default-image

রিকশাচালক সুমির গলায় সব সময় একটি গামছা থাকে। সেই গামছা দিয়ে সেদিন চোখ মুছছিলেন। ভাড়ার রিকশা চালাতেন। প্রতিদিন রিকশার মালিককে ২০০ টাকা জমা দিতে হতো। সেদিন মাত্র ৮০ টাকা ভাড়া পেয়েছিলেন। গত ২১ এপ্রিলের ঘটনা এটি। করোনা পরিস্থিতির কারণে রাস্তাঘাটে মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। রিকশার যাত্রী মেলেনি। তাই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন সুমি ক্রুজ। তাঁর চোখ মোছার ছবিসহ সেদিনই প্রথম আলো অনলাইনে ‘কেঁদে ফেললেন রিকশাচালক সুমি’ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদন নজরে পড়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের। পরদিনই সুমির কপালে জুটে যায় ৮০ হাজার টাকার একটি নতুন রিকশা। এখন প্রায়ই শহরের অলিগলিতে সুমির দেখা মেলে, গলায় গামছার বদলে দেখা যায় নতুন ওড়না। মুখটায় থাকে হাসি।

বিজ্ঞাপন
আমাকে আর অন্যের রিকশা চালাতে হবে না। ভাড়া না পেলে জমার টাকার জন্য কাঁদতে হবে না। আমার রাজশাহীতে আসার ১৫ বছরের জীবনে আজ একটা ইতিহাস হয়ে গেল।

সুমির বাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায়। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে রাজশাহী শহরে আসেন। সে–ও প্রায় ১৫ বছর আগে। সুমির ভাষ্য অনুযায়ী, এত দিন তিনি রাজশাহী শহরে আছেন, কিন্তু কেউ তাঁকে এই শহরের মানুষ মনে করে না। কারণ, তিনি এখনো বড়াইগ্রামের ভোটার। শহরের যেখানেই সাহায্য দেওয়া হয়, সেখানেই তিনি যান। গেলেই কথা ওঠে, তিনি বাইরের মানুষ। কোনো সাহায্য পান না।

২১ এপ্রিল দেখা হওয়ার সময় খুবই হতাশা প্রকাশ করে সুমি বলেছিলেন, ‘সারা দিন রিকশা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে খুব কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় মরেই যাব।’ জমার ২০০ টাকার ভাড়া না পাওয়ায় জন্য তিনি কাঁদছিলেন। বলছিলেন, ‘ঘরে চাল-ডালের ব্যবস্থা থাকলে আজ আর রিকশা নিয়ে বের হতাম না। নাতিটাকে গোসল করায়ে ঘুম পাড়াতাম’, বলতে বলতেই চোখে পানি চলে আসে তাঁর। কাঁধে রাখা গামছা দিয়ে চোখ মোছেন। করোনা পরিস্থিতির আগে রিকশার মালিককে দৈনিক ৩৫০ টাকা জমা দিতে হতো। করোনার কারণে কমিয়ে ২০০ টাকা করেছেন। সে টাকাও তোলা যাচ্ছিল না।

সুমির বয়স কত, তিনি জানেন না। বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই জন্ম বলে মায়ের কাছে শুনেছেন। বিয়ে হয়েছিল। দুটি ছেলে। তারপরই স্বামী মারা যান। এরপর সন্তানদের নিয়ে বাবার কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিছুদিন পর বাবাও মারা যান। আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন সুমি। কোনো উপায় না দেখে রাজশাহী শহরে চলে আসেন। নগরের পাঁঠার মোড়ের রেললাইনের পাশে পলিথিন টাঙিয়ে থাকতে শুরু করেন আর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ঝাড়ুদারের কাজ নেন। এভাবেই চলছিল। বড় ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ছেলে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত। কাজ করতে পারেন না। একটা নাতি হয়েছে। তার কথাও সুমিকেই ভাবতে হয়। পুরো সংসারের ভার সুমির কাঁধেই। সংসারের খরচ বেড়ে গেছে। তাই ঝাড়ুদারের কাজ ছেড়ে রিকশা চালানো শুরু করেছেন।

default-image

করোনাকালে প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন পড়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ফোন করেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের কাছে। সুমির জন্য প্রয়োজনীয় যা লাগে, তা করার জন্য বলেন তথ্যমন্ত্রী। সেদিন রাতেই ডাবলু সরকার এই প্রতিবেদককে ফোন করে খবরটি জানান।

এর পরদিন সুমিকে ফোন করে রাজশাহী নগরের কুমারপাড়া এলাকায় প্রথম আলোর রাজশাহী কার্যালয়ের সামনে আনা হয়। সেখানেই সেদিন দুপুরে ডাবলু সরকার একটি নতুন অটোরিকশার চাবি তুলে দেন সুমির হাতে। আর সংকটপূর্ণ সময়ে যাতে রিকশা চালাতে না হয়, এ জন্য তাঁকে নগদ ৫ হাজার টাকাও দেন।

তখন সুমি বলেন, ‘আমাকে আর অন্যের রিকশা চালাতে হবে না। ভাড়া না পেলে জমার টাকার জন্য কাঁদতে হবে না। আমার রাজশাহীতে আসার ১৫ বছরের জীবনে আজ একটা ইতিহাস হয়ে গেল।’

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী শহরের ভোটার না হওয়ার কারণে স্থানীয় কোনো সাহায্য পান না, এ খবর পেয়ে রাজশাহী নগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মতিউর রহমান সুমিকে খুঁজে বের করেন। তাঁকে তিনি ১৫ কেজি আটা, ৪ কেজি ডাল ও ৫ কেজি আলুর একটি প্যাকেট ধরিয়ে দেন। রাজশাহীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক রাতেই প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তিনি এ সময় রিকশাচালক সুমির দায়িত্ব নিতে চান। সকালে তিনি সুমিকে নগদ তিন হাজার টাকা, আপৎকালের জন্য প্রস্তুত চাল-ডালসহ শুকনা খাবারের প্যাকেট ও একটি মশারি দেন। আর এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যে রিকশা চালাতে বারণ করেন।

রিকশা নেওয়ার পর সুমি প্রথম আলোর রাজশাহী কার্যালয়ে দেখা করতে আসেন। সেখানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল্লাহ হীল বারীও আসেন। লকডাউনের সময় সুমির পরিবারের জন্য চাল, ডাল, তেল, লবণ, পেঁয়াজ কিনে দেন। এর আগেই রাজশাহীর বাইরে থেকে কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি সুমিকে সংকটের এ সময়ে খাবার কেনার জন্য কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। সুমি জানিয়েছেন, বিকাশে পাঠানো সেই টাকা তিনি পেয়েছেন। যাঁরা দিয়েছেন, তাঁদের পরিচয় সুমি ঠিকমতো বলতে পারেননি। তিনি লিখতেও পারেন না। তবে তিনি সবার জন্য দোয়া করেছেন বলে জানান। ২৫ এপ্রিল প্রথম আলোতে ছাপা হয় ‘তথ্যমন্ত্রীর ফোন, সুমিকে রিকশা দিলেন স্থানীয় আ. লীগ নেতা।’

কয়েক দিন পর সুমি ফোন করে জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন, সেই এলাকায় একজন মাস্তান থাকেন। তিনি বলেছেন, তাঁকে নতুন রিকশাটি দিয়ে দিতে হবে। তা ছাড়া সুমি ওই এলাকায় থাকতে পারবেন না। প্রথম আলো থেকে নগরের রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাদাত হোসেন খানকে বিষয়টি জানানো হয়। তিনি পুলিশ পাঠিয়ে ওই মাস্তানকে খুঁজে বের করেন। পুলিশ এক দিনের মধ্যে ওই মাস্তানকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন।

এখন দেখা হলেই সুমি হেসে ওঠেন। রিকশা থামিয়ে কথা বলেন।

একটি খবরে যখন দুর্দিনেও একজন মানুষের সামনে সুদিন আনে, তখন সেই খবরটি হয়ে ওঠে ভিন্ন।

মন্তব্য পড়ুন 0