default-image

জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, ‘মানুষ হওয়ার সহজ একটি পদ্ধতি আছে, সেটা হচ্ছে বই পড়া।’ মা–বাবামাত্রই সন্তানের ভালো-মন্দ নিয়ে চিন্তিত ও শঙ্কিত। সন্তান বড় হয়ে কী হবে, কীভাবে তার জীবন কাটবে তা নিশ্চিত করতে নিজেদের বর্তমানের প্রায় সবটুকু বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত থাকেন মা–বাবা। তবে সন্তানকে একটি পথের সন্ধান দিয়ে তার আগামী দিনে সমৃদ্ধ জীবন গড়ার পথ তৈরি করে দেওয়ার কাজ অনেকটা সহজ করা সম্ভব।

প্রযুক্তির উত্কর্ষের যুগে অনেক শিশুর জন্মের পর তার বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায়ে যুক্ত হয়ে যায় বিভিন্ন ডিভাইস। তাই সেসব শিশুর জগতের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে ডিভাইসের দখলে। তবে কয়েকটি প্রচেষ্টায় শুরু থেকেই শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে দেওয়া যেতে পারে।

বই পড়ার সু–অভ্যাস গড়তে বই কেনা জরুরি। সন্তানের বয়স অনুসারে তার জন্য, নিজের জন্য, এমনকি পরিবারের সব সদস্যের জন্য নিয়মিত বই কেনার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

শিশু যখন আপনার কথা শুনতে শুরু করেছে বা আপনার সঙ্গে গল্প করতে শুরু করেছে, সেই বয়স থেকেই তাকে বই পড়ে শোনাতে পারেন। শুনতে শুনতে পড়ার আগ্রহের বীজ বপন হওয়া খুব আশ্চর্যের কিছু নয়।

সন্তান যখন নিজে পড়তে শিখছে, তখন বইকে তার সঙ্গী করে দিন খেলাচ্ছলে। কোথাও বেড়াতে যাচ্ছেন, নিজের ব্যাগে একটা বই নিন, সন্তানের ব্যাগেও তার পছন্দের একটি বই নিতে উত্সাহিত করুন। ভ্রমণের সময় বাস, ট্রেন, উড়োজাহাজের জন্য অপেক্ষার সময়টিও বই পড়ার কাজে লাগাতে পারেন।

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। আপনাকে দেখেই শিখবে। তাই আপনি নিজে পড়ুন, শিশুর মধ্যেও উত্সাহ তৈরি হবে। যেমন বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার সময় ১০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত একটা বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। সারা দিনের এই অল্প সময় জীবন ভান্ডার সমৃদ্ধ করার পাথেয় হয়ে উঠতে পারে।

অনেকের বই কেনার অভ্যাস থাকলেও সন্তানের পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে না। সন্তান যে বইটি পড়ছে, তা নিয়ে তার সঙ্গে গল্প করুন। এই যেমন আপনার সন্তান হয়তো গুড্ডুবুড়া বইটা পড়েছে। ওর কাছ থেকেই গল্পটি শুনুন। তার পড়া বইটার গল্প ওর কাছ থেকে শুনলে ওর বই পড়ার আগ্রহ বাড়বে। আরও খানিকটা উত্সাহিত করতে বইটি নিয়ে লিখতে বলুন। কয়েকটা লাইনই লিখুক, তবু লিখতে বলতে পারেন। এই অভ্যাস সন্তানকে সমৃদ্ধ করবেই। একাডেমিক পাঠ্যবই পরীক্ষাভীতির কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুরা পছন্দ করে না। বই পড়ার ক্ষেত্রে সে কি পড়বে, তা চাপিয়ে দেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত। সন্তান যা পড়তে চায়, তা ওকে নির্বাচন করতে দিন। যে বইটি ওর ভালো লেগেছে, তা বারবার পড়তে উত্সাহিত করতে পারেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, লেখা আসলে কতগুলো সংকেত। এই সংকেতগুলো দিয়েই মানুষের মনে ছবি তৈরি হয়। অর্থাৎ কেউ যখন নদী বয়ে যায় পড়ে তখন তার মনে বহমান নদীর ছবি তৈরি হয়, যা মানুষের কল্পনার জগৎকে, চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে।

বিজ্ঞাপন

তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, কল্পনাশক্তির মতো এই অসাধারণ ক্ষমতায় আপনার সন্তানকে আগ্রহী করতে বই–ই পরম বন্ধু। ডিজিটাল যন্ত্রের রঙিন আলোর ঝলকানি ভরা জগৎ থেকে বইয়ের জগতে আগ্রহী করে তোলা সব সময় সহজ না–ও হতে পারে। একটি বই পড়লে সে একটি পুরস্কার পাবে, এমনভাবেও সন্তানকে পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে পারেন।

ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি বা অন্য কোনো লাইব্রেরির সদস্য করে দিতে পারেন। লাইব্রেরির সঙ্গে যোগাযোগ বইয়ের সঙ্গে মনের যোগাযোগের পথটাও প্রশস্ত করে দিতে পারবে। বই নিয়ে যেসব কর্মসূচি চলে, সেগুলোতেও যুক্ত হতে উত্সাহিত করে দেখতে পারেন। এমনকি স্বল্প পরিসরে হলেও নিজের লাইব্রেরি গড়ে তোলার পাশাপাশি সন্তানকে লাইব্রেরি গড়ে তুলতে আগ্রহী করতে পারেন।

লেখক: একজন অভিভাবক

মন্তব্য করুন