বিজ্ঞাপন

এ ধরনের কথা বলা মানে অন্যকে আঘাত দেওয়া, তার মুখের হাসি কেড়ে নেওয়া। কিন্তু আপনি সানজিদার মতো কেউ একজনকে বলতে যান, এভাবে বলা উচিত হয়নি, তিনি আপনার মুখের ওপর আরও কড়া উত্তর দিতে ছাড়বেন—‘আমি বাপু আপনাদের মতো কথা পেটে রেখে দিতে পারি না, ছোটবেলা থেকেই ঠোঁটকাটা, রেখে–ঢেকে কথা বলার অভ্যাস আমার নেই।’

এ রকম আক্রমণাত্মক ও ঝগড়াটে স্বভাবের মানুষ যুক্তিতর্কের ধার ধারেন না। নইলে হয়তো তাঁকে বলা যেত, বনে জঙ্গলে পশুরা নিরাবরণ চলাফেরা করে, রেখে–ঢেকে চলার দায় তাদের নেই। কিন্তু সভ্যসমাজে মানুষ যেমন নিরাবরণ থাকে না, তেমনি কথা বলার সময়ও তাকে রেখে–ঢেকে বলতে হয়। এটাই সভ্যতার শিক্ষা, এটাই রুচি ও সংস্কৃতি।

ধরুন, একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে একত্র হয়েছেন বেশ কজন। সেখানে নানা কথা ঘুরেফিরে উঠে পড়ল কোনো এক আত্মীয়ার বিবাহবিচ্ছেদের প্রসঙ্গ। শুরু হলো মেয়েটির নানা দোষ–ত্রুটির দিকে আঙুল তোলা। মেজাজ গরম, বেশি খরুচে ইত্যাদি নানা বাঁক ঘুরে আলোচনাটা ঠেকল মেয়েটির চরিত্র বিশ্লেষণে গিয়ে। যেহেতু বিষয় বিবাহবিচ্ছেদ, সুতরাং চরিত্রে কালি লেপে দিতে সত্য–মিথ্যা যাচাইয়ের কোনো প্রয়োজন পড়ল না। অথচ ওই মুহূর্তে একজনও ভাবল না, মেয়েটি কারও সন্তান, কারও বোন বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়! এ রকম আলোচনার ফাঁকে আসর থেকে কেউ একজন যে নীরবে উঠে চলে যায়, আমরা কি খেয়াল করেছি কখনো? তার বিষণ্নতা, তার বেদনা কখনো কি একটুও স্পর্শ করেছে আমাদের? কেন আমরা একটু সংবেদনশীল হব না? কেন আমাদের তীব্র–তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে ক্ষত–বিক্ষত হবে অন্যের হৃদয়?

যাঁর জন্য যে বিষয়টা স্পর্শকাতর, অন্তত তাঁর উপস্থিতিতে আমরা কি তা এড়িয়ে যেতে পারি না? যেমন ধরুন, আলোচনা প্রসঙ্গে ধর্ম–সম্প্রদায় প্রসঙ্গে কথা উঠল। সেখানে যদি আমরা কোনো ধর্মের আচার–অনুষ্ঠান নিয়ে উপহাস বা কটূক্তি করি, সেখানে সেই ধর্মাবলম্বী কেউ থাকলে ব্যাপারটা তাঁর জন্য কত বিব্রতকর ও মর্মপীড়ার কারণ হতে পারে, কখনো ভেবে দেখেছি? কিংবা আঞ্চলিকতার কথাই ধরা যাক। এক একটি অঞ্চলের লোকজনের স্বভাব–চরিত্র নিয়ে কত সহজেই আমরা মন্তব্য করে বসি, অমুক জেলার লোক গোঁয়ার, তমুক জেলার লোক কিপটে বা স্বার্থপর ইত্যাদি। কিন্তু ঠাট্টাচ্ছলে বলা এই কথাগুলোও কারও মনে কষ্ট দিতে পারে, এমনকি বন্ধুত্বের সম্পর্কেও তিক্ততার সৃষ্টি করতে পারে।

আসলে সংবেদনশীল হওয়া আপাতসহজ ও স্বাভাবিক একটি ব্যাপার হলেও চর্চা ও সদিচ্ছার কারণে এই বিষয়টাই আমরা অনেকে শিখতে পারি না সারাটা জীবন। আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে আমার কেমন আচরণ করা উচিত এটা তো আমাদের ষষ্ঠেন্দ্রিয়ই বলে দেবে। যেমন কোনো মৃত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে তাঁর শোকার্ত স্ত্রী–সন্তানের সামনে শোকের অভিব্যক্তি প্রকাশ করাটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু কিছুটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা সেই গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারি না। ওই বাড়িরই কোনো এক পাশে গিয়ে আরও কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে হাসি–আড্ডায় মেতে উঠি। অন্যদের জন্য তা–ই হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু মৃতের স্ত্রী বা সন্তানদের জন্য ব্যাপারটা কতটা মর্মান্তিক, ওই মুহূর্তে আমরা তা কল্পনাও করতে পারি না।

শুধু দেখা–সাক্ষাৎ বা আচার–অনুষ্ঠানের কথাই–বা বলছি কেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আমাদের অসচেতনতাও অন্যের মনঃকষ্টের কারণ হয়ে উঠতে পারে। যেমন এখন চলছে মহামারির দুঃসময়। এই দুঃসময়ে আমরা হারিয়েছি অনেক বন্ধু–বান্ধব, আত্মীয়–স্বজন। হয়তো দুদিন আগে বন্ধুবিয়োগে শোক জানিয়ে, তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে পোস্ট দিয়েছি ফেসবুকে। তার ঠিক এক দিন পরই আমরা স্বামী–স্ত্রীর হাস্যোজ্জ্বল যুগল ছবি বা পারিবারিক আনন্দময় মুহূর্তের ছবি শেয়ার করতে দ্বিধা করছি না। আপাতদৃষ্টে অসংগতি কিছু নেই, কিন্তু এতে স্ত্রী বা স্বামী হারানো বন্ধুটির মানসিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে ভেবে দেখার সময় আমাদের হলো না!

হয়তো সব সময় ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হয় না। হয়তো সামান্য অসতর্কতার কারণে আমাদের আচরণ হয়ে ওঠে অন্যের মনঃবেদনার কারণ। কিন্তু একটু সচেতন হলে, কিছুটা সংযত ও মিতভাষী হলে অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়া যায়। অন্যের খুব উপকার করতে না পারি, কিন্তু তার সমব্যথী তো হতে পারি। পশুরা জন্ম থেকেই পশু, কিন্তু মানুষকে প্রতিদিন মানুষ হয়ে উঠতে হয়।

ভূপেন হাজারিকার বহুলশ্রুত গানের সেই পঙ্‌ক্তিগুলো মনে আছে? ‘মানুষ যদি সে না হয় মানুষ, দানব কখনো হয় না মানুষ/ যদি দানব কখনো হয় মানুষ, লজ্জা কি তুমি পাবে না? ও বন্ধু…।’

লেখক: প্রথম আলোর উপসম্পাদক

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন