default-image

ধরে নিন রাজধানীতে ও লেভেলপড়ুয়া ছাত্রী সেদিন হত্যার শিকার হয়নি। বন্ধু অথবা পূর্বপরিচিত তরুণের বাসায় বিকৃত যৌনাচারের শিকার হয়ে আহত অবস্থায় বাড়ি ফিরে গেছে। কী হতো তারপর?

মেয়েটির মা–বাবা দ্রুত তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন, মনে গভীর ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকত সে। কিন্তু নিপীড়ক ছেলেটি? তার কথা কি আমরা জানতে পারতাম। অবশ্যই না।

দেশের পারিবারিক সংস্কৃতির ধারা অনুসারে এমন ঘটনার পর ভুক্তভোগী মেয়েটি আর তার পরিবার বুকে পাথর চাপা দিয়ে ঘটনাগুলো ঢেকে রাখে। সেসবের হদিস আমরা পাই না। ফলে সহজেই অনুমেয়, কলাবাগানে যে ঘটনাটি ঘটল, সেখানে মেয়েটির মৃত্যু না হলে তরুণ সেই শিক্ষার্থীর ভয়াবহ চেহারাটাও অনেকের কাছে অচেনা থেকে যেত, নির্যাতনের শিকার হতো আরও অনেক মেয়ে।

কলাবাগানের ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, অন্ধ থাকলে প্রলয় বন্ধ থাকে না। স্বীকার করেই নিতে হবে এই অপ্রিয় সত্যটুকু, আমাদের অগোচরেই চারপাশে গড়ে উঠেছে এক অসুস্থ সমাজ, যেখানে নানা ধরনে নানা প্রক্রিয়ায় ঘটে চলেছে নির্যাতনের ঘটনা। পরিচিত, ঘনিষ্ঠ, বিশ্বাসী মানুষের অবিশ্বাস্য চেহারা দেখতে হয়েছে নির্যাতনের শিকার মেয়েটিকে। ঘটনাগুলো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা খোঁজ পাই না।

বিজ্ঞাপন

পরিবার ও সমাজ ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত না হলে কেবল আইনি বা পুলিশ পদক্ষেপের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা কঠিন বলে মনে করেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) সোহেল রানা। তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা আরও থাকতে পারে। এ মুহূর্তে আমার কাছে পরিসংখ্যান নেই। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ট্যাবু, পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবার বা ব্যক্তি আইনি ব্যবস্থা নেন না। তবে অভিযোগ পেলে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেয়।’

গোপনে পুষে রাখা যন্ত্রণা

গণমাধ্যমে প্রকাশ না পাওয়া এমনকি আইনের আশ্রয়ও না নেওয়া একটি ঘটনার কথা বলা যাক। গত বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এক মনোরোগ চিকিৎসকের কাছ থেকে ঘটনাটি শুনেছিলাম। কিশোরী মেয়েটি তার এক সহপাঠীকে পছন্দ করত। একসময় ছেলেটিও সম্মতি জানায়। তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ইন্টারনেটে কথাবার্তাই হতো বেশি। মেয়েটি তাকে ভালোবাসে সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ছেলেটি একদিন বেশ চাপাচাপি করেই মেয়েটিকে নগ্ন ভিডিও পাঠাতে রাজি করে। কিছুদিন পর মেয়েটি আবিষ্কার করে তার সেই ভিডিও ছেলেটির অন্য সব বন্ধুর হাতে হাতে।

মেয়েটি এতই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে যে তাকে নিয়ে তার পরিবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়। এখনো তার চিকিৎসা চলছে। তবে মেয়ের ‘সামাজিক মর্যাদা’ রক্ষায় পুরো ঘটনাটি সযতনে গোপন করে রেখেছে সেই পরিবার। কিশোরীর সেই বন্ধুর খবরটি আর জানা যায়নি। এত দিনে আর কোনো মেয়েকে ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে নগ্ন ভিডিও সংগ্রহ করেছে কি না বা বাড়ি ফাঁকা পেয়ে মেয়ে বন্ধুকে ডেকে এনে ধর্ষণ–নিপীড়ন করার মতো ‘সাহস’ সঞ্চয় করে ফেলেছে কি না।

ঠিক কী কারণে কিশোর–তরুণেরা বিকৃতি ও নিপীড়নের পথে পা বাড়ান এবং মেয়েরাও জড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে জানতে চাইলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমানের কাছে। তিনি বলেন, ‘কিশোর–কিশোরীর বেড়ে ওঠার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা অভিভাবক হিসেবে আমরা দিতে পারছি না। এ দেশে যৌনতা নিয়ে কথা বলার ব্যাপারে সামাজিক ট্যাবু রয়েছে। স্কুল পর্যায়ে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে যথাযথ শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় শিশুদের মধ্যে যৌনতা বিষয়ে নানা ধরনের ভাবনা কাজ করে। অভিভাবক বা শিক্ষকের কাছ থেকে জানতে না পেরে কিশোর-কিশোরীরা কৌতূহলের বিষয়গুলো নিয়ে নিজেরাই আলোচনা করে। এতে ভুল তথ্য আদান–প্রদানের ঝুঁকি তৈরি হয়। একদিকে অভিভাবকত্বে দুর্বলতা রয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক নজরদারি একেবারে কমে যাচ্ছে।’

নির্যাতন বহুমাত্রিক

গত বছর নারী ও শিশু নির্যাতনের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ভয়ংকর মাত্রায়। বছরের শুরুতে ৫ জানুয়ারি রাজধানীতে ঘটেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা। বছরের শেষ ছয় মাসে দুটি ঘটনায় দেশব্যাপী বিক্ষোভ হয়, আইনেও আসে পরিবর্তন। সিলেটে ২৫ সেপ্টেম্বর স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে বের হয়ে নববিবাহিত এক তরুণী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দুই সপ্তাহের বিক্ষোভের মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ১৩ অক্টোবর অধ্যাদেশ জারি হয়।

সাজা বাড়ানোর পর ধর্ষণের ঘটনা আরও বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা উঠে এসেছে প্রথম আলোর বিশ্লেষণে। প্রথম আলোয় ছাপা হওয়া ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাজা বাড়ানোর পর ১৪ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ১৮২ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তার আগের এক মাসে ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ১১৬।

বিজ্ঞাপন

গত ২১ অক্টোবর ভোরে অস্ত্র বের করে হুমকি দিয়ে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ এসেছে নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলায়। ২২ অক্টোবর এক তরুণী নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ করেন। বিয়ের কথা বলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলায়। ২৩ অক্টোবর মামলা করেন তরুণী। এসব ঘটনা খবর হয়ে এসেছে গণমাধ্যমে। তিনটি ধর্ষণের ঘটনায় যে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা তিনজনেরই রাজনৈতিক পরিচিতি ও ক্ষমতা রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ২০ হাজার ৭১৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬ হাজার ৯০০ জন নারী। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১২ মাসে নির্যাতনের শিকার হন ২১ হাজার ৭৬৯ জন নারী ও শিশু। ধর্ষণের শিকার হন ৬ হাজার ৭০০।

শুধু ঢাকা মহানগর এলাকায় ২০২০ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২৭টি। এর মধ্যে ৩৯২টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। মোট নির্যাতনের মধ্যে ধর্ষণ ৫১৬, অ্যাসিড নিক্ষেপ ২টি, নির্যাতনে আহত হওয়ার ঘটনা ১৪টি। হত্যাসহ অন্যান্য নির্যাতন ১ হাজার ১০৩টি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক (কর্মসূচি) নিনা গোস্বামী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন এত ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে যে বিশ্বাসের জায়গাগুলো নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। একটি মেয়েকে একা পেলে বলপ্রয়োগ করার ঘটনা ঘটছে। নির্যাতনের অনেক অনেক ঘটনা চেপে রাখা হয়। ওই স্কুলছাত্রী যদি বেঁচে থাকত, তাহলে মেয়েটি তার ওপর ঘটে যাওয়া নিপীড়ন পরিবারের কাছে বলতে সাহস পেত কি না বা পরিবার আইনের আশ্রয় নিত কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। একই সঙ্গে ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতাও সহিংসতা বাড়িয়ে তুলছে।’

১৩ জানুয়ারির আরেকটি ঘটনাও ধাক্কা দিল মনোজগতে। ঘটনার এলাকা সেই কলাবাগান। একটি আবাসিক ভবনের পঞ্চাশোর্ধ্ব এক দারোয়ান ধর্ষণ করে সেখানকার এক বাসার গৃহকর্মী কিশোরীকে। সে ছাদে কাপড় শুকাতে দিতে গিয়েছিল। ধর্ষণের পর কিশোরী বাসার বাথরুমে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। দারোয়ানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব অভিযোগ স্বীকারও করেছেন। (সূত্র: প্রথম আলো ১৫ জানুয়ারি ২০২১)।

এই কিশোরীকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে বাবার বয়সী, একই দালানের দারোয়ানের হাতে। কেউই কারও অপরিচিত নয়। আবার ও লেভেল পড়ুয়া ছাত্রীও পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে জেনে গেছে ‘বন্ধু’–ই তার হন্তারক। ছাত্রী বা গৃহকর্মী—শ্রেণিগত অবস্থান যা–ই হোক, তাদের মর্মান্তিক এই পরিণতির কারণ কিন্তু একটাই। তারা দুজনই নারী।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন