default-image

হঠাৎই দেখা হয়েছিল শাফিন ও নিতুর (ছদ্মনাম)। তাঁদের বাড়ি একই জেলায়। এই সূত্রেই দুই শহরে থেকে মেসেঞ্জারে কথা শুরু। দুজনই শিল্প-সাহিত্য ভালোবাসেন। এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে একদিন দেখা হয় তাঁদের। সেখানেই বন্ধুত্বের অঙ্ক কষেন তাঁরা। এরপর একসঙ্গে থিয়েটারে নাটক দেখা, হলে সিনেমা দেখা ও আড্ডা দিতে দিতে তাঁরা একে অপরের অনেকটা কাছে চলে আসেন। বাড়ি ফিরে দুজনেরই একা একা লাগে। মনে হতে থাকে, আয়না আর জানালার পাশে অকারণে হেসে ওঠে কেউ। এই হাসি দেখতে দেখতে নিজের ভেতর তাঁরা সুড়ঙ্গ খুঁড়তে থাকেন। ধীরে, অতি ধীরে নেমে যেতে থাকেন দুই সুড়ঙ্গে। অনেক গভীরে নেমে দেখেন, সেই দুই সুড়ঙ্গের একটাই তল। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুজন, চোখে চোখে বলেন, নিশ্চিন্ত হও, এর নাম প্রেম।

এরপর ক্রমাগত দেখা হতে হতে শাফিন আর নিতু চিনে নিতে থাকেন তাঁদের সম্পর্কের দূরাভাষ। ভাবেন, তাঁরা পাশাপাশি বসে দেখে নেবেন মেঘ-তারা, বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যা, বসন্ত অথবা ভোর। তাঁরা একে অপরে এতটা বিভোর, যেন দুজনেই কুঞ্জলতা হয়ে ফুটে আছেন দুজনের চোখের ভেতর।

মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে শাফিন চাকরি পেয়েছেন দুই বছর হবে। পরিবার থেকে তাঁকে বিয়ে দিতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে নিজের মা-বাবাকে জানিয়ে ২০১৫ সালে নিতুকে ঘর বাঁধার কথা বলেন শাফিন। জানান, ‘নিজেকে গুছিয়ে রাখো। আসছে বসন্তে আমাদের ঘর হবে।’ এ প্রস্তাবের পর থেকেই অন্যমনস্ক হয়ে যান নিতু। শাফিনকে এড়িয়ে চলার বাহানা খোঁজেন। ইদানীং প্রায় সময় অন্য কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত থাকেন। আগের মতো আর দেখা করেন না। দেখা করলেও অল্পতেই দুজনের কথা-কাটাকাটি হয়। ঘর বাঁধতে যাওয়ার আনন্দে নিজেকে গুছিয়ে নিতে থাকা শাফিনের সন্দেহ হতে থাকে। নানাভাবে নিতুর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার চেষ্টা করতে থাকেন তিনি। বন্ধুদেরও সাহায্য চান।

প্রেম শুরুর দিকে বন্ধুরা শাফিনকে এ সম্পর্ক নিয়ে নানা কথা বলেছিলেন। কিন্তু প্রেম তো বধির হতে শেখায়। শাফিনও তাই শোনেননি বন্ধুদের কথা। বোঝেননি, নিজে নিশ্চিন্ত হলেও, ক্যারিয়ারসচেতন নিতু নিশ্চিন্ত হতে পারেনি শাফিনের প্রেমে। নিতুর কাছে শাফিন একজন ভুল মানুষ। অথচ ভুল মানুষের প্রেমে থেকেও সঠিক মানুষের খোঁজ করে চলছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

নিতুকে তীব্রভাবে ভালোবাসতেন শাফিন। টুপ করে সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় কান্না গোপন করতে পারেননি তিনি। পরে খুঁজে পেয়েছিলেন উচ্ছন্নে যাওয়ার পথ। বন্ধুরা বুঝিয়েছিলেন, কান্না পেলে কেঁদো, তবু জলের কথা ভাবো। জল তো ভুলে যায় স্পর্শের সমূহ স্মৃতি। তবু সে শান্ত বয়ে চলে। বন্ধুদের কথায় ভরসা রেখেছিলেন তিনি। তাই উচ্ছন্নে যাওয়ার পথ ঘুরে গেছে সুন্দরের দিকে। ২০১৬ সালে বসন্তের আগেই ঘর বেঁধেছেন তিনি। সেই ঘরে এখন নিত্য কোকিলের কুহু।

শাফিন বলেন, তখন আমরা দুজনই ছিলাম দুজনের জন্য ভুল মানুষ। এটা বুঝতে আরেকটু দেরি হয়ে গেলে জীবন তছনছ হয়ে যেত। শুরুতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। পরিবার ও বন্ধুরা যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে এ থেকে বেরিয়ে আসতে। এখন অনেক ভালো আছি।

দুজন মানুষ অচিন পথে একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কেউ কারও বুকের ভেতর বাজিয়ে তুলতে পারে গোপন বাঁশির সুর। সেই সুর উদাস করে দেয়। নিজেকে নিজের থেকেও একা করে দেয়। সবকিছু ভালো লাগতে লাগে। একজন আরেকজনের হৃদয়ে হৃদয় মিলিয়ে নেওয়ার কথা ভাবে। এটাই প্রেম। কিন্তু এই প্রেম সব সময় সঠিক মানুষের কাছে ধরা দেয় না। কেউ কেউ ভুল মানুষের প্রেমে পড়েন। এটা যিনি বুঝতে পেরে সম্পর্ক থেকে সরে যেতে পারেন, তাঁর কষ্ট কম হয়। আর যিনি তা পারেন না, তাঁকে ব্যাখ্যাতীত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

আফরি ও নিশানের (ছদ্মনাম) পরিস্থিতি সে রকমই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা আফরি একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় উচ্চ বেতনে চাকরি করতেন। আর নিশান বহু আগে বখে যাওয়া এক মানুষ। ভদ্রতার ভান করে থাকেন। দুজনই নির্ভরতা খুঁজছিলেন। সেই নির্ভরতা খুঁজতে গিয়েই দুজনের প্রেম হয়েছিল। প্রেমে বধির আফরি সম্পর্কের ব্যাপারে কারও মন্তব্যে পাত্তা দেননি। এক সময় বুঝতে পারেন, বেকার নিশান নেশায় আসক্ত। কিন্তু তত দিনে নিশানের জন্য বুকের ভেতর রাখা মমতার চারাগাছ অনেক বড় হয়ে উঠেছে। গলার ভেতর সমুদ্রসমান কান্না চেপে কারণ জানতে চেয়েছিলেন আফরি। নিশান হয়তো জানিয়েছিলেন, ‘যদি ডাকো সোনা, কোনো ভণ্ডামি রাখব না।’ আফরি এতে ভরসা করেছিলেন। নিশান ঠিক হয়ে যাবে—এই ভেবে তাঁরা পাখির মতো ঠোঁটে খড়কুটো নিয়ে ঘর বেঁধেছিলেন। আফরির পরিবারের আপত্তি ছিল এতে। এত কিছুর পরও নিশান কথা রাখেননি। তাই অদৃশ্য ছুরির টানে ফানা ফানা হয় আফরির হৃদয়।

আফরি বুঝতে পেরেছিলেন, ভুল মানুষের প্রেম তাঁর জীবনকে তছনছ করে দিচ্ছে। কিন্তু এখন তাঁর কিচ্ছু করার নেই। অসহায় হয়ে পড়েন আফরি। দুজনের মধ্যে ঝামেলা বাধতে থাকে। যে ঝামেলা আফরিকে ঠেলে দেয় স্বেচ্ছামৃত্যুর দিকে। গত ফেব্রুয়ারিতেই স্বেচ্ছামৃত্যুর আগে খুব করে কেঁদেছিলেন তিনি। তাঁর সমূহ জখমের পাশে ফুটেছিল রক্তজবার লাল।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সময় নিতে হবে

ডা. মেখলা সরকার

সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা।

প্রেমে যে কেউ যেকোনো সময় পড়তে পারেন। প্রেমে পড়ার সময় মানুষের যৌক্তিক ভাবনার চেয়ে আবেগ কাজ করে বেশি। সে কারণে প্রেমিক বা প্রেমিকা শুরুতে বুঝতে পারেন না, তিনি ভুল মানুষের প্রেমে পড়েছেন কি না। তবে প্রেমের সম্পর্কে অনেক দিন থাকার পর মানুষের আবেগ অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। তখন মানুষ যৌক্তিক ভাবনা ভাবতে পারেন। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরই হয়তো মানুষ প্রেমের পরিণতির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একে অপরকে ভালো করে জানতে হবে, বুঝতে হবে। আচরণগুলো যুক্তি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাচাই করতে হবে। তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে হয়তো সঙ্গী হিসেবে সঠিক মানুষ বেছে নেওয়া সহজ হবে।

অনেকেই ভুল মানুষের প্রেমে পড়ে জীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলেন। সেটা অতিরিক্ত আবেগের কারণেই হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে পরিবার একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। সন্তানের প্রেমের ব্যাপারে মা-বাবার নেতিবাচক অবস্থানে থাকা ঠিক নয়। এতে ওই সন্তান আরও আবেগপ্রবণ হয়। মা-বাবার উচিত এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা। তাহলে সন্তানেরা ওই সম্পর্ক নিয়ে ভাবার সময় পান। তা না হলে, হয়তো অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তাঁরা হুট করে সম্পর্কের ব্যাপারে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এতে করে তাঁর পরবর্তী জীবন হয়তো বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন
প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন