ভাইরাল হতে গিয়ে...

সাঈদের (ছদ্মনাম) বোন নিপার বিয়ে। সাঈদ থাকেন দুবাইতে। নিপার বিয়ের আয়োজন জাঁকজমক করে তোলার জন্য সবই করেছেন। হপ্তা দুই আগে দেশে গিয়ে। কিন্তু বাবা–মা, বোনের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও জানিয়েছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকতে পারবেন না। ‘কোম্পানি ঘন ঘন ছুটি দেবে না।’

এদিকে সাঈদের মনে অন্য পরিকল্পনা। সেটা জানত শুধু বন্ধু সোহেল। বিয়ের দিন সকালেও হোয়াটসঅ্যাপে বোনের সঙ্গে কথা, কান্নাকাটি—সবই হলো। দুপুরে বিয়ে। কনের সাজে নিপা বসে আছেন বিয়ের মঞ্চে। হঠাৎ হই হই রই...। সাঈদ এসেছে! সবাই অবাক। নিপা সবচেয়ে বেশি। বিয়ের মঞ্চ থেকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন ভাইকে। চূড়ান্ত নাটকীয় আবেগঘন এক মুহূর্ত। ভিডিওতে তা ধারণ করা হচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে বাড়ি পর্যন্ত সাঈদের আসা—সবকিছুই দামি স্মার্টফোনে ভিডিও করছেন সোহেল।

কিছুক্ষণ পরেই পুরো ভিডিও ফেসবুকে ছেড়ে দিলেন সাঈদ। যে কারণে এই নাটকীয় ঘটনা ঘটানো। মিনিট যায়, ঘণ্টা পেরোয়, ভিউ গিয়ে দাঁড়ায় তিন শর ঘরে। এক দিন পার হওয়ার পরও সেটা হাজার পেরোয় না। রাগে ফোনটাই ছুড়ে মারে সাঈদ। মেজাজ তিরিক্ষি।

না জানিয়ে বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরে সবাইকে চমকে দেওয়ার একই রকম একটা ভিডিও দেখে নিজেই তেমন ভিডিও করছিলেন সাঈদ। যেটির অনুকরণে ভিডিও বানিয়েছিল, সেটার ভিউ ছিল তিন লাখের বেশি—ভাইরাল।

সাঈদ মনে করেছিলেন, তাঁর ভিডিওটি ভাইরাল হবে। কিন্তু হয়নি। হতাশা ভর করল তাঁকে, রাগ গিয়ে পড়ল সোহেলের ওপর, ‘তুই ঠিকমতো বানাতে পারিসনি।’

১৭ বছরের অর্পা টিকটকে অ্যাকাউন্ট খুলেছে। ১০–১৫ সেকেন্ডের ভিডিও বানিয়ে অনেকেরই এখানে লাখ লাখ অনুসারী। কোটির কাছাকাছি লাইক। কয়েক দিন খেয়াল করে দেখল, উদ্ভট কিছু করলে লাইক পাওয়া যায় সহজেই। অর্পাও চাইল টিকটকের ‘তারকা’ হতে। লেডি গাগার মতো চুলের রং পাল্টাতে থাকল। কখনো নীল, কখনো লাল, কখনো একেবারে সাদা। পারলারে গিয়ে কিছুদিন পরপর চুল রং করে আসে, আর চটুল গানের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে ভিডিও তৈরি করে। অর্পার আশা আর পূর্ণ হয় না। ছয় মাস পরেও তার অনুসারী ১.৫ কে মানে দেড় হাজার। এদিকে চুলে বারবার রং করায় তার রাসায়নিক প্রভাব পড়েছে মাথার ত্বকে। দগদগে ঘা অনেক জায়গায়। যেতে হয় চিকিৎসকের কাছে, কামিয়ে ফেলতে হয় মাথার চুল।

সহজে খ্যাতির পথে

ইন্টারনেট–নির্ভর এই সময়ে ‘ভাইরাল’ শব্দটি নিজেই যেন ভাইরাল। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক, বিভিন্ন ওয়েবসাইটে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কিছু ছবি, ভিডিও কিংবা লাইভ। কিছু হয় ঘটনার কারণে, কিছু হয় সৃজনশীলতা বা অভিনবত্বের কারণে। অনেকেই বিশেষ করে কিশোর–তরুণ বয়সীরা যারা নিজেরা চায় ভাইরাল হতে। কোটি কোটি মানুষ তাকে দেখবে, চিনবে, জানবে। অনেকে আবার অন্যকে অনুকরণ করে নিজেও ভাইরাল হতে পারে, কিন্তু ব্যর্থতার সংখ্যাটাই যেমন বেশি। আবার এ যুগের বিপণন কৌশলেও ভাইরাল একটা দারুণ হাতিয়ার।

আরমান আলিফের অপরাধী গানের ভিডিও হঠাৎ করেই হয়ে গেল ভাইরাল। কোটি কোটি বার দেখা হলো। অনেকেই অপরাধী গান গেয়ে নিজের মিউজিক ভিডিও বানালেন। তাঁদের ভিডিও ভাইরাল হলো না। শুধু টুম্পা নামের এক শিল্পীর গাওয়া অপরাধী ভাইরাল হলো। আরমানের গানে থাকা ও মাইয়া ও মাইয়ার বদলে টুম্পা গেয়েছিলেন ও পোলা ও পোলা...। আবার অপরাধী গানটি যখন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা ড্রেসিং রুমে গাইলেন, সেটির ভিডিও ভাইরাল হলো।

বিজ্ঞাপন

ঝুঁকি নেন অনেকে

করোনাকালেই দেখলাম, একজন হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর জীবাণুনাশক খেয়ে ভিডিও ছেড়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কতবার দেখা হলো তা বড় কথা না, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। একজন আবার দাহ্য পদার্থ শরীরে মেখে দিলেন ভিডিও। ফলাফল শরীরের ত্বক পুড়ে গেছে তাঁর। বিপজ্জনক স্থানে সেলফি তুলে ভয়ংকর বিপদে পড়ার এমনকি মারা যাওয়ার ঘটনাও তো দেখা যায়। ভারতের জার্নাল অব ফ্যামিলি মেডিসিন অ্যান্ড প্রাইমারি কেয়ার–এর এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৭ সালে বিপজ্জনক স্থানে সেলফি তুলতে গিয়ে পৃথিবীতে ২৫৯ জন মারা গেছেন। এই মৃত্যুগুলোর পেছনেও আছে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা।

কমে যায় আত্মবিশ্বাস

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তরুণ ও কম বয়সীদের মধ্যে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা বেশি। অন্যের কাছে পৌঁছানো, অন্যের মনোযোগ পাওয়ার জন্য সহজ পথটাই বেছে নেয়। আবার একটা ভিডিও ভাইরাল হলে অর্থের হাতছানিও কাজ করে। ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার বললেন, ‘বয়স যা–ই হোক, এটা তাদের মধ্যে দেখা যায়, যাদের আত্মবিশ্বাস কম, নিজের কাজে সফল নন এবং যাদের সামাজিক দক্ষতা নেই।’

ভাইরাল হতে গিয়ে সফল হোক বা না হোক, মানুষের মনোজগতের জন্য এই প্রবণতা মোটেও ইতিবাচক নয়। তার মন তো জানে যে সে অনুকরণ করেছে। মেখলা সরকার বলেন, কখনো সাময়িক সফলতা আসতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে হীনম্মন্যতা তৈরি করে। আর ব্যর্থ হলে হীনম্মন্যতা, হতাশা গ্রাস করে।

সত্যিকারের দক্ষতা থাকলে সেগুলো ভাইরাল হবে। হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া কোনো ছবি, কোনো গান যেকোনো কিছুই নিজ গুণে ভাইরাল হয়। কিন্তু পরিশ্রম ছাড়া অনুকরণের সহজ পথে হাঁটলে চূড়ান্ত সফলতা আসে না, বরং মাঝে মাঝে বিপদ ডেকে আনতে পারে। চাইলেই তো ভাইরাল হওয়া যায় না, ভাইরাল হয়ে যায়। আর তা কোনো বিষয়ে নিজের দক্ষতা, মেধা, সৃজনশীলতা দিয়েই করতে হয়। সেজন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে যারা ভিডিও তৈরি করে ‘ভাইরাল হওয়ার গ্যারান্টি’ দেয় তাদের কাছে যাওয়ার দরকার নেই।

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন