default-image

ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা বাড়ছে। প্রেমের সম্পর্ক ভাঙা বা ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জের ধরে অনেক নারীর ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হচ্ছে, যৌন নিপীড়নমূলক বার্তা পাঠানো হচ্ছে, অনেকের ছবি বা নাম ব্যবহার করে ভুয়া আইডি তৈরি করে হেনস্তা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশ পরিচালিত ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামের ফেসবুক পেজে গত সাড়ে চার মাসে ৭ হাজার ৩৫৩ নারী অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুয়া আইডির, প্রায় ২৯ শতাংশ।

অনলাইনে সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, এমন চারজন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। এর মধ্যে একজন উদ্যোক্তা, বাকি তিনজন রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ওই চারজনের মধ্যে একজন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। ছাত্রীদের মধ্যে একজন থানায় যেতে চাইলেও নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁর মা বাধা দেন।

এক ছাত্রী জানান, প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার পর গত বছরের ৩১ মার্চ ছেলেটি তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বা আইডি হ্যাক করে এবং তাঁকে বিভিন্ন ধরনের বার্তা পাঠাতে থাকে। করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ছাত্রীটির সব যোগাযোগ হতো ওই আইডি থেকে। মাত্র এক সপ্তাহ পর ছিল মিডটার্ম পরীক্ষা কিন্তু মেয়েটি মানসিকভাবে এতই ভেঙে পড়েন যে পরীক্ষায় আর অংশ নিতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

আরেক ছাত্রী এবং তাঁর প্রেমিক হস্তশিল্প পণ্য বিক্রির জন্য একটি ফেসবুক পেজ চালাতেন। লাইকের সংখ্যা ছিল প্রায় সাত হাজার। প্রেমিকের সঙ্গে একজনের নতুন সম্পর্কের জের ধরে তাঁর আইডি হ্যাক করা হয়। মেয়েটির নামে ভুয়া (ফেক) আইডিও খোলা হয়। মেয়েটি ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আবার পড়াশোনাতেও ব্যাঘাত ঘটেছে।

আরেকজন ছাত্রী সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। সেখানে অন্য একটি পক্ষ চার বছর আগে তাঁর ছবি ব্যবহার করে ফেক আইডি খোলে। বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকেও তাঁকে যৌন হয়রানিমূলক বার্তা পাঠানো শুরু করে। ওই ঘটনায় তিনি ছয় থেকে সাত মাস অসুস্থ ছিলেন।

উদ্যোক্তা নারী জানান, কমিউনিটিভিত্তিক দুটি ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন তিনি। এক নারীর পরিচয় নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকায় তাঁকে গ্রুপের সদস্য করেননি। সেই জের ধরে ওই নারী তাঁর উদ্যোক্তা পেজে গিয়ে পণ্যের গুণগত মান নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা শুরু করেন। সেখানেই থেমে থাকেননি, ফোনেও হুমকি দেন। গত বছরের জুনে এই নারী ভাটারা থানায় বিষয়টি উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হিসাব অনুসারে, গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটি ২৭ লাখ ১৫ হাজার। এর মধ্যে মুঠোফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ৩১ লাখ ৯৩ হাজার। বাকি ব্যবহারকারীরা ব্রডব্যান্ড সংযোগ ব্যবহার করেন।

সাড়ে ৪ মাসে ৭ হাজারের বেশি অভিযোগ

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে, গত বছরের ১৬ নভেম্বর ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ফেসবুক পেজ চালু করা হয়। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত মাত্র সাড়ে ৪ মাসে এই পেজে ৭ হাজার ৩৫৩টি মেসেজ, হটলাইন নম্বরে ১১ হাজার ২১৩টি ফোনকল ও ই-মেইলে ২৬৩টি অভিযোগ এসেছে। ই-মেইল ও ফোনকলে যোগাযোগ করা অনেকেই আবার ফেসবুক মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেছেন। ফলে তালিকাভুক্ত সেবাপ্রত্যাশীর সংখ্যা ৭ হাজার ৩৫৩ জন ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩২৮ জনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ৩ হাজার ৬৯৪ জনের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে। বাকি ৩৩১ জনের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

ইন্টারনেট নিয়ে জানাশোনা তুলনামূলক কম থাকা এবং সরল বিশ্বাসের কারণে নারীরা অনলাইনে সহিংসতার সহজ লক্ষ্যে পরিণত হন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, বাস্তবের বাইরের জগতে নারীদের বিচরণ কম। অনেকে অনলাইনে বন্ধু গড়তে নিরাপদ বোধ করেন। সরল বিশ্বাস থেকেও প্রতারণার শিকার হন। আবার নিজের আইডির ক্ষেত্রে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা সম্পর্কেও অনেক নারী কম জানেন। অন্যদিকে নিপীড়ক পুরুষেরা অফলাইন, অর্থাৎ বাস্তব জগতের মতো অনলাইনেও সক্রিয় থাকে।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ‘ফেক আইডির’

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ফেসবুক পেজে আসা অভিযোগগুলোকে সাতটি ধরনে ভাগ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারীর ছবি বা পরিচয় বা দুটিই ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খোলার অভিযোগ এসেছে ২ হাজার ১০২টি (২৮.৬ শতাংশ)। বিভিন্ন ওয়েব ঠিকানা বা অ্যাপ ব্যবহার করে ও পাসওয়ার্ড চুরি করে আইডি হ্যাক করার অভিযোগ ৫৯১টি (৮ শতাংশ); পূর্বপরিচয় বা সম্পর্কের জের ধরে বা অন্য কোনোভাবে প্রাপ্ত ছবি, ভিডিও বা তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ ৬৫৩টি (৮.৮ শতাংশ); মুঠোফোনে হয়রানির অভিযোগ ৫৫৮টি (৭.৬ শতাংশ); অশ্লীল লেখা ও ছবি (কনটেন্ট) পাঠানোর অভিযোগ জমা পড়েছে ৪৩১টি (৫.৯ শতাংশ)। এসব অপরাধের তালিকায় পড়ে না, এমন ‘অন্যান্য’ অভিযোগ রয়েছে ১ হাজার ৮১টি (১৪.৭ শতাংশ)। এ ছাড়া ১ হাজার ৯৩৭টি (২৬.৩ শতাংশ) অভিযোগ ‘নন-সাইবার’ অপরাধ এবং পুরুষ সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে আসায় সেগুলো ‘অপ্রাসঙ্গিক’ তালিকায় ফেলা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাহ্ফুজা লিজা প্রথম আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়। অনলাইনে সহিংসতা ও সাইবার হয়রানির শিকার হলে আইনি সহায়তা নেওয়ার কিছু হেল্প ডেস্ক রয়েছে। যেমন কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন, সাইবার পুলিশ সেন্টার, পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ), হ্যালো সিটি অ্যাপ, রিপোর্ট টু র‌্যাব অ্যাপ, ৯৯৯ এবং প্রতিটির ফেসবুক পেজে অভিযোগ জানানো যায়। পিসিএসডব্লিউ নারী পুলিশ পরিচালিত বলে মেয়েরা অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন।

সহিংসতা-হয়রানির বৈশ্বিক জরিপে বাংলাদেশ

গত ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষে লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট গ্রুপের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত বৈশ্বিক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী নারীদের ৮৫ শতাংশ অনলাইনে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এ সহিংসতায় বিশ্বে এশিয়ার অবস্থান চতুর্থ। ওই জরিপে বাংলাদেশের ১০০ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইআইইউ গুগলের জিগসোর সহায়তায় ইন্টারনেট ব্যবহারের জনসংখ্যার আধিক্যের বিচারে ৫১টি দেশের ওপর জরিপটি চালানো হয়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যার বিচারে ওই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩১ নম্বরে। ‘মিজারিং দ্য প্রিভিলেন্স অব অনলাইন ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’ (নারীর প্রতি অনলাইনে সহিংসতার ব্যাপকতা পরিমাপ) শিরোনামে ওই প্রতিবেদনের জন্য এই জরিপ পরিচালিত হয় গত বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট নারীর জন্য শাঁখের করাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে এটা নারীদের জন্য নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করছে, অপরদিকে এই মাধ্যমে নারীরা নিপীড়কের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছেন। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে পড়াশোনা, কেনাকাটাসহ অনলাইনভিত্তিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। নারীরা আগের তুলনায় বেশি সময় থাকছেন অনলাইনে। ফলে নারীদের অনলাইন সহিংসতা ও সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে।

জরিপে ৫১টি দেশের ৪ হাজার ৫৬১ জন নারী অংশ নেন। ইআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, কম বয়সী মেয়েরা সহিংসতার বেশি শিকার হচ্ছে। অঞ্চলভেদেও অনলাইন সহিংসতার তারতম্য দেখা গেছে। করোনাকালে সবচেয়ে বেশি অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের নারীরা, ৯৮ শতাংশ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ৯১ শতাংশ, আফ্রিকায় ৯০ শতাংশ, এশিয়ায় ৮৮ শতাংশ, উত্তর আমেরিকায় ৭৬ শতাংশ এবং ইউরোপে সবচেয়ে কম, ৭৪ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সহিংসতার শিকার হলেও অভিযোগ করার বিষয়ে সচেতন নন বেশির ভাগ নারী। জরিপে অংশ নেওয়া সহিংসতার শিকার চারজনের একজন অভিযোগ করেছেন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। আর ১৪ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেছেন। অংশগ্রহণকারীদের ৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা সহিংসতার শিকার হয়ে কাজ হারিয়েছেন বা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ৩৫ শতাংশের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়েছে। হুমকির কারণে ১০ জনের ১ জন শারীরিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনজনের একজন অনলাইনে কনটেন্ট পোস্ট করার আগে দুবার চিন্তা করেন। ৫০ শতাংশই ইন্টারনেটকে নিরাপদ মনে করেন না এবং কনটেন্ট পোস্ট করার ক্ষেত্রে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরোপ করেন।

বিজ্ঞাপন
নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন