default-image

সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসের পয়লা দিন একটি বেসরকারি ব্যাংকে যোগদান করবেন ঝিনাইদহের সালমা আক্তার। এমনই কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস সালমার পেশাজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে দেয়নি; বরং জীবনখাতার ইতি টেনে দিয়েছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৬ এপ্রিল মারা গেছেন সালমা। এই ঘটনার দিন ছয়েক আগে সালমার মা শাহিনা আক্তারকেও কেড়ে নিয়েছে প্রাণঘাতী করোনা।

সহধর্মিণী আর বড় সন্তানকে হারিয়ে এখন শোকে বিহ্বল সালমার বাবা আব্দুল হামিদ। মুঠোফোনে প্রিয়জনদের হারানোর কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভারী হয়ে আসছিল তাঁর গলা। কয়েকবার কেঁদেও ফেললেন। আব্দুল হামিদ জানালেন, মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে জ্বরসহ সর্দি-কাশিতে ভুগতে শুরু করেন সালমা। প্রথমে সাধারণ জ্বর ভেবে বাড়িতেই চিকিৎসা করান। সপ্তাহখানেক পর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সালমাকে ভর্তি করানো হয়। সেখানে সালমা ও তাঁর মা শাহিনার করোনা শনাক্ত হয়। এরপর মা ও মেয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।

‘ওই যে মা-মেয়ে বাড়ি ছাড়ল, এরপর বাড়ি ফিরল লাশ হয়ে। চিকিৎসার জন্য কত জায়গায় গেলাম। এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতালে দৌড়ালাম। টাকাপয়সাও খরচ করছি অনেক। কিন্তু মানুষ দুইটাকে তো আর ফিরে পেলাম না।’ কথাগুলো বলতে বলতে আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন হামিদ।

হামিদ-শাহিনা দম্পতির দীর্ঘ ৩০ বছরের সুখের সংসার। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরে চাকরি করেন আব্দুল হামিদ। ছোট মেয়ে সুমাইয়া আক্তারই এখন তাঁর অবলম্বন। আত্মীয়স্বজন আর প্রতিবেশীরা সার্বক্ষণিক খোঁজ নিলেও কী যেন নেই হামিদের পরিবারে। কোনো সান্ত্বনাই তাঁকে যেন স্বস্তি দিচ্ছে না। স্ত্রী আর মেয়েকে হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা।

চলমান মহামারিতে হামিদের মতো অনেক পরিবারেই একাধিক সদস্যের মৃত্যু ঘটেছে। এমন অকস্মাৎ মৃত্যু শোকের সাগরে ভাসিয়েছে পরিবারের বাকিদের। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কারও মা বিদায় নিয়েছেন, কারও–বা ভাই-বোন। কঠিন এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন পরিবারগুলোতে।

বাবার পর চলে গেলেন মা–ও

গত বছরের ১৭ জুলাই দিবাগত রাতে ঘণ্টা দুয়েকের ব্যবধানে করোনায় বাবা-মাকে হারিয়েছেন মিনহাজ আহসান। রাজধানীর শেখ রাসেল ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিনহাজের বাবা-মা মারা যান। ওই সময় মিনহাজের বড় ভাই মাহফুজুল আহসানও করোনায় আক্রান্ত হয়ে একই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ভয়াবহ ওই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে মিনহাজের গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে কান্না। জড়ানো কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘প্রথমে বাবা মারা গেলেন। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আম্মা মারা গেলেন। আব্বা-আম্মার মারা যাওয়ার সংবাদ শুনেই ভয়ে কাঁপতে থাকি। ভাইয়ার যদি কিছু হয়ে যায়! ভয়ে ভাইয়াকে তখন কিছুই জানাইনি। বুঝতে পারছিলাম, ভাইয়া হয়তো এটা সহ্য করতে পারবে না। তাই ছোট ভাই মেহরাবকে সঙ্গে নিয়ে লাশের গাড়ি ওই রাতেই গ্রামের বাড়ি নরসিংদীতে নিয়ে যাই।’

বাবা–মাকে দাফন করার পর ভাইকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। এরপর ভাই কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে তাকে বাবা–মায়ের মৃত্যুর খবর জানানো হয়।

মিনহাজের কাছে এখনো সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হয়। ঘটনার আগের দিনও তাঁদের পরিবার ছিল সাজানো-গোছানো। অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুই বটবৃক্ষের প্রস্থান ঘটে। মিনহাজ বলেন, ‘ভাইয়ার নিজের পরিবার আছে। আমিও বড় হয়েছি। অনেক কিছু বুঝতে শিখেছি। কিন্তু আমার ছোট ভাই তো অনেক ছোট। মাত্র এইচএসসি পাস করেছে। ওর দিকে তাকানো যায় না। কী বলে সান্ত্বনা দেব আমার ভাইটাকে?’

মিনহাজের প্রশ্নের এই উত্তর দেওয়াটা খুব সহজ নয়। চট করে কোনো উত্তর তো বলে দেওয়াই যায়। মিনহাজের কষ্ট তাঁরাই বুঝবেন, যাঁরা এই মহামারিতে নিজের স্বজন হারিয়েছেন। পরিবারের কোনো সদস্যের হঠাৎ এই প্রস্থান পরিবারের অন্য সদস্যদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। জগৎ-সংসারের কঠিন এই বাস্তবতা বুঝে ওঠার আগেই কাঁধে তুলে নিতে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বাবা-মাকে হারিয়ে যেমন মিনহাজের দায়িত্ব বেড়েছে বহুগুণ। তাঁর বড় ভাই মাহফুজুলের দায়িত্ব যেন আরও বেশি। কারণ, তিনিই তো এখন পরিবারের কর্তা। বাবা-মায়ের মতো করেই ছোট ভাইদের আগলে রাখতে হবে।

আরও কত জানা–অজানা

দেশের বিভিন্ন স্থানেই করোনাকালে একাধিক প্রিয়জন হারানোর মতো ঘটনা ঘটছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি অন্তঃসত্ত্বা মা সন্তান জন্ম দিয়েই পাড়ি জমিয়েছেন না–ফেরার দেশে, নবজাতকের বাবা তখনো করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন হাসপাতালের বিছানায়। কেউ হয়তো হারিয়েছেন নিজের প্রিয়তম সন্তানকে, চার মাসের ব্যবধানেই আবার করোনা কেড়ে নিয়েছে তাঁর দাদি ও ভাবিকে। শ্যামলীর বাসিন্দা রাফিজা বোরহান যেমন থাকেন একা, বাড়িতে কাজের লোক ছাড়া কাছের মানুষ কেউ নেই। গত বছরের শুরুতে তিনি করোনায় হারিয়েছেন প্রথমে নিজের ভাইকে। কুমিল্লায় মারা যাওয়া ভাইয়ের মুখটাও দেখতে যেতে পারেননি ৬৮ পেরোনো রাফিজা। ভাইয়ের সঙ্গে কাটানো ছোটবেলার টুকরো ঘটনাগুলো মনে করেই দিন পার করছিলেন। রাফিজার তিন সন্তানই দেশের বাইরে থাকেন। এপ্রিলের শুরুতে খবর পেলেন আমেরিকায় বসবাস করা ছোট ছেলের জ্বর। ছেলের জ্বরের কয়েক দিনের মধ্যে নাতিও জ্বরে পড়েছে। রাফিজা জানে, ছেলে ও নাতি—দুজনেই হাসপাতালে আছে। কিন্তু রাফিজার এক আত্মীয় জানালেন, ছেলে মারা গেছেন সপ্তাহখানেক আগে। তবে রাফিজাকে এখনো সেই খবর জানানো হয়নি।

শোক হোক শক্তি

কোনো পরিবারে যখন পরপর কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে, সেই শোক থেকে বের হয়ে আসা কঠিন। বিশেষ করে পরিবারের মূল উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানো পরিবারগুলোর জন্য এই সময়টা বেশি কঠিন। মনোরোগবিদদের পরামর্শ তাই, পরিবারের বাকি সদস্যের এই সময়ে দায়িত্বগুলো ভাগাভাগি করে নিতে হবে। যেন পরিবারের কেউ প্রিয়জনের সেই শূন্যতা অনুভব না করে। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবেরও এখন দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। মানসিক সাহস জোগাতে তাঁদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

এদিকে জন্ম-মৃত্যুর কঠিন এই সত্যকে যেমন উপেক্ষা করার মতো শক্তি কারও নেই, অন্যদিকে সময় আর নদীর স্রোতের মতো জীবনকেও থামিয়ে রাখা যায় না। তাই মৃত্যুবেদনাকে ভুলে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুলতানা আলগিন বলেন, ‘প্রিয়জন হারানোর এই শোক কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। তবে ধীরে ধীরে বেদনাবিধুর এই পরিস্থিতি উতরে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। দুঃসহ স্মৃতিগুলোকে বারবার মনে না করে, আবার পূর্ণোদ্যমে ব্যক্তিগত কাজ, ব্যবসা বা পড়াশোনায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করুন। কোনো কিছুর মধ্যে ব্যস্ত থাকলে মন খারাপের বিষয়টি অনেকাংশেই দূর হয়ে যায়।’

সামাজিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমেও অনেকে মানসিক শান্তি খুঁজে পান। করোনাকালে এসব সেবামূলক কাজের মাধ্যমে সময় কাটানোর পরামর্শ দেন তিনি। তবে এসবের কোনো কিছুতেই মানসিক অবস্থার উন্নতি না ঘটলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বিজ্ঞাপন
প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন