বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে গেছে বেঁকে’। তবু কবরী তাঁর প্রতি মমতা পুষে রেখেছিলেন আজীবন। নিজের স্মৃতিকথা স্মৃতিটুকু থাক–এ ধরা আছে কবরীর সেই ‘প্রথম’–এর জন্য মমতাভরা এক অনুভূতি। চট্টগ্রামের মেয়ে মিনা পালের জীবনে তখনো আসেনি সুতরাং–এর তারা ঝলমলে অধ্যায়, কবরী হননি তখনো। এ সময় অসীম নন্দী নামে চট্টগ্রামের ফতেহাবাদের একজন তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। এরপর কবরীর বর্ণিল জীবন অনেক ঢেউয়ের বর্ণচ্ছটাতেই মুখর হয়েছে। তারপরও ‘ছায়া হয়ে তবু পাশে রইব’–এর মতো এই নায়িকার মনের মণিকোঠায় বসত করেছেন ওই প্রথমজন। এমনকি অসীম নন্দীর মনেও কবরী ছিলেন আমৃত্যু অমলিন।

কবরীর সঙ্গে মতিউর রহমানের একান্ত সাক্ষাৎকারে ফুটে উঠেছে সেই ভাষ্য, ‘অসীম নন্দী যে আমাকে পছন্দ করতেন বা বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, পরিবারের সবাই সে কথা জানেন। আমরা এক খাটে বসলাম। অনেক কথা হলো, গল্প হলো। তাঁর এক মেয়ে ছোটবেলার সেই গল্পটা শুনতে চাইলে, বকুনি দিয়ে ওকে থামিয়ে দিলাম। আস্তে আস্তে ফিরে আসার সময় হয়ে এল। সেখান থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পর থেকে আমার মোবাইলে অসীম নন্দীর নম্বর থেকে অনবরত ফোন আসতে লাগল। আমি আর ধরি না। তিনি আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন, দেখা করেছি। এরপর আবার ফোনে কথা চালিয়ে যাওয়া—এসব ভালো লাগছিল না। কিছুটা বিরক্ত হয়েই শেষে একবার ফোনটা ধরলাম। আমি কিছু বলার আগেই ওই পাশ থেকে একজন বলল, “আন্টি, আপনি যাওয়ার পরে বাবা মারা গেছেন!” আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। তার কথা শুনে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। জানতে চাইলাম, কী হয়েছিল? বলল, “জানি না। আপনার সঙ্গে দেখা হলো, হইচই করল, গল্প করল। ঠিক তার কয়েক দিন পর বাবা মারা গেছেন। আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যই বোধ হয় বাবা অপেক্ষা করছিলেন।” কী আশ্চর্য! ঘটনাটা এখনো আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়।’

default-image

আদতে প্রথম প্রেমের রূপ–গন্ধটি কেমন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ডিজিটালহীন দিনগুলোতে একসময় প্রেমের রূপও ছিল যেন অ্যানালগ। সেখানে প্রথম প্রেম—অনেকের জন্যই ছিল ‘বুক ফোটে তো মুখ ফোটে না’র মতো ঘটনা। পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া, আকাশ–বাতাস–ফুল–পাখি–লতাপাতার কথা বলা। এর ফাঁকে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’—এই নির্দোষ সরল কথাটি বলতেও যেন পেরোতে হতো কত ভয় আর দ্বিধার পাহাড়! এরপর থরথর হাতে বই বা খাতার ভাঁজে নীল খামের চিঠিটি গুঁজে দেওয়া, আকাশকুসুম কল্পনায় কেমন বোকা বোকা অনুভূতি... তারপর? প্রবল উত্তেজনা নিয়ে প্রত্যাশিত উত্তরের অপেক্ষা—কী জানি কী হয়! এই স্মৃতিগুলো বড়ই মধুময়, মায়াভরা। হ্যাঁ, কেউ হয়তো মুখ ফুটে কখনো বলতেই পারেননি ভালোবাসার কথা, কিন্তু তিনি জানতেন, চার চোখের কম্পিত চাহনিতে, দৃষ্টি ও হাসি বিনিময়েই ঘটে গেছে তাদের প্রেমের শুভ মহরত।

এখন অবশ্য দিন বদলেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম নানা কিছুর প্রবল্যে আজকাল প্রেমের প্রকাশে এসেছে পরিবর্তন। তবে প্রথম প্রেম তো প্রথমই—যুগ ও প্রকাশভঙ্গি বদলালেও এর সঙ্গে অন্য কোনো অনুভূতির তুলনা কি চলে! এ প্রসঙ্গে কবি মোহাম্মদ রফিক মাত্র একটি বাক্য খরচা করে বললেন মহার্ঘ্য এক কথা, ‘জীবন কী তা তো প্রথম ভালোবাসাই শেখায়।’

প্রেম, মানে প্রথম প্রেম নিয়ে এত বড় কথা বলতে তাকদ না লাগলেও দহন বা ক্ষত লাগে—এমন কথা অনেকের মুখেই শোনা যায়। তাহলে ‘সব শালা কবি হবে’—এই সাহসী উচ্চারণ যিনি একসময় করেছিলেন, সেই মোহাম্মদ রফিকের জীবনেও কি দহন আছে?

নিজের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বেশ অকপটেই মোহাম্মদ রফিক বলেছেন, বাগেরহাটের বৈটপুরে তাঁর গ্রামের এক তরুণী ছিলেন কবির প্রথম প্রণয়ী। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, কৃষ্ণা নামের সেই মেয়ের সঙ্গে তাঁর কখনো প্রেমবাক্য বিনিময় হয়নি, তবু তাঁরা দুজনেই জানতেন, একে–অপরকে তাঁরা অনুভব করেন। ১৯৬৪ সালে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যায় সেই মেয়ে। এরপরই হয়তো ‘কী যাতনা বিষে’ কবি হয়ে ওঠেন মোহাম্মদ রফিক। তিনি বলেন, ‘১৯৭১–এ কৃষ্ণার সঙ্গে আমার কলকাতায় দেখা হয়েছিল। আমি তাকে একটি কথাই বলতে চেয়েছিলাম, “আমি যদি জীবনে কিছু করতে পারি, মনে রেখো তা তোমারই অবদান।”’ কিন্তু ওই কথাটিও প্রথম প্রেয়সীকে আর বলতে পারেননি কবি। তাতে কী! নিজের কবিতার শব্দে–শব্দে কৃষ্ণার রূপ তো তিনি গড়েছেন বিচিত্র অবয়বে:

‘পাওয়া না-পাওয়া

বহু কিছু ছেড়েছি জীবনে

এমনকি তোমাকেও,

অথচ তুমিই করে গেলে দান

অন্ধকূপে প্রায় অন্ধ যাত্রা

তুমি শুধু রয়ে গেলে আলোর বর্তিকা।’

প্রথম প্রেম আলোকবর্তিকা—কবির মতো এত বড় দাবি আমরা নিশ্চয় করব না। তবে এটা অবশ্যই বলা যাবে, বেশির ভাগ সময়ে মানুষের মনে প্রথম প্রেমের স্মৃতিমঞ্জরি সোনারুপা হয়ে থাকে। সেই প্রেম পরিণতি পাক বা না পাক, প্রথম প্রেম এমন এক অমল ধবল বুদ্‌বুদ, যা আমাদের জীবনের একান্ত মুহূর্তে মাঝেমধ্যেই মৃদু মৃদু সুখের ধাক্কা দেয়। আর আমরা তখন আনমনেই হয়তো গলায় তুলে নিই আমাদের নিজস্ব ‘নীলাঞ্জনা’র জন্য গাওয়া নচিকেতার বহুশ্রুত এই গান:

‘এরপর একরাশ কালো কালো ধোঁয়া

স্কুল বাসে করে তার দ্রুত চলে যাওয়া

এরপর বিষণ্ন দিন বাজে না মনোবীণ

অবসাদে ঘিরে থাকা সে দীর্ঘ দিন

হাজার কবিতা, বেকার সবই তা

তার কথা কেউ বলে না

সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা।’

প্র অধুনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন