default-image

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে লালমনিরহাটে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন রাশেদা খাতুন। কে জানত, সেই শেখাটাই একদিন এমন কাজে দেবে, তা–ও আবার করোনার দুঃসময়ে।

রাশেদা খাতুনের বাড়ি লালমনিরহাট জেলা সদরে। শহরের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়ার চাকরি করতেন। গত বছরের মার্চ মাসে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। চাকরি হারিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান ৩৬ বছর বয়সী রাশেদা খাতুন। ইরাকপ্রবাসী স্বামী ফারুক হোসেন তাঁর স্ত্রী রাশেদার কোনো খোঁজখবর রাখেন না বলেই চাকরিটা ছিল রোজগারের একমাত্র পথ।

চাকরি হারানোর পর ভাবলেন সেলাইয়ের শিক্ষা কাজে লাগাতে। কীভাবে? রাশেদা খাতুন বলেন, ‘সেই সময় মাস্কের চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নিলাম, কাপড়ের মাস্ক বানিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করব।’

বিজ্ঞাপন

কিন্তু রাশেদার কোনো সঞ্চয় ছিল না। সে বিপত্তিও ঘুচল এক স্কুলবন্ধুর মাধ্যমে। বন্ধুর কাছ থেকে ২০০ টাকা ধার নিলেন। স্থানীয় বাজার থেকে পাঁচ গজ কাপড় কিনলেন। সেই কাপড়ে শুরু হলো মাস্ক তৈরি। স্থানীয় বাজারে সেসব মাস্ক বিক্রি করতে শুরু করলেন।

এমনই একদিন মাস্ক বিক্রি করতে গিয়ে লালমনিরহাটে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরে আসেন তিনি। এরপর রাশেদা খাতুনের তৈরি মাস্কের নিয়মিত ক্রেতা লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন। রাশেদাকেও মাস্ক বিক্রি নিয়ে আর ভাবতে হয়নি। গত ১০ মাসে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন ১৭ হাজার ৫০০ মাস্ক কিনেছে রাশেদার কাছ থেকে। প্রতিটি মাস্ক ১৫ টাকা হিসাবে নগদ টাকায় কিনে নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছে প্রশাসন।

রাশেদা খাতুন জানালেন, আরও আড়াই কি তিন হাজার মাস্ক লালমনিরহাটের বিভিন্ন হাট-বাজার ও বিপণিবিতানে একই মূল্যে বিক্রি করেছেন। তাতেই ভাগ্য ফিরেছে রাশেদার। করোনায় চাকরি হারানো রাশেদা এখন লাখপতি।

মাস্ক বিক্রির আয় থেকে ২৬ হাজার টাকা দিয়ে দুটি নতুন সেলাই মেশিন কিনেছি। মাকে (খোতেজা বেগম) ১২ হাজার টাকা দিয়ে একটি মুদিদোকান করে দিয়েছেন। রাশেদা খাতুন বলেন, ‘জীবন বীমা করপোরেশনে আমার নামে পলিসি খুলে ৭২ হাজার টাকা সেখানে জমা করেছি। এ ছাড়া মাস্ক তৈরি করার জন্য বর্তমানে আমার ঘরে ৫০ হাজার টাকার কাপড় জমা রয়েছে। স্বামী ইরাকে যাওয়ার সময় ঋণ করা টাকার কিছু পরিশোধ করেছি আয় থেকে।’

default-image

রাশেদা খাতুনের উদ্যোগ নিয়ে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর বলেন, ‘রাশেদার কাছে থেকে কর্মহীন মানুষের অনেক কিছু শেখার আছে। তাঁর উদ্যোগে সহায়তা করতে পেরে আমরাও খুশি।’

২০০২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের ধাইরখাতা গ্রামের ফারুক হোসেনের সঙ্গে রাশেদা খাতুনের বিয়ে হয়। রাশেদাদের বাড়ির আর্থিক সহায়তায় ফারুক হোসেন পাঁচ বছর আগে ইরাকে যান। প্রথম দিকে তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানের খোঁজখবর রাখলেও সাড়ে তিন বছর ধরে কোনো খোঁজ নেন না বলে জানালেন রাশেদা।

রাশেদা এখন লালমনিরহাট শহরের নবীনগরে বাবার বাড়িতে দুই সন্তান নিয়ে থাকেন। তাঁর বড় ছেলে রৌফুজ্জামান লালমনিরহাট সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পড়ে, ছোট ছেলে রমিত হাসান ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

বাবার বাড়িতেই মাস্ক তৈরির কাজ করেন রাশেদা। তাঁর কাজে সহায়তা করেন স্কুলছাত্রী আশা মণি, অঞ্জু আরাসহ আরও কয়েকজন। প্রতিটি মাস্ক তিন টাকা দরে তৈরি করে দেয় তারা। করোনাকালে কাজের সুযোগ পেয়ে আনন্দিত এই কর্মীরাও। আর রাশেদা বলছিলেন, ‘আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি। পেছনে ফিরে দেখতে চাই না।’ সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করতে চান, এটাই এখন স্বপ্ন রাশেদা খাতুনের।

বিজ্ঞাপন
নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন