default-image

জগজ্জুড়ে চলছে সামাজিক–শারীরিক বিচ্ছিন্নতা, সঙ্গনিরোধ। যদি কমে আসে করোনার বিস্তার, তবু ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হওয়া অনেকেই অনুভব করছেন। হোক তা করমর্দন এবং এরপর ঝাঁকুনি, নয় আবেগে জড়িয়ে ধরা আবেশে। প্রতিদিন শরীরের ছোঁয়ায় যেন অভ্যস্ত হয়ে ছিলেন অনেকে। নিঃসঙ্গতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মনে আনে বেদনা।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ডে চার কেলনার বলেন, স্পর্শ হলো সংযোগের মৌলিক ভাষা। মা–বাবা আর শিশু, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর, রোমান্টিক সঙ্গীদের বন্ধন বিভিন্নভাবে আমাদের মধ্যে বিশ্বাসের ভিত্তি রচনা করে, আর নানাভাবে যোগাযোগ ঘটায়। এই স্পর্শ দিয়েই শুরু।

স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হলে তা কেবল মনে নয়, শরীরের ওপরও প্রভাব ফেলে। আমাদের মগজের এক বড় অংশ স্পর্শ চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার ত্বকের কোটি কোটি কোষ প্রক্রিয়াজাত করে এই চেতনা।

বিজ্ঞাপন

সঠিক বন্ধুসুলভ স্পর্শ যেমন গাঢ় আলিঙ্গন, প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে হাত মেলানো শান্তি আনে মনে। চাপ কমায়। স্পর্শ উদ্দীপ্ত করে বিশাল স্নায়ুগুচ্ছকে আর উন্নত করে দেহ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ করে পরিপাক, আর আনে সুনিদ্রা। সমমর্মী হতে প্রণোদিত করে। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী শেলদন কোহেন বলেন, আলিঙ্গন, জড়িয়ে ধরা, বুকে বুক মেলানো সবল করে দেহ প্রতিরোধ, দেয় অবলম্বনের অনুভূতি আর সামাজিক সহায়তার অনুভূতি অনেক রোগের প্রতি প্রবণতা কমায়।

আমরা মানছি শারীরিক বিচ্ছিন্নতা; দূরে থাকছি ৬ ফুট, হাত মেলাই না, হাত নেড়ে নুয়ে জানাই অভিবাদন, হয়তো চকিত চোখের চাহনি দিয়ে বোঝাই মনের ভাব, এ রকম থাকতে হবে কিছুদিন। বিরহ মধুর হয় মিলনের আশায়, তাই কবে জড়িয়ে ধরব, সেই আশার জাল বোনা ছাড়া কী উপায়?

মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক পল জাক বলেন, শারীরিক স্পর্শ আনে স্বাস্থ্য, আনে সুখ। আমরা যখন স্পর্শ করি, তখন ধাপে ধাপে ঘটে কিছু ঘটনা, আর উৎসারিত হয় হরমোন অক্সিটোসিন। কমায় চাপ উন্নত করে ইমিউন (রোগপ্রতিরোধ) ব্যবস্থা।

স্পর্শের বিকল্প নেই। তবু এর একটি সহজ বিকল্প ভিডিও চ্যাটিং। দেখাদেখি হয়ে কথা বলা পরস্পর ভাব বিনিময় মগজের অক্সিটোসিনের ওপর প্রভাব ফেলে। ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের সময় মূল কথায় প্রথমেই না গিয়ে ৫ মিনিট সময় নিন, কুশল বিনিময় করুন। একে অপরকে জানুন, অক্সিটোসিন উৎসার হবে সুগম। কেমন লাগছে, কেমন অনুভব করছেন—এমন জিজ্ঞাসা করলে দেখবেন, একটি আবেগীয় বন্ধন তৈরি হবে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অন্যের সঙ্গে নাচা, গান গাওয়া, যোগব্যায়াম করাও বন্ধনের অনুভূতি তৈরি করে। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে বন্ধন সম্পন্ন করতে চেয়েছে, কিন্তু শারীরিক স্পর্শ ছাড়া করা হোক না বন্ধন, হোক না তা তথাকথিত প্লেটোনিক।

অনেক দেশে হয়তো স্পর্শহীন সম্ভাষণ চালু হবে এর পরে। মাথা নোয়ানো। ঘাড় দোলানো, চোখের চাহনি কিংবা হাত দেখানো। কিন্তু আমার মনে হয়, আমরা অপেক্ষা করে আছি—কবে ফিরে আসবে স্পর্শ আর আমরা হব আপ্লুত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0