অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা খাতে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তামান্না মোনেম
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা খাতে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তামান্না মোনেমসংগৃহীত

বাংলাদেশের মেয়ে তামান্না মোনেম। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা খাতের ব্যবসায় জড়িত। দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। গত বছরের ২৬ নভেম্বর অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রির ‘ডিফেন্স কানেক্ট রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২০’ সম্মাননা পেয়েছেন তামান্না মোনেম। সরকারের কেন্দ্রীয়, প্রাদেশিক এবং স্থানীয় এই তিন স্তরের সঙ্গে শিক্ষা–গবেষণা ও ব্যবসার মধ্যে সমন্বয় করে একটি ‘ট্রিপল হেলিক্স কোলাবোরেশন মডেল’–এর মাধ্যমে তিনি কাজ করে সুনাম অর্জন করেছেন।

সম্মাননা পাওয়ার পর ফেসবুকে তামান্না মোনেম লিখেছেন, ‘যেকোনো স্বীকৃতি লাভই আনন্দের বিষয়। আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ। সামনে আরও এগিয়ে যেতে চাই।’ আর প্রথম আলোকে বললেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা একজন বিবাহিত নারীর জন্য প্রতিরক্ষা খাতের ব্যবসার মতো জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করা মোটেই সহজ বিষয় নয়। তবে আমি পেরেছি। এর মানে হলো অন্য নারীরাও পারবেন।’ সম্প্রতি ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথা হয় তামান্না মোনেমের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

বাবা এ বি এম মাইনউদ্দিন আহমেদ ১৯৮৫ সালে দেশে কম্পিউটার শেখার স্কুল চালু করেছিলেন। উদ্যোক্তা বাবাকে দেখেই মেয়ে তামান্না মোনেমের ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহ তৈরি হয়েছিল। এখন তামান্নার নামের আগে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ। চার বছর ধরে লিড ফর ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রেড হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের ইপসউইচ সিটি কাউন্সিলে কাজ করছেন। ২৬ বছর ধরে তামান্না অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী। স্বামীর সঙ্গে দেশটিতে গিয়েছিলেন তিনি।

তামান্না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা প্রশাসনে মাস্টার্স করে অস্ট্রেলিয়ায় যান। এরপর ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে ২০ বছর ধরে সরকারের বিভিন্ন বিভাগে চাকরি করছেন। এর আগে ২০১৬ সালে ‘অস্ট্রেলিয়া–ইন্ডিয়া বিজনেস অ্যান্ড কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিলেন। কুইন্সল্যান্ডে উইমেন ইন বিজনেস ফর অস্ট্রেলিয়া ইন্ডিয়া বিজনেস কাউন্সিলের চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

তামান্না জানালেন তাঁর কাজ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায় ক্ষুদ্র, মধ্যম এবং বড় ব্যবসা উদ্যোগের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানা। এই উদ্যোগগুলোকে অস্ট্রেলিয়ায় এবং বিভিন্ন দেশের যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তার সঙ্গে সংযুক্ত করাও তাঁর কাজ। সরকারের নীতি পর্যালোচনা, কৌশলপত্র তৈরি করে নতুন নতুন কর্মসূচি তৈরি করেন তামান্না।

default-image

তামান্না মোনেমের দায়িত্বের আরেকটি জায়গা হচ্ছে চাকরির বাজার খুঁজে বের করা। তিনি বলেন, ‘আমার কাজ হলো মাছ ধরা শিখিয়ে দেওয়ার মতো। চাহিদা তৈরি করেছে সরকার। সেই চাহিদা অনুসারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাঁদের সক্ষমতা বাড়ান। সরকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় করার কাজটি করে দিই।’ অস্ট্রেলিয়ার ক্ষুদ্র, মধ্যম ও বড় ব্যবসার চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা কোথায় আছে, স্বনির্ভরতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ, চীন, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ ৬টি অঞ্চলে ১০টি খাত নিয়ে কাজ করেছেন তামান্না।

তামান্না মোনেম বললেন, ‘ডিফেন্স কানেক্ট রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২০ সম্মাননা পেতে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়েছে। মূলত গত বছর করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে অনেক ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রায় ৩০০ ব্যবসায় উদ্যোগের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছিলাম, তারই ফলাফল এই সম্মাননা।’

তামান্নার দায়িত্ব নিজের এলাকার ব্যবসা উদ্যোগগুলোর সম্প্রসারণ করা। কোন ব্যবসার সম্ভাবনা কেমন বা অন্যান্য দেশ থেকে এ ব্যবসার জন্য কীভাবে বিনিয়োগ আনা যায়, তা দেখা। সরকার কোন খাতে বেশি বিনিয়োগ করছে, তা পর্যালোচনা করা। তিনি বললেন, ‘কাজ করতে গিয়ে দেখলাম, দেশের ভেতর সৈন্যদের নিরাপদ রাখার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতকে স্বনির্ভর করতে সরকার এ খাতে ২৬৭ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা করেছে। তাই আমিও প্রতিরক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিই।’

বিজ্ঞাপন

২২ বছর আগে বিয়ে করেছেন তামান্না। এখন স্বামী এবং দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার। বাবা মারা গেছেন। মা অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। তামান্না মোনেম বললেন, ‘আমি স্বামীর সঙ্গে এই দেশে এসেছিলাম। তবে সব সময়ই ইচ্ছে ছিল নিজে কিছু করব। কোনোভাবেই অন্য কারও ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইনি। তাই আমার আগ্রহের জায়গাও নারীর ক্ষমতায়ন।’

তামান্নার ডাকনাম পিয়ানো। এ নামের বদলে জানালেন তাঁর নানা রাজনীতির পাশাপাশি গান-বাজনা পছন্দ করতেন। তিনি নাম রাখেন পিয়ানো। এক ভাইয়ের নাম গিটার ও এক বোনের নাম সেতার। তবে দাদা নাম রাখেন তামান্না বিলকিস। বিয়ের পর তামান্না মোনেম পিয়ানো হিসেবে পরিচিতি পান। ছোটবেলায় পাইলট হতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে তখন নারীদের কাজের কোনো সুযোগ না থাকায় ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি। এই ইচ্ছাগুলোও তাঁকে প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে কাজের আগ্রহ জুগিয়েছে।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন