default-image

অভাব–অনটনের সংসারে বয়স না হতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় খালেদা বেগমকে। নানা কারণে সেই সংসার ভেঙে যায়। এরই মধ্যে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। উপায় না পেয়ে চলে আসেন বাবার বাড়িতে। কিন্তু কী করবেন, তা নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। হতে হবে স্বাবলম্বী। বেছে নিলেন কাপড়ে নকশা তোলার কাজ। নিজে শিখলেন। নিজের ও পাশের গ্রামের নারীদের বিনা মূল্যে শেখালেন। তাঁদের দক্ষ করে তুললেন। দুই গ্রামের প্রায় ৭০০ নারী খালেদার হাত ধরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের লহণী গ্রামের খালেদা বেগম (৪০) অক্লান্ত পরিশ্রম ও বিনা পয়সায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। মা–বাবার পরিবারে অভাব–অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। তিন ভাইবোন। এর মধ্যে খালেদা বড়। বাবা আবদুল হামিদ। পেশায় কাঠমিস্ত্রি। বসতভিটা ছাড়া কোনো জমিজমা নেই যে ফসল ফলাবেন। এক বেলা ভাত জুটলে অন্য বেলায় উপোস থাকতে হতো। এমন এক অবস্থায় বাবা মেয়েকে পাত্রস্থ করতে উঠেপড়ে লাগলেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৩ বছর বয়সে বাল্যবিবাহ হয়ে যায় পাশের গ্রামের এক ছেলের সঙ্গে। সালটা ১৯৯৩। বিয়ের তিন বছরের মধ্যে ১৯৯৬ সালে সংসারে মেয়েসন্তান জন্ম নেয়। সন্তানের বয়স যখন চার বছর, ঠিক এমন সময় বিবাহবিচ্ছেদ হয়। উপায় না পেয়ে সন্তানকে নিয়ে শূন্য হাতে ফিরে আসেন খালেদা বাবার বাড়িতে।

বিজ্ঞাপন

বাবার সংসারে যখন ফিরে এলেন খালেদা, বাবা তখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত। সেই সঙ্গে ছোট দুই ভাই। এমন এক পরিস্থিতিতে ২০০০ সালে খালেদা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। পায়রাবন্দে রংপুর জেলা পরিষদের আয়োজনে এক বছরের জন্য সেলাই প্রশিক্ষণে অংশ নেন। কাপড়ে নকশা করার কাজ শেখেন সেখানেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, খালেদার বাড়ির উঠানে মাদুর, চট ও কাপড় বিছিয়ে প্রায় ২০ জন নারী কাপড়ে নকশার কাজ শিখছেন। কেউ শাড়িতে, কেউ থ্রি–পিসে, আবার কেউবা বালিশের কভারে নকশা করার কাজে ব্যস্ত।

কাপড়ে নকশার কাজ করতে করতে গৃহবধূ ফাতেমা বেগম বলেন, ‘হামরা এটে বিভিন্ন কাপড়োত সেলাইয়ের কাজ করি। সেলাই করার জন্য আপা (খালেদা) মজুরি দেয়। এই টাকা হামার সংসারোত অনেক কাজে লাগে।’

আর দুলালী বেগম বললেন, ‘এই লহণী গ্রামোত কয়েক শ নারী সেলাইয়ের কাজ করে। আপা এই কাজ শেখানোর জন্য কোনো টাকা নেয় না।’

মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের লহণী ও জয়রামপুরের আনোয়ার গ্রাম দুটিতে প্রায় দুই হাজার পরিবারের বাস। গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই নারীরা কাপড়ে সেলাইয়ের কাজ করেন। নারীরা জানালেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে কাপড়ে নকশার অর্ডার পাওয়া যায়।

লহণী গ্রামের রুবি বেগমের অভাব–অনটনের সংসার। তিনি বলেন, ‘হামরা খালেদা আপার কাছোত শাড়ি, থ্রি–পিচ, টু–পিচ, বালিশের কভারে সেলাই করে নকশা করার কাজ শিখছি। বিনা পয়সায় আপা হামার গ্রামের নারীদের কাজ শিখাইছে।’

মল্লিকা বেগম নামের এক গৃহবধূর অভাব–অনটনের সংসারে আয়ের পথ জুগিয়েছে কাপড়ে নকশার কারুকাজ। সাত-আট বছর ধরে সেলাইয়ের কাজ করছেন তিনি।

খালেদার এমন কর্মকাণ্ড দেখে পায়রাবন্দের বেগম রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি খালেদা বেগমের কষ্ট দেখেছি। সেই জায়গা থেকে তাঁর যে উঠে আসার সংগ্রাম, এই সংগ্রাম নিঃসন্দেহে গ্রামের অন্য নারীদেরও অনুপ্রাণিত করেছে।’

পায়রাবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ফয়জার রহমান বলেন, ‘ওই দুই গ্রামে নারীদের কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে খালেদা অন্যতম ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।’

খালেদার শুরুটা ছিল একদম শূন্য হাতে। তাই তিনি বললেন, ‘আর্থিক দৈন্যের কথা ভেবে গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি গ্রামের নারীরা যেন স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে, এমন চিন্তা থেকে কয়েক বছর ধরে বিনা মূল্যে তাঁদের সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি।’

বিজ্ঞাপন
নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন