default-image

রাজধানীর কালাচাঁদপুরে একটি ছোট বিউটি পারলারের স্বত্বাধিকারী মনিকা। গত বছরের মার্চের শেষ দিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে লকডাউন শুরুর পর পারলারটি বন্ধ হয়। লকডাউনের শেষে পারলার খোলেন তিনি। তবে ঋণ করা ছাড়া আর উপায় ছিল না। দুটি বেসরকারি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ হাজার করে ১ লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছে। ঋণ নেওয়ার পরের মাস থেকে কিস্তি শুরু হয়। পারলারে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত আয় আশানুরূপ হয়েছিল। এরপর চলতি বছরের শুরুর দিক থেকে আবার আগের অবস্থা। মনিকার স্বামী এক পরিবারের ব্যক্তিগত গাড়ির চালক। লকডাউন শুরুর দুই মাসে মালিক বেতন দিয়েছিলেন। এরপর আর দেননি। স্কুল শুরু হলে আবার কাজে রাখবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। স্বামীর চাকরি নেই। এদিকে ঋণের টাকাও শোধ হয়নি মনিকার। পারলার থেকে আয় নেই বললেই চলে।

মনিকা বলছিলেন, ‘জীবনে এমন অবস্থায় কখনো পড়িনি। মনে হয় এখন খাদে পড়ে গেছি।’

ময়মনসিংহের ফুলপুরের বাসিন্দা রেখা রেমা (ছদ্মনাম) রাজধানীর একটি পারলারের বিউটিশিয়ান ছিলেন। বেতন পেতেন মাসে ১৬ হাজার টাকা। লকডাউন শুরুর পর বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন। লকডাউনের পর পারলার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা আসতে বলে। কিন্তু জানিয়ে দেয়, বেতন হবে অর্ধেক অর্থাৎ ৮ হাজার টাকা। এখন রেখার কোলে চার মাসের শিশু। এ বেতনে ঢাকায় চলা আর সম্ভব নয়। তাই আর ঢাকায় ফেরা হয়নি গারো জাতিগোষ্ঠীর এই নারীর।

বেসরকারি সংগঠন ইনডিজেনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস (আইপিডিএস) রাজধানীর বিউটি পারলার কর্মী গারো নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি সঞ্জীব দ্রং তাঁদের এক গবেষণার সূত্র ধরে বলেন, ‘রাজধানীর একটি নামী বিউটি পারলারে প্রায় ৩০০ নারী কর্মী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ৬০ জন ফেরত আসতে পেরেছেন। যাঁরা কাজ করছেন, সবাইকেই অর্ধেক কিংবা আংশিক বেতন দেওয়া হচ্ছে। আর এটা সবাই মেনেও নিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা পায়নি বিউটি পারলারে কাজ করা নারীরা।’

বিজ্ঞাপন

বিউটি পারলার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের একটি অংশ। গত বছরের অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আর মনিকা ও রেখার মতো লাখো নারী এর ভুক্তভোগী হয়েছেন। আর করোনার লকডাউন উঠে অনেক খাত ঘুরে দাঁড়ালেও বিকল্প কাজ পেতেও ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন নারীরা।

বেসরকারি সংগঠন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) গত বছরের এপ্রিল মাসে আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর একটি জরিপ করে। এরপর সর্বশেষ ২০ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত আবারও জরিপ চালায় দুটি প্রতিষ্ঠান। এতে অংশ নেয় ৭ হাজার ৬৩৮ পরিবার।

গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা এবং অন্যান্য শহরের ৫৪ শতাংশের বেশি নারী গৃহকর্মী বেকার হয়ে পড়েছেন। কাজ হারানো এসব নারীর মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ বিকল্প পেশায় নিযুক্ত হতে পেরেছেন। গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু গৃহকর্মী নন; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষিজীবী নারী, অদক্ষ শ্রমিক, দক্ষ শ্রমিক, বেতনভুক্ত চাকরিজীবী—চাকরি হারানোর তালিকায় সব পেশার নারীই আছেন।

দেখা গেছে, অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা খাতে পুরুষের তুলনায় নারীর কাজ হারানোর হার বেশি। যেমন পুরুষ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে কাজ হারিয়েছেন প্রায় ১৬ শতাংশ। কিন্তু এখানে নারীরা কাজ হারিয়েছেন ৩৫ শতাংশের বেশি। প্রায় ২০ শতাংশ অদক্ষ পুরুষ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন, নারীর কাজ হারানোর হার প্রায় ৩১ শতাংশ।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান গত শনিবার প্রথম আলোকে জানান, গবেষণার তৃতীয় ধাপের কাজ এখন চলছে। তিনি বলেন, ‘দেখা গেছে, অপ্রাতিষ্ঠানিক সেবা খাতে এখনো পুরোদমে কাজ শুরু হয়নি। বিউটি পারলার এর একটি উদাহরণ। আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা সরকারের প্রণোদনা সহায়তা সবচেয়ে কম পেয়েছে।’

বাল্যবিবাহ বেড়েছে

করোনাকালে অর্থনীতি হয়েছে বিধ্বস্ত। বিপর্যস্ত হয়েছে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ। আর এর অনিবার্য প্রভাবে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধির প্রসার ঘটেছে।

গত ১১ মার্চ বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) এক গবেষণায় বলা হয়, ২০২০ সালে করোনার সাত মাসে দেশের ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। ‘বাল্যবিয়ের অবস্থা দ্রুত বিশ্লেষণ: করোনাকাল ২০২০’ শীর্ষক এক জরিপটিতে বলা হয়েছে, করোনাকালে নিম্ন আয়ের মানুষ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল আয় হারানো, ক্ষুদ্র ব্যবসা ধ্বংস ইত্যাদি। করোনাকালে দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও পরিবারের সদস্যদের মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা করতে না–পারা বাল্যবিবাহের বড় কারণ হিসেবে বর্ণনা করে ৩০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। করোনাকালে বাল্যবিবাহের অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে আয় হারিয়ে দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিদ্যমান সামাজিক নিয়ম-বিশ্বাস, স্কুল বন্ধ, বাল্যবিবাহের মাধ্যমে অভিভাবকদের কিছু সুবিধা পাওয়ার আশা, কম পরিমাণ যৌতুক দেওয়ার সম্ভাবনা।

নির্যাতন থেমে নেই

বাল্যবিবাহের মতো সমস্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি করোনাকালে বেড়েছে নারী নির্যাতনও। বিশ্বের যেসব দেশে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারী নির্যাতনের হার বেশি, সেসব দেশের তালিকায় সম্প্রতি এসেছে বাংলাদেশের নাম। দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫০ শতাংশই জীবনে কখনো না কখনো সঙ্গীর হাতে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশ্বের ১৬১টি দেশ ও অঞ্চলে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নারী নির্যাতনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আলাদাভাবে করোনা মহামারির মধ্যে সর্বশেষ ১২ মাসে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারীর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ তালিকায়ও ১৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। করোনাকালে দেশে ২৩ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

নারীস্বাস্থ্য

করোনাকালে দেশে জনসংখ্যার হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে বেড়ে গেছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় গত বছর প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার অতিরিক্ত শিশু জন্ম নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘ শিশু তহবিলও দেশে জন্মহার বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। আবার এ সময় নারীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যাও নাজুক হয়ে ওঠে। এর প্রভাব একটা সময় ধরে নারীদেরই ভোগ করতে হবে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এমনটাই মনে করেন।

বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে বড়ি বা পিল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। সামগ্রী ব্যবহারের অর্ধেকই পিল। বাকি অর্ধেকের মধ্যে আছে ইনজেকশন, কনডম, নারী ও পুরুষের বন্ধ্যাকরণ, ইমপ্লান্ট ইত্যাদি। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিল–মে মাসে পিল ও কনডমের ব্যবহার কমে যায় প্রায় ৩০ শতাংশ। স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণের পরিমাণও কমে যায় ব্যাপকভাবে। যেমন জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে গড়ে প্রায় তিন হাজার ভ্যাসেকটমি (পুরুষের বন্ধ্যাকরণ) হলেও এপ্রিল মাসে এ সংখ্যা ছিল ২৬৩ এবং মে মাসে ১২১। নারী বন্ধ্যাকরণ বা কিউবেকটমির সংখ্যা জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ছয় হাজারের ওপরে হলেও এপ্রিলে এর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮০০ আর মে মাসে এ সংখ্যা ২ হাজার ৬০০।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনসংখ্যা গবেষণা প্রতিষ্ঠান পপুলেশন কাউন্সিলের দেশীয় পরিচালক ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ ওবায়দুর রব বলেন, ‘কোভিডের কারণে আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনা বাড়তে পারে। তবে তা কতটা বেড়েছে, এর কোনো হিসাব এখনো পাইনি।’

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনউইমেনের গত বছরের জুন মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ নারী তাঁদের স্বাস্থ্য পরিচর্যার সামগ্রীর অপ্রতুলতার কথা বলেছেন, বিশেষ করে নারীপ্রধান পরিবারের কাছে এ সমস্যা প্রকট। ‘কোভিড-১৯ বাংলাদেশ: র‍্যাপিড জেন্ডার অ্যানালিসিস’ শিরোনামে ওই গবেষণাটি ছিল জেন্ডার ইন হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ নামের একটি জোটের উদ্যোগ।

নিম্ন বা স্বল্প আয়ের নারীরা কীভাবে তাঁদের মাসিককালীন ব্যবস্থাপনা করছেন, তা জানতে গত বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশ একটি গুণগত গবেষণা করে। তাতে দেখা যায়, নিম্ন আয়ের নারীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যার ক্ষেত্রে করোনার প্রভাব প্রকট।

অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগম গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনাকালে গর্ভপাতের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। বেড়েছে ঘরে সন্তান জন্ম দেওয়ার হার। এসবের প্রভাব নারীস্বাস্থ্যের ওপর পড়বে। মাসিককালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যার ক্ষেত্রে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল, এরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আছে। তবে তা কতটা পড়েছে, তা বলার মতো পর্যাপ্ত গবেষণা আমাদের হাতে নেই।’

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন