default-image

ঢাকার সামারফিল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র স্বর্গকল্পক ঋভু। তার ১৪তম জন্মদিন ছিল ১১ জুন। এবার মা-বাবার সঙ্গে একাকী জন্মদিন কাটাতে হবে, এমন প্রস্তুতি ছিল তার। তবে রাত ১২টায় ঘটল চমক। ঋভুর বন্ধু এহসান জন্মদিনের কেক বানিয়ে ভিডিও সম্মেলন করার সফটওয়্যার জুমে মিটিং ডাকল। যার যার বাড়ি থেকে ঋভুর সঙ্গে যোগ দিল আরও তিন বন্ধু আরিক, তাহসান ও মুনাদ। এরপর বেশ খানিকক্ষণ ধরে চলল তাদের ভার্চ্যুয়াল কেক খাওয়া।

ঘটনার বর্ণনা করে ঋভুর মা ফেরদৌসী আবেদীন বললেন, ‘এহসান কেক কেটে মনিটরের সামনে একখণ্ড করে তুলে ধরছিল, আর অন্যরা হাঁ করে সেটা খাওয়ার ভঙ্গি করছিল।’

ঋভুর মা জানান, জন্মদিনের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক মেসেঞ্জারে গ্রুপ কলে ঋভুর সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিল চাচাতো-ফুফাতো ভাইবোনেরাও। তার দুই বন্ধু বাড়িতে কেক পাঠিয়ে দিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সচেতন মানুষেরা পরিবারের সদস্য, বন্ধু, প্রতিবেশীর পাশে থাকছেন এভাবে ভিন্ন উপায়ে। দূরে থেকেও পাশে থাকছেন তাঁরা। সংক্রমণের শিকার হয়ে যাঁরা বিচ্ছিন্ন থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁদের জানান দিচ্ছেন, ‘তোমরা বিচ্ছিন্ন থাকলেও একা নও’। এই ভাবনা দুই পক্ষের মধ্যেও সুখের উপলব্ধি দিচ্ছে।

গবেষকদের ভাষায়, মানুষের সুখ কিসে? প্রশ্ন সহজ হলেও উত্তর কঠিন। মানুষের সুখ নির্ভর করে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বা যোগাযোগ রক্ষার ওপর। এটা হতে পারে প্রেম, পারিবারিক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক বা সামাজিক সম্পৃক্ততা। এমনকি সুন্দর সম্পর্ক একাকিত্ব বোধ কাটিয়ে কারও অসুস্থতায় টনিকের কাজ করে। করোনাভাইরাস অতিমারি মানুষের পাশে থাকার এই সুখের বিষয়টি আরও বেশি উপলব্ধি করাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কতশতভাবে পাশে থাকা

রাজধানীর হাতিরপুল পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা তমিজউদ্দিন, তাঁর স্ত্রী ও কিশোরী মেয়ের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় গত ৩১ জুলাই। ফেসবুকে বিষয়টি জানানোর পর বহুদিন ধরে তেমন যোগাযোগ নেই এমন বন্ধু-স্বজনেরাও তাঁদের খোঁজ নিতে শুরু করলেন। তমিজ বললেন, ‘আমরা তিনজনই একসঙ্গে আক্রান্ত হওয়ায় কেউ কারও সেবা করতে পারছিলাম না। এই সময়ে কেউ নিজে রান্না করে খাবার পাঠিয়েছে, কেউ অনলাইনে খাবার অর্ডার দিয়ে পাঠিয়েছে, ফোনে যোগাযোগ তো ছিলই। প্রবাসী বন্ধুরাও নিয়মিত ফোন দিয়েছে।’

অনেকেই তমিজউদ্দিনকে বলে রেখেছিলেন দিন-রাতে-মধ্যরাতে যদি হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে তাঁরা এসে নিয়ে যাবেন। গ্রামের বাড়ির মসজিদে তাঁদের সুস্থতা চেয়ে দোয়া করা হয়েছে। কঠিন সময়ে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের এ আচরণ তমিজউদ্দিনদের এত সাহস জুগিয়েছে যে অসুস্থতার মধ্যেও মনোবল অটুট ছিল।

বিজ্ঞাপন
মানুষের সুখ নির্ভর করে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বা যোগাযোগ রক্ষার ওপর। এটা হতে পারে প্রেম, পারিবারিক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক বা সামাজিক সম্পৃক্ততা।
বিজ্ঞাপন

ছয় বছরের শিশু সামিনের মা–বাবার কোভিড-১৯ আক্রান্তের প্রতিবেদন পজিটিভ আসে গত ১৪ মে। ওই দিনই সামিনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন দাদি। পুরো ২০ দিন মা–বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল সে। তাকে আগলে রাখেন দাদি আর ফুফু। সামিনের ফুফু রাজধানীর টিকাটুলীর বাসিন্দা মুর্শেদা বেগম বলেন, ‘ভাইয়া-ভাবির জন্য আমরা সবাই প্রতিদিন খাবার পাঠাতাম। আমার স্বামী মোটরসাইকেলে করে খাবার নিয়ে যেতেন। ভাইয়ার বাসার বারান্দার গ্রিলের ছোট একটি অংশ খোলা। সেখান থেকে ওরা দড়িতে বালতি বেঁধে নিচে ফেলতেন। বালতিতে খাবার তুলে দেওয়ার পর তাঁরা ওপর থেকে দড়ি টেনে বালতি তুলে নিতেন। ওষুধপথ্য-ফলমূল প্রয়োজনীয় সবকিছু এভাবেই দেওয়া হতো। সামিনের সঙ্গে ওর মা–বাবা দুজন ভিডিও কলে নিয়মিত কথা বলতেন।’

স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কের বাইরে বর্ধিত পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার সুফলের কথা সম্প্রতি এক গবেষণাতেও উঠে এসেছে। গত বছরের ৭ নভেম্বর আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাময়িকী জার্নাল অব ফ্যামিলি সাইকোলজিতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, মা–বাবা, ভাইবোন, দাদা-দাদি, নানা-নানি, মা–বাবার দিকের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক মানুষের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে যখন বয়স হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

পাশে থাকার গুরুত্ব

শিশু জন্ম নেওয়ার আগে থেকেই মায়ের গর্ভে মায়ের দেহের স্পর্শের সঙ্গে বেড়ে ওঠে। এই স্পর্শ মানুষের জীবনের পথে জন্মগত চিরায়ত অভ্যাস, অভ্যস্ততা। করোনাভাইরাস মহামারি সেই অভ্যস্ততা চুরি করে নিয়ে মানুষকে কীভাবে বিকল্প পন্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে, তা নিয়ে গত জুন মাসে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন এক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, জন্মের আগে থেকে জীবন নিভে যাওয়ার শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত একজন মানুষের অপর মানুষের স্পর্শ প্রয়োজন। যখন আমরা দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠায় থাকি, এই স্পর্শ আমাদের রক্ষা করে। এটা অক্সিটোসিন হরমোন তৈরি করে, যা দুশ্চিন্তাজনিত হরমোন নিঃসরণ ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে। মানুষ দুঃখ-কষ্টে একে অপরকে বেদনা প্রশমনে যেসব উপায় অবলম্বন করে, করোনাভাইরাস মহামারি তা ছিনিয়ে নিয়েছে। মুখে কিছু না বলেও শারীরিক ভাষায় একে অপরের প্রতি গভীর মনোভাব প্রকাশ সম্ভব। এখন মাস্ক, গগলসে সেই প্রকাশ ঢাকা পড়ে। রোগটির প্রকৃতি এমনই যে শারীরিক ভাষার মাধ্যমে সহানুভূতি প্রকাশ করা, সশরীরে প্রিয়জনের পাশে থাকা বা স্পর্শের মাধ্যমে নিরাময় শক্তি প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে খ্যাতনামা মার্কিন লেখক এবং মৃত্যু, বেদনাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডেভিড কেসলার সিএনএনকে বলেছেন, ‘আমাদের এখন যে মুহূর্তের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, ইতিহাসে তা বিরল। আমাদের একে অপরের কাছ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকতে হচ্ছে। ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ কখনো সত্যিকারের স্পর্শ বা উপস্থিতির বিকল্প হতে পারে না। তবে এখন এটাই (ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ) এই সময়ের জন্য সবচেয়ে ভালো পন্থা। কিছুই না করার চেয়ে অন্তত কিছু করা তো ভালো।’

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম বলেন, মানুষ ব্যস্ততার কারণে সামাজিক অনেক দায়িত্ব পালন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। অনেকে নিজের পরিবারকেও ঠিকঠাক সময় দেননি। তবে নতুন স্বাভাবিক জীবন মানুষকে পরিবার-স্বজন-বন্ধুর মূল্য বুঝিয়েছে। এখন অনেকে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছেন, অনেকে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে দূরে থাকছেন। এই দূরত্বের মধ্যেও মানুষ তাঁর স্বস্তির জায়গাটি খুঁজে নিচ্ছেন। এই সময়ে একজন অপরজনের পাশে থাকা মানে মানসিকভাবে শক্তি জোগানো। যিনি অসুস্থ, তিনি এই ভেবে আনন্দ পাবেন যে কেউ তাঁর কথা ভাবেন, কেউ তাঁর জন্য উদ্বিগ্ন।

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, তখন দূরে থেকেও পাশে থাকার বোধ জাগাতে অনলাইনে ব্যতিক্রম এক কনসার্টের আয়োজন করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং গ্লোবাল সিটিজেন। ১৮ এপ্রিল ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড: টুগেদার অ্যাট হোম’ (এক পৃথিবী: একসঙ্গে বাড়িতে) শিরোনামের কনসার্টটির মূল উদ্দেশ্য ছিল লোকজন যেন নিজেদের বিচ্ছিন্ন ভেবে একা বোধ না করেন, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে উৎসাহিত হন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা-কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। মার্কিন সংগীতশিল্পী লেডি গাগার তত্ত্বাবধানে যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে অনুষ্ঠানে অংশ নেন ক্রিস মার্টিন, সেলিন ডিওন, টেলর সুইফট, ডেভিড বেকহাম, জন লিজেন্ড, এলটন জন, শাহরুখ খান, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মতো নামীদামি সব তারকা। বিভিন্ন দেশের টেলিভিশনে তা প্রচার হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস কনসার্টটিকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘একটি হুমকির বিরুদ্ধে সংহতির এক শক্তিশালী প্রকাশ।’

মন্তব্য পড়ুন 0