সম্পর্ক

সম্পর্ক

করোনাকালে সম্পর্ক মধুর, না খিটমিটে

একসঙ্গে বেশি সময় কাটানোর বিষয়টিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে একে অপরের পাশে থাকা জরুরি। মডেল: রিয়াদ ও লাবণ্য
একসঙ্গে বেশি সময় কাটানোর বিষয়টিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে একে অপরের পাশে থাকা জরুরি। মডেল: রিয়াদ ও লাবণ্যছবি: অধুনা
বিজ্ঞাপন

রীমা আর শাহেদের (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়েছে প্রায় ১২ বছর। দুই সন্তান তাঁদের। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে বড় ধরনের ঝগড়াঝাঁটি তাঁদের তেমন একটা হয়নি। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির সাধারণ ছুটিতে ঘরে থাকা শুরু হতেই ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে ছোটখাটো নানা বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। প্রায়ই ঝগড়া–বিবাদ, এমনকি দু–একবার হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।

আবার মুনা আর জাহিদ (ছদ্মনাম) দম্পতির ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। বিয়ের পাঁচ বছর পার হলেও তাঁদের দুজনের ব্যস্ততা এত বেশি ছিল যে তাঁরা নিজেদের মোটেও সময় দিতে পারতেন না। একমাত্র সন্তানের যত্নের দায়িত্বও ছিল নানি-দাদির হাতে। সাধারণ ছুটির কারণে তাঁরা নিজেদের অনেক সময় দিতে পারছেন। সন্তানের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানো হচ্ছে বলে শিশুটিও অনেক খুশি। সবার মধ্যে অন্তরঙ্গতা আর ভালোবাসা অনেক বেড়ে গেছে।

যেকোনো বড় ধরনের বৈশ্বিক দুর্যোগের পর মানুষের চিন্তা আর আবেগের পরিবর্তন ঘটে। প্রথমত, দুর্যোগ মোকাবিলা করতে গিয়ে মনের ওপর চাপ পড়ে। দ্বিতীয়ত, দুর্যোগের অভিঘাত সামলাতে গিয়ে মন ভেঙে যায় কখনো কখনো। আর মনোজগতের পরিবর্তন প্রকাশিত হয় আচরণের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারি এই শতাব্দীর অন্যতম বড় একটি দুর্যোগ। এই মহামারিকালে পরিবর্তিত হচ্ছে মানুষের আচরণ। একদিকে নতুন পৃথিবীর নিয়মকানুনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে, সেই সঙ্গে মহামারিতে সৃষ্ট মানসিক চাপও সামলাতে হচ্ছে। লকডাউনের সময় স্পেনে আগের চেয়ে ১৮ শতাংশ আর ফ্রান্সে আগের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ পারিবারিক সহিংসতা বেশি ঘটেছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশেও পারিবারিক সহিংসতার হার আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার ৭০০ নারী ও শিশুর ওপর পরিচালিত একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সাধারণ ছুটি বা লকডাউন চলাকালে প্রায় ২ হাজার ১০০ জন জীবনে প্রথমবার পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। একদিকে যেমন সহিংসতা বাড়ছে, তেমনি এই সময়ে কিন্তু সুযোগ রয়েছে পারিবারিক সম্প্রীতি বাড়ানোর।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

করোনাকালে যে কারণে পারিবারিক সংঘাত বাড়তে পারে—

 আগে থেকেই মতের অমিল ছিল, তবে সংঘাত এড়াতে আগে দূরে দূরে থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু লকডাউনের কারণে কাছাকাছি থাকতে বাধ্য হওয়ায় সংঘাত এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

 সংক্রমিত হওয়ার ভয়, মৃত্যুভয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রত্যেকের মনের ওপর চাপ বাড়ছে। এই চাপ প্রকাশিত হচ্ছে নিজের মেজাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্য দিয়ে। বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্পর্কের উন্নয়ন কীভাবে

প্রথমত, সময়টিকে সংকটকাল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সংকটে একে অপরের মধ্যে দূরত্ব না বাড়িয়ে আরও কাছাকাছি থেকে নিজেকে ও পরিবারকে ঝুঁকিমুক্ত রাখাই হোক সবার একমাত্র লক্ষ্য। এ সময় পারিবারিক বিবাদ এড়াতে যা করতে পারেন—

 এ সময় সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ করোনাভাইরাস। তাই অন্য কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব–সংঘাত, এমনকি তর্ক করে নিজের মানসিক শক্তি ক্ষয় করবেন না। আপনার সব ক্ষমতা আর শক্তি বিনিয়োগ করুন করোনা থেকে নিজেকে রক্ষার কাজে।

 পরিবারের কারও সঙ্গে নতুন করে মতের অমিল হলে বা আগে থেকেই মতের অমিল থাকলে সেটি মীমাংসা করার জন্য এটি মোটেও উপযুক্ত সময় নয়।

 ঘরের কাজে সবাই যাঁর যাঁর সাধ্যমতো অংশ নিন। এতে প্রত্যেকের মানসিক চাপ কমবে। সম্পর্ক দৃঢ় হবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভাবের আদান–প্রদান করুন। আবেগের বহিঃপ্রকাশে কৌশলী হোন। আপনার আবেগ অপরকে বুঝতে দিন। আবার অপরের আবেগ বোঝার সক্ষমতা অর্জন করুন।

 সমালোচনা নয়। যে কারও সমালোচনা করার অভ্যাস পরিত্যাগ করুন। সমালোচক সব সময়ই অসুখী। তাঁরা অপরকেও খুশি করতে পারেন না। পারিবারিক জীবনে সমালোচনা করা, বিদ্রূপ করা, টিপ্পনী কাটার অভ্যাস বর্জন করুন। আপনার ভাষা সংযত রাখুন। মনে রাখুন, পুরো পৃথিবী একটি নিদারুণ সংকটকাল অতিক্রম করছে।

 সাফাই গাইবেন না। কখনো কোনো ভুল করে ফেললে সেটা মেনে নিন। অযথা নিজের পক্ষে সাফাই গাইবেন না।

 প্রাচীর গড়বেন না। দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে, এই ভয়ে আরেকজনকে এড়িয়ে চলবেন না। সম্পর্কের মধ্যে কোনো ধরনের দেয়াল তুলবেন না। বরং ইতিবাচক আচরণ করুন।

 সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করুন। পারিবারিক সম্পর্ক আরও মজবুত করতে একসঙ্গে গুণগত সময় কাটান। বাসায় ঘরোয়া খেলা খেলুন। মুঠোফোনে সময় কম দিয়ে পরস্পরকে বেশি সময় দিন। বই পড়ার পর, সিনেমা দেখার পর দুজন মিলে আলোচনা করুন।

কোনোভাবেই সংঘাত বা সংঘর্ষে না গিয়ে দাম্পত্যে শান্তি বজার রাখার চেষ্টা করতে হবে দুজনকেই। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

আহমেদ হেলাল: সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন