বিনোদন

চলচ্চিত্র সমালোচনা

বাঁশ বৈভব: জলজঙ্গল ও মানুষ পেরিয়ে

বিজ্ঞাপন
default-image

শাহীন দিল-রিয়াজের সাম্প্রতিক সিনেমা 'বাঁশ বৈভব' লাখো বাঁশ একসঙ্গে বেঁধে উৎস থেকে ভাসিয়ে বন্দর ও বাজারে নিয়ে আসার যাত্রার চলচ্চিত্রায়ণ করে এক মহাকাব্যিক ঢঙে। এতে আছে জল ও জঙ্গল, আছে মানুষের গল্প। কিন্তু এসব ছাড়িয়ে 'বাঁশ বৈভব' এক অনন্ত যাত্রাকে চলচ্চিত্রায়িত করে, যা অবলোকন করে আমাদের চৈতন্য সংক্রমিত হয় মহাকালের প্রশান্ত অভিঘাতে।

প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে চৈতন্যের দেখাকে ও ভেতরের বোধকে প্রকাশ করে সিনেমা। এ মাধ্যমটির রয়েছে তাৎক্ষণিকতা, অর্থাৎ যখন সিনেমাটি দেখছি তখন পর্দার দৃশ্য শরীরকে সরাসরি উদ্দীপ্ত করে, যে কারণে অ্যাকশন ও যৌনতা থাকে বক্স অফিস হিট করা সিনেমার পরতে পরতে। কিন্তু সিনেমার প্রধান শক্তি হলো, একটি সিনেমা বোধের অতলে টোকা দেয়। সে বোধ কখনও কখনও ঘাপটি মেরে থেকে ক্রমশ দর্শককে আক্রান্ত করে, এবং এভাবেই একটি সিনেমা হয়ে ওঠে দর্শকের ব্যক্তিগত তেপান্তর, যেখানে সে নিঃশ্বাস নেয়, ঘুরে বেড়ায়। শুদ্ধ সিনেমা চৈতন্য, আবেগ ও অনুভূতিতে যে দাগ কাটে তা ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়। ভাষা তো অন্য শিল্পকে ধারণ করে, যেমন সাহিত্য। মানুষের চেতনাকে যুক্ত করার সহজতম এবং শক্তিশালী উপায় গল্প বলায়, তাই প্রায় সব সিনেমাই গল্প থাকে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
ছবির প্রতিটি চরিত্রের আছে নিজস্ব গল্প। শহীদ, সিরাজ, নুরু ও হুসাইন বাঁশের ভেলা টেনে নিয়ে যায়। তাদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রধানত ভাটা, কখনো মৃদু জোয়ার।

‘বাঁশ বৈভব’-এ একটি গল্প আছে। শাহীন একটি গল্প বলেন—বাঁশমহাল থেকে বাঁশ কেটে নদীতে ভাসিয়ে বন্দরে বন্দরে বিক্রি করা, এক হাত থেকে আরেক হাতে বাণিজ্যের নিয়মে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার গল্প। এ গল্পের পরতে পরতে আছে লেয়ার, যার প্রত্যেকটি নিয়েই ভিন্ন ভিন্ন সিনেমা হতে পারে। ছবির প্রতিটি চরিত্রের আছে নিজস্ব গল্প। শহীদ, সিরাজ, নুরু ও হুসাইন বাঁশের ভেলা টেনে নিয়ে যায়। তাদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রধানত ভাটা, কখনো মৃদু জোয়ার। শহীদের স্ত্রী আগুনে পুড়ে মারা গেছে, ঘরে তার শিশুসন্তান বাবার অপেক্ষায়। সিরাজের আয়–উন্নতি নেই, স্ত্রী সংসার আগলে রাখে। অবসর নেওয়ার বয়সেও নুরুর পরিশ্রমের ঘাম ঝরে পড়ে নদীর জলে। বারবার নদীভাঙনে বসত হারাবে, এটাই যেন হুসাইনের কপালের লিখন। এরা সবাই জলের মানুষ, জল তাদের জীবিকার ভরসা ও উপায়। অন্যদিকে জঙ্গলে অমানুষিক পরিশ্রম করে লিয়াকত ও তার সঙ্গী বাঁশ শ্রমিকেরা। এরা পরিশ্রমী, মুখে দাঁ কামড়ে দু’হাতে বাঁশ বয়ে নিয়ে যায় লিয়াকত। এই দাঁ লিয়াকতের অস্তিত্বের সম্প্রসারণ, এর সঙ্গে বাঁশ শ্রমিকদের জৈবিক সম্পর্ক, যা নিষ্ঠুরতায় ব্যবহারের জন্য নয়, এটা জীবিকার হাতিয়ার। জঙ্গলে অমানবিক পরিশ্রম করে লিয়াকত ও তার সঙ্গী বাঁশ শ্রমিকেরা। এই মানুষেরা জল ও জঙ্গল থেকে মুক্তি চায়। কেউই তাদের সন্তানদের এ পেশায় রাখতে চায় না। জল ও জঙ্গল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য সন্তানদের লেখাপড়ায় উৎসাহ দেয় তারা, যে লেখাপড়ার সুযোগ তাদের হয়নি। শাহীন এ রকমই একটি ন্যারেটিভের বুননে বাঁশ বৈভব গড়েছেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

কিন্তু ‘বাঁশ বৈভব’ সাহিত্য নয় বলে আমরা সূত্র খুঁজব সিনেমার সেন্সে এর অন্তর্গত দ্যুতি কোথায়। সিনেমা যেকোনো শিল্পের মতোই শিল্পীর ব্যক্তিগত অবলোকনের রূপায়ন, যা দর্শক হিসেবে আমরা অবলোকন করি নিজস্ব চিন্তা, চৈতন্য ও বোধের পাটাতন থেকে। একটি সিনেমা দেখার মানেই হচ্ছে সেই সিনেমাটির নির্মাতার অবলোকনকে অবলোকন করা। নির্মাতার—সিনেমার প্রেক্ষাপটে যাকে আমরা বলবো সিনেমাকার—নির্মিতিতে একটা শৈলী থাকে, যার ফ্রেমে তিনি একটি কাহিনীর আদলে একটি বোধকে রূপায়িত করেন। অন্য অর্থে তিনি একটি আঙ্গিক তৈরি করে দেন। দর্শককে তার নিরিখে সিনেমাটিকে নিজস্ব বলয়ে দেখতে হয়। আঙ্গিকটি তৈরি হয় আলোকচিত্রের ধরন ও ধারণ এবং সম্পাদনার সৌকর্যে। কাহিনী বা কখনও কখনও একটি বার্তা থাকতেই পারে, কিন্তু সিনেমায় আঙ্গিকই মূল সেন্সটি তৈরি করে, এবং একজন সিনেমাকারের মেধা ও মুন্সিয়ানা তার নির্মাণের আঙ্গিকে। সিনেমার শুদ্ধতা এর আঙ্গিকে, যা কাহিনী অতিক্রান্ত একটি বোধকে জাগায়। আমাদের নিজস্ব অবলোকনে সিনেমাটিতে আমাদেরই ব্যক্তিগত অর্থ আরোপ করতে কিছু ইশারা দেয়। এভাবেই একটি সিনেমা উৎস হয় হাজারো সিনেমার, যে সিনেমা তৈরি হয় দর্শকের ভাবনায়, চেতনায় ও চৈতন্যে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
পাশ্চাত্যের সিম্ফনির ভিত্তিতে দৃশ্যজুড়ে থাকা আবহসংগীত একটি অনন্ত যাত্রাকে ধ্বনিত করে। এ সংগীতটি সিনেমার পালস, থেকে থেকেই আসে।

শাহীনের ফ্রেমে ডিটেইলস ধরা দেয় অগতানুগতিক স্টাইলে। 'বাঁশ বৈভব’-এর সিনেমাটিক শক্তি এর ফ্রেমিং, সম্পাদনা ও নিঃস্পৃহ বয়ানে। প্রথম তিনটি শটে আমাদের মনোযোগ নড়েচড়ে বসে। সিনেমাস্কোপে ১৬:৯ অনুপাতে চিত্রায়িত বলে দৃশ্যগুলোয় অন্য রকম ব্যঞ্জনা। মহাজন জর্জ মিয়া বলছে তার ছেলেকে এ ব্যবসায় রাখবে না। ক্লোজ আপে শিশুটিকে দেখা যায়। সিনেমাস্কোপ হওয়ায় শিশুটির ডানে ও বাঁয়ে দু’জন বয়স্ক লোকের হাতের কনুই, শিশুটি আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এরকম শট কী যেন একটা ইশারা দেয়! পরক্ষণেই কাট করে নদীতে ফোরগ্রাউন্ডে বাঁশ, ব্যাকগ্রাউন্ডে নৌকা। কেউ নৌকায় শুয়ে আছে, কেউ টানছে সিগারেট। ক্লোজআপে একটি মোরগ—ঝিমুচ্ছে এবং ভীত। মিডশটে ডানদিকে মোরগটি বাঁধা, বাঁ দিকে মাঝি ও ভেলার শ্রমিক, যারা মোরগটি রান্না করে খাবে। ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে কুয়াশার নদীতে নৌকা ও বাঁশের ভেলা, একটা গান- “আমার দেওয়া গাঁথা মালা কার গলায় পরাওরে বন্ধু’। দ্বিতীয় শট, মিডশটে শহীদ গান গাইতে গাইতে বাঁশ তুলছে নৌকায়, বেদনার মুক্তো ঝরে জলে। পরবর্তী ক্লোজশটে একটি হাত দাঁ দিয়ে বাঁশ কাটছে, নিচে জলের ছলাত ছলাত। ক্লোজ, মিড ও লং শটের পর ক্যামেরা আকাশে, বৃক্ষরাজির ওপর দিয়ে জঙ্গলে ধাবমান আমাদের দৃষ্টি। জঙ্গলের ভেতর শ্রমিকরা বাঁশ কাটছে।

পাশ্চাত্যের সিম্ফনির ভিত্তিতে দৃশ্যজুড়ে থাকা আবহসংগীত একটি অনন্ত যাত্রাকে ধ্বনিত করে। এ সংগীতটি সিনেমার পালস, থেকে থেকেই আসে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

বৈদ্দেরবাজারে যাত্রা শেষ হয়। শহীদেরা বাড়ি ফেরে আবারও বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবে বলে। সিরাজ আবার যাত্রার জন্য ঘর ছাড়ছে, মিডশটে তার স্ত্রীর অপলক চাহনি। কিছুটা দুঃখ ও বিরহ, কিছুটা অন্য কিছু। বৈদ্দেরবাজারে যাত্রা শেষ হয়। শহীদরা বাড়ি ফিরে আবারও বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবে বলে। সিরাজ ফের যাত্রার জন্য ঘর ছাড়ছে, মিডশটে তার স্ত্রীর অপলক চাহনি। কিছুটা দুঃখ ও বিরহ, কিছুটা অন্যকিছু। এখানেই শাহীন বাংলাদেশি নির্মাতাদের চেয়ে অন্যরকম। এখানে এবং অন্য সর্বত্রই শাহীন নিঃস্পৃহ আবেগের বুঁদবুঁদ থেকে। মানুষের কষ্ট, দুঃখ, বিরহ এবং স্বপ্নের সামান্য ইশারা দিয়ে সে চৈতন্যের ভিন্ন কোথাও টোকা দেয়। এরকম নিঃস্পৃহতা ও বিযুক্ততাই সিনেমাকে নাটক থেকে আলাদা করে।

শাহীনের ক্যামেরা—অর্থাৎ তার চোখ—এক মহাকাব্যিক জগত তৈরি করে, যে জগত আমাদের এক কসমিক অনুভূতিতে জারিত করে। শেষ দশ মিনিটের মেহনতি বাঁশ-শ্রমিকের দুর্দান্ত কারিগরি কৌশল—যা আদিম কিন্তু অব্যর্থ—দেখে আমরা যখন শারীরিকভাবে উদ্দীপ্ত হই, নার্ভ টানটান হয়, ঠিক তখন শাহীন আমাদের নিয়ে যায় যাপিত জগত থেকে অনেক দূরে। বাঁশ নামানো হচ্ছে টেনে, ধাক্কা দিয়ে, আঁকাবাঁকা ছড়া দিয়ে। ঊর্ধ্বশ্বাসে আমরা যখন এরকম একটি পরিশ্রমী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সহগামী হই, ক্যামেরা মুহূর্তের জন্য জলের নিচে, তারপর ক্ষণিকের অন্ধকার। আঁধার থেকে উঠি, আমরা অবলোকন করি আলো—ওপর থেকে পাখির দৃষ্টিতে দেখি জনপদ, নদী এবং জঙ্গল। বৃক্ষরাজির সবুজে চোখ ধুয়ে আমাদের যাত্রা দিগন্তে পাহাড় পেরিয়ে অন্য কোথাও।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘বাঁশ বৈভব’ জলজঙ্গল ও মানুষের গল্প বলেও তাদের পেরিয়ে যায়। শাহীনের সিনেমায়িত অবলোকন আমাদের অবলোকনকে শেষ পর্যন্ত বিযুক্ত করে পার্থিব জীবন থেকে, পৌঁছে দেয় চৈতন্যের গভীরে; যেন আমরা স্রষ্টার বোধে নিমজ্জিত হই, যে তার সৃষ্টিকে দেখে আপ্লুত হয় না, হয় প্রশান্তিতে ধ্যানমগ্ন। আমরা অনুধাবন করি মানুষের কাজ যদিও পরিশ্রমের ও আয়োজনের, প্রকৃতির বিশাল সংগীতে তা একটি ছোট্ট স্বর মাত্র।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন