বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করতে তাঁদের বা তাঁদের পরিবারের নারী সদস্যদের চরিত্র নিয়ে নোংরা মন্তব্য করাটা নতুন কিছু নয় এবং এ চর্চা এককভাবে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের লোকেরা করেন না। এ চর্চা নিজের ঘর থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, বাজার, গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চাকরিস্থল, কোথায় নেই? এমন নারী অবমাননাকর কথা তো আমাদের অনেককে নিয়মিত শুনতে হয়েছে। আমাদের চরিত্র নিয়ে, আমাদের নিয়ে এমন ব্যবচ্ছেদ প্রতিনিয়ত হচ্ছে। এ দেশের নারীরা কৈশোর থেকেই এমন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আসছে। তবে সংবিধানের ওপর শপথ নেওয়া, জনগণের করের টাকায় বেতন-ভাতায় পুষ্ট, মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্য যখন ওই একই মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি এমন দাপটের সঙ্গে প্রকাশ করেন, তখন তা কেবল অপমানকরই নয়, গর্হিত অপরাধও বটে।

এ নাটকের দ্বিতীয় খণ্ডে ফোনালাপ ফাঁস ষড়যন্ত্রের আভাস দেয় এবং তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব আইন প্রয়োগ ও অপরাধ দমন কর্তৃপক্ষের। ফোনালাপ ফাঁসও অপরাধ, কে বা কারা ফোনালাপ ফাঁস করেছে, তা–ও তদন্ত করা উচিত এবং তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত। তাঁর ফাঁস হওয়া অডিও শুনে আমরা মুহূর্তের জন্য ধাক্কা খেয়েছি বৈকি। কারণ, এমন নগ্ন ক্ষমতার অপব্যবহার সচরাচর জনপরিসরে প্রকাশ পায় না। রাষ্ট্রীয় সব গোয়েন্দা সংস্থার নাম করে মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্য ধর্ষণের হুমকি দিতে পারে, তা নিশ্চয় হতবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। মন্ত্রিপরিষদ শুধু নয়, আমাদের দেশের পুরুষ আধিপত্যের একটা বৈশিষ্ট্য হলো নারীকে ছোট করে দেখা, যথেচ্ছ ব্যবহারের বস্তু ভাবা, তার ওপর নির্যাতন–নিপীড়ন করা। এই মানসিকতা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে গ্রথিত, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের মজ্জাগত।

রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একজন নারী কটূক্তির শিকার হবেন, এটাই তো এ সমাজের স্বাভাবিক চিত্র। রাস্তার দোকানদার, রিকশাওয়ালা, অফিসের সহকর্মী, বাসের চালক-হেলপার কে না? কৈশোর থেকেই ঘরে-বাইরে এমন যন্ত্রণার শিকার হন নারী। প্রায় প্রত্যেক শিক্ষিত-অশিক্ষিত পুরুষের মনের ভেতরে নারী নিয়ে এমনই ভাবনা; কারওটা প্রকাশ পায়, কারওটা অন্তরালে থেকে যায়। কিন্তু নারীকে হেনস্তার শিকার হতে হয় প্রতিমুহূর্তে। কেউ প্রতিবাদ করেন, কেউবা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কারণে প্রতিবাদ থেকে পিছিয়ে আসেন।

দেশের জনগণ নানা অনাচার–অত্যাচারের প্রতিবাদ করে ক্লান্ত, প্রতিবাদ শুনবার কেউ নেই। তাঁরা বুঝে গেছেন যে ন্যায়বিচার পাওয়াটা এখন অনেক দুরূহ ব্যাপার। সবকিছুরই রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। আমরা পার্থিব উন্নয়নের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছি। আমাদের মেধা–মননের যে উন্নয়ন দরকার, সেটি নিয়ে ভাবছি না। এই না ভাবনার ফলে মানসিক রুচির এমন নেতিবাচক রূপটা সামনে এসে দাঁড়ায়।

নারীকে সহিংসতার শিকারের পাশাপাশি এমন চরিত্রহনন, কটূক্তি নিয়েই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয়। এত বাজে কটূক্তির জন্য আমাদের মেয়েদের মানসিক আঘাত বা ট্রমা বইতে হয়। কত দিন এ ট্রমা আমরা টেনে নিয়ে যাব? নিভৃতে বয়ে বেড়াব? আমাদের রুখে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আমরা প্রতিবাদ করলে, রুখে দাঁড়ালে পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা কিছুটা হলেও স্বস্তির পথ চলতে পারবে।

আমার পরামর্শ হলো কোনোভাবেই চুপ থাকা চলবে না। কোনো ধরনের উত্ত্যক্তের শিকার হলে সংকোচ না করে চেঁচিয়ে উঠতে হবে। প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। আইনের আশ্রয় নেওয়া মানে হচ্ছে এ ধরনের ঘটনার আইনি প্রতিকার চাওয়া। যখনই কেউ এমন পরিস্থিতির শিকার হবেন, নিকটতম থানায় গিয়ে পুলিশকে বাধ্য করবেন অভিযোগ গ্রহণ করতে। আমাদের সমাজে অনেকেই মনে করে, একটা বাজে মন্তব্যে কী আসে যায়, একটু গায়ে হাত দিলে কী এমন ক্ষতি হয়। সারা দেশে এক দিনে ঘটে যাওয়া এ ধরনের ঘটনার অভিযোগ করা হলে এ সমস্যার ব্যাপ্তি ও পুনরাবৃত্তির হার সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যেত। তাতে কিছুটা হলেও নীতিনির্ধারকদের টনক নড়ত। কয়েকজন মুরাদকে খরচ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এ সংস্কৃতি, মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে চাই দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী পদক্ষেপ।

লেখক: নারী আন্দোলনকর্মী ও ‘নারীপক্ষ’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন