বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, করোনাকাল দেশের যেসব অগ্রগতিতে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যে বাল্যবিবাহ রোধ অন্যতম। দেড় বছর বন্ধ থাকার পর গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়া হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষকেরা লক্ষ্য করেন, মেয়েদের অনুপস্থিতির হার বেশি। তাদের মধ্যে অনেকের বাল্যবিবাহ হয়েছে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও এই মেয়েদের লেখাপড়া অব্যাহত রাখতে বিশেষ বিবেচনায় উপবৃত্তি চালু রাখার দাবি উঠছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ১৯৮২ সালে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ছাত্রীদের নগদ সহায়তা দেওয়া শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে চারটি প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়া শুরু হয়। ২০০২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও চালু হয় উপবৃত্তি। ২০০৯ সালে দরিদ্র পরিবারের মেয়ের পাশাপাশি ছেলে শিক্ষার্থীদেরও উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে ‘সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচি’র আওতায় ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে।

শর্ত সাপেক্ষে উপবৃত্তি চালু থাকুক: রাশেদা কে চৌধূরী

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, উপবৃত্তি শিক্ষার মান না বাড়ালেও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমায়। উপবৃত্তি বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা কিছুটা কমিয়েছিল। করোনার কারণে সব ওলটপালট হয়ে গেছে। আয় কমে যাওয়ায় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক বাবা-মা মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিয়েছেন। নিয়ম অনুসারে, স্কুলে পড়া মেয়েটির বিয়ে হলে উপবৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। করোনা পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে অনুরোধ ও আবেদন জানানো হয়েছিল, বাল্যবিবাহের শিকার এই মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনতে শর্ত সাপেক্ষে উপবৃত্তি যেন চালু রাখা হয়। করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৮ মাস বন্ধ ছিল। স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরকার ঘোষণা দিতে পারে, ওই ১৮ মাসে যে মেয়েদের বাল্যবিবাহ হয়েছে, শুধু তাদের জন্য উপবৃত্তি চালু রাখা হবে। ওই ১৮ মাসে বিয়ে হয়েছে কি না, তা স্কুল কর্তৃপক্ষ জানানোর পর উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা বা দায়িত্বরত অন্য কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা, তা যাচাই–বাছাই করবেন। শর্ত ছাড়া ঢালাওভাবে এ সুযোগ দেওয়া যাবে না, তাতে বাল্যবিবাহ আরও বেড়ে যেতে পারে।

সংকলিত হচ্ছে বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের তথ্য

default-image

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উপবৃত্তির জন্য কত শিক্ষার্থী নিষ্ক্রিয় হবে, সে তথ্য সংকলিত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির উপপরিচালক শ ম সাইফুল আলম। তিনি বলেন, উপবৃত্তির নীতিমালার মধ্য থেকে বাল্যবিবাহ হয়েছে, এমন শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। উপবৃত্তির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, ১৮ বছর বয়স অর্থাৎ অন্তত উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অবিবাহিত রাখা অর্থাৎ বাল্যবিবাহ রোধ এবং অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ রোধ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। বাল্যবিবাহের আইনগত ভিত্তি না থাকায় এবং এই বিয়েগুলো নিবন্ধিত না হওয়ায় করোনাকালে কত শতাংশ বাল্যবিবাহ হয়েছে, তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার উজ্জীবনী ইনস্টিটিউট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ ইকবাল আলম জানান, তাদের স্কুল থেকে বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের তালিকা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়টি থেকে জানা গেছে, ৩৫৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়ে ১৭৫ জন। ২০২১ সালে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত উপবৃত্তি পেত ১৫৩ জন। এবার এ তালিকা থেকে ১০ জনকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। ১০ জনই মেয়ে। সাতজন মেয়ে বাল্যবিবাহ করায় এবং তিনজন মেয়ে স্কুলে না আসায় (অন্যত্র চলে যেতে পারে বা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে পারে) উপবৃত্তির তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। তবে এদের কত শতাংশ বাল্যবিবাহের কারণে ঝরে পড়েছে সরকারিভাবে সে তথ্য নেই।

উপবৃত্তি বন্ধ করে আরও ঝুঁকিতে ফেলা হবে: শাহীন আনাম

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, কোভিডকালে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় স্কুলছাত্রীদের উপবৃত্তি বন্ধ করা উচিত না। এমজেএফের জরিপে দেখা গেছে, করোনাকালে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৭ মাসে ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৩ হাজার ৮৮৬ জন মেয়েশিশুর বাল্যবিবাহ হয়েছে। ৭৮ শতাংশ বিয়ে দিয়েছেন বাবা–মা। সরকারি পর্যায় থেকে অনেকে বলেন, বেশির ভাগ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নিজে নিজে বিয়ে করছে। কিন্তু বাস্তবে এ চিত্রের সত্যতা নেই। তিনি বলেন, বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েটি একদিকে ভুক্তভোগী, অন্যদিকে উপবৃত্তি বন্ধ হয়ে উল্টো সে শাস্তির মুখে পড়ছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েগুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিপক্বতা থাকে না। বাল্যবিবাহ চাপিয়ে দিয়ে মেয়েটির সব আশা–আকাঙ্ক্ষাকে চাপা দিয়ে সংসারে ঢুকে পড়তে বাধ্য করা হয়। কোভিডের সময় বাল্যবিবাহ হওয়া এই মেয়েদের উপবৃত্তি বন্ধ করে আরও ঝুঁকিতে ফেলার কোনো মানে নেই।

১৭ জানুয়ারির বৈঠকে উপবৃত্তির বিষয়টি তোলা হবে

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট বলছে, করোনাকালকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি চালু থাকবে কি থাকবে না, সেটা নিয়ে এ মাসেই আলোচনা করা হতে পারে। করোনাকালকে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে উপবৃত্তি নিয়ে আলোচনা করা হবে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসরীন আফরোজ। তিনি বলেন, ১৭ জানুয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে ট্রাস্টের সভায় বিষয়টি তোলা হবে। করোনাকালে যেসব বাল্যবিবাহ হয়েছে, সেসব বিয়ে বিবেচনায় নেওয়া, ওই মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি বা শিক্ষা অব্যাহত রাখা ইত্যাদি শর্ত জুড়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, তা আলোচনা করা হবে। তবে সিদ্ধান্তটি নিতে হলে উপবৃত্তির নিয়মনীতিতে বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে। এ বিষয়ে ট্রাস্ট এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।

সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির তথ্য অনুসারে, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে মাসে ২০০, অষ্টম শ্রেণিতে ২৫০, নবম ও দশম শ্রেণিতে ৩০০ এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ৪০০ টাকা করে উপবৃত্তি দেওয়া হয়।

২০২০–২১ অর্থবছরে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ৫২ লাখ ৫০ হাজার ৮৮২ জন শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছেলে ১৮ লাখ ৮৭ হাজার ৫২৫ এবং মেয়ে ৩৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩৫৭ জন।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন