্বাস এই যে কোকিল অসময়ে ডাকিয়াছিল। গরিব বিধবা যুবতী একা জল আনিতে যাইতেছিল, তখন ডাকাটা ভালো হয় নাই। কেননা কোকিলের ডাক শুনিলে কতকগুলি বিশ্রী কথা মনে পড়ে। কি যেন হারাইয়াছি—যেন তাই হারাইয়া যাওয়ায় জীবনসর্বস্ব অসার হইয়া পড়িয়াছে—যেন তাহা আর পাইব না।’ বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস কৃষ্ণকান্তের উইল পড়ে অলংকারবহুল কিন্তু প্রাণবন্ত এক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। দুটি পঙ্‌ক্তির মাঝখানে ফাঁকা অংশে যে অনেক অব্যক্ত কথা লুকিয়ে থাকে, তার সন্ধানও পেয়েছিলাম সেই গদ্যে। ‘রোহিনীর কলসী ভারি, চাল-চলনও ভারি। কিন্তু রোহিনী বিধবা।’ কলসির সঙ্গে চালচলনের সম্পর্ক কী বা তার সঙ্গে একটি নারীর বৈধব্যের সম্পর্কই-বা কী; এই রস ও রহস্যের অনুসন্ধান যেন ক্রমে পাঠক হিসেবে আমাকে পরিণত করে তুলছিল।

৮. দেশে-বিদেশে: বাংলা ভাষার তিন ধারার তিনটি ভ্রমণবিষয়ক বই আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছে দীর্ঘকাল। অন্নদাশঙ্কর রায়ের পথে-প্রবাসে, সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে আর কালকূটের অমৃতকুম্ভের সন্ধানে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবির দেশে কবিতার দেশে, শঙ্খ ঘোষের ঘুমিয়ে পড়া অ্যালবাম নিয়েও ভালো লাগা ছিল। তবে মুজতবা আলীর বইটি এতটাই প্রিয়, এখনো দেশে-বিদেশের কথা মনে করলে সৈয়দ সাহেবের কেশবিরল মাথা, গোলগাল মুখ, আর চোখ ও ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে রাখা তীব্র কৌতুক যেমন মনে পড়ে, তেমনি কাবুল শহরের আবদুর রহমানের কথা ভেবে হেসে উঠতে গিয়ে তার উচ্চারিত ‘ইনহাস্ত ওয়াতেনাম’ শব্দ দুটির কথাও মনে পড়ে যায়। হৃদয় আর্দ্র হয়, দেশপ্রেম ব্যাপারটিকে আরেকবার উপলব্ধি করতে পারি।

৯. দ্য ফ্রেগরেন্স অব গুয়াবা: কলাম্বিয়ার নোবেল পুরস্কারজয়ী লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ভক্ত-পাঠক এ দেশেও কম নয়। জাদুবাস্তবতা ও মার্কেস যেন প্রায় সমার্থক দুটি শব্দ। মার্কেসের কয়েকটি উপন্যাস এবং প্রায় সব কটি গল্প পড়েছি। কিন্তু আমার প্রিয় বইয়ের তালিকায় রাখতে চাই তাঁর একটি সাক্ষাত্কার। মার্কেসের সহকর্মী মেন্দোজার নেওয়া সাক্ষাত্কারটি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল ফ্রেগরেন্স অব গুয়াবা নামে। এ সাক্ষাত্কারে লেখক তাঁর উপন্যাসের বিষয়, রচনাশৈলী, চরিত্র ও তাদের পরিণতি, জাদুবাস্তবতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজের পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি বলেছেন অকপটে। পড়ে এতটাই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম, এটি অনুবাদ করার কথাও ভেবেছি। কিন্তু পরে জানতে পারি, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস এটি ইতিমধ্যেই অনুবাদ করেছেন পেয়ারার সুবাস নামে। প্রথমা প্রকাশন থেকে এটি প্রকাশিত গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।

১০. পুষ্পকুন্তলা: মাত্র ১৬ বছর বয়সে পুষ্পর বিয়ে হয়েছিল সূর্য সেনের সঙ্গে। বিপ্লবী সূর্য সেন। কিন্তু বাসরঘরে মেয়েটি জানতে পারে, চিরকাল স্বামীর দেহসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হবেন তিনি। কারণ, তাঁর স্বামী বিপ্লবী তো বটেই, তদুপরি ব্রহ্মাচর্যের মন্ত্রে দীক্ষিত। মালেকা বেগমের লেখা পুষ্পকুন্তলা: বিপ্লবী সূর্য সেনের জীবনসঙ্গিনী বইটি এই পরিণত বয়সেও আবেগাপ্লুত করেছে আমাকে। ঐতিহাসিক তথ্য ও সত্যকে প্রায় গল্পের মতো বর্ণনা করে হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন লেখক। তাই একটি অস্ফুট ফুলের গল্প থাকল আমার প্রিয় গ্রন্থের তালিকায়।

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন