মাঠ প্রশাসনে নারী

ঝুঁকি নিয়েও এগোচ্ছেন নারীরা

মাঠপর্যায়ে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়লেও শঙ্কা দূর হয়নি। ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার পর নারী কর্মকর্তাদের শঙ্কা বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

পূরবী গোলদার ফরিদপুর জেলার সদরপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও উপজেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভাপতি হিসেবে শান্তি-শৃঙ্খলার কাজে যেতে হয় উপজেলার নানা জায়গায়। কখনো কখনো অবৈধভাবে ইলিশ মাছ ধরা বন্ধে রাতবিরাতে ছুটতে হয় নদীতে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করা, অবৈধ উচ্ছেদসহ করতে হয় আরও নানাবিধ কাজ। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপজেলার সরকারি কাজের সমন্বয়কারী হিসেবেও কাজ করতে হয় তাঁকে।

পূরবী গোলদার প্রথম আলোকে বললেন, ঝুঁকি নিয়েই ইউএনওদের কাজ করতে হয়। তবে নারী হিসেবে বাড়তি কিছু চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি থাকে। স্বাস্থ্যগত ও মানসিক ঝুঁকি তো আছেই; পরিবারের নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হয়। কখনো কখনো রাতের বেলায় কোনো অভিযান চালাতে গেলে কিছু অসুবিধায় পড়তে হয়। আবার সমাজব্যবস্থায় এখনো নারীবিদ্বেষী কিছু মানুষও আছে। এসবও মোকাবিলা করতে হয়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের বিরাগভাজনও হতে হয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৩০তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের পূরবী বলেন, নারীদের কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। নারী হওয়ায় মেয়ে বা বোন হিসেবে সহজেই অসহায় মানুষ নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারেন। তাতে কাজগুলো সহজে সমাধানও হয়। নারীরা দায়িত্ব পালনেও অধিক যত্নবান। সব মিলিয়ে ঝুঁকি থাকলেও নারী কর্মকর্তারা কিন্তু মাঠ প্রশাসনে খুব ভালো করছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিসিএস ক্যাডারের নারী কর্মকর্তাদের সংগঠন বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের হিসাব অনুযায়ী, পূরবী গোলদারের মতো সারা দেশে ৪৯২টি উপজেলার মধ্যে এখন ১৪৫ জন নারী কর্মকর্তা ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে পদায়নের জন্য অপেক্ষায় থাকা (ইউএনও হিসেবে ন্যস্ত) কর্মকর্তা মিলিয়ে এই সংখ্যা ১৭০।

২ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তাঁর বাবা ওমর আলীর ওপর হামলা করে দুর্বৃত্তরা। সরকারি বাসায় ঢুকে এই হামলার ঘটনার পর মাঠপর্যায়ে নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ ঘটনার পর সরকার প্রতিটি উপজেলায় ইউএনওদের নিরাপত্তায় চারজন করে আনসার নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ইতিমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের সদস্যরা গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, যখন নারী কর্মকর্তারা নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট, তখন একজন নারী ইউএনওর ওপর হামলা নারী কর্মকর্তাদের শঙ্কিত করে তুলছে। নারী কর্মকর্তারা সব সময়ই অনিরাপদ পরিবেশে স্বাস্থ্য ও মানসিক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। কর্মক্ষেত্রে অনেক দুর্ঘটনা, বিড়ম্বনা ও বিব্রতকর অবস্থায় তাঁদের পড়তে হয়।

সরকারি তথ্য বলছে, প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে মাঠপর্যায়ে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৪৫ জন ইউএনও ছাড়াও বর্তমানে ৬৪ জেলার মধ্যে সাতজন জেলা প্রশাসক (ডিসি), ৩৮ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) এবং ১৭৩ জন সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে নারী কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া সরকারের ৭৬ জন সচিবের মধ্যে ১০ জন সচিব নারী।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রায় তিন বছর আগে ২০১৭ সালে দেশে ১০৬ জন নারী ইউএনও ছিলেন। তখন ছয়জন ডিসি এবং ১৬ জন এডিসি ছিলেন নারী।

প্রশাসন ক্যাডার ছাড়াও অন্যান্য ক্যাডারেও মাঠপর্যায়ে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে চারজন পুলিশ সুপার, একজন সিভিল সার্জন, ৬০ জন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, ৫২ জন অধ্যক্ষ এবং ২৩ জন প্রকৌশলী মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন।

নারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের প্রায়ই নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। কিছুদিন আগে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীরা ফৌজদারি মামলা করেন। শুধু তা–ই নয়, অসংলগ্ন কথাবার্তায় ভরপুর ছিল ওই মামলার আরজি। এ নিয়ে বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্ক ছাড়াও বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন কয়েক দিন আগে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
 ডিসি ৭, এডিসি ৩৮  ইউএনও ১৪৫, এসি ল্যান্ড ১৭৩  পুলিশ সুপার ৪, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ৬০ জন, অধ্যক্ষ ৫২ জন, প্রকৌশলী ২৩ জন সূত্র: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্ক
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মাঠ প্রশাসনে নারী কর্মকর্তাদের কাজের ঝুঁকির কথা কিছুটা বোঝা গেল কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সহকারী কমিশনার (ভূমি-এসি ল্যান্ড) হিমাদ্রী খীসার সঙ্গে কথা বলে। তিনি বলেন, এসি ল্যান্ড হিসেবে সাধারণত খাসজমি উদ্ধার, অবৈধ উচ্ছেদ, ভূমি সমস্যাসংক্রান্ত শুনানি করতে হয়। তবে এখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় বাড়তি ঝুঁকি থাকে। কারণ, ভৈরবে হাইওয়ে থাকায় কখনো কখনো পরিবহনেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হয়, মাদকের বিরুদ্ধেও অভিযান চালাতে হয়। আবার এই করোনাকালে লাশ দাফন থেকে শুরু করে প্রবাসী বা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা লোকদের কোয়ারেন্টিনে রাখার কাজও করতে হয়েছে তাঁকে। এসব কাজ করতে করতে নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।

তবে হিমাদ্রী খীসা বললেন, এই চাকরিতে নারী হিসেবে আলাদা করে ভাবার সুযোগ নেই। জানালেন, ভৈরবে ইউএনও হিসেবে আছেন আরেকজন নারী কর্মকর্তা (লুবনা ফারজানা)।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২৭টি বিসিএস ক্যাডারের নারী কর্মকর্তাদের কল্যাণে ২০১০ সালে গঠিত হয়েছে বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্ক। সংগঠনটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব সায়লা ফারজানা, যিনি নিজেও মাঠ প্রশাসনে কাজ করেছেন। ছিলেন মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রথমত, সমস্ত মাঠ প্রশাসনেই ঝুঁকি আছে। কিন্তু নানা কারণে নারী হিসেবে বাড়তি কিছু ঝুঁকি আছে। সমাজ অনেক এগিয়েছে। তারপরও সমাজে কিছু দুর্বৃত্ত এবং খারাপ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ আছে। তারা সহজেই নারী কর্মকর্তাদের উত্ত্যক্তও করে, হেয় করার চেষ্টা করে। এগুলো এড়িয়েই নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। বরং এসব সমস্যার মধ্যেও নারী কর্মকর্তারা অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। কখনো কখনো ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের মতো পেছনে আক্রমণ করে দুর্বৃত্তরা। এগুলো তাঁদের শঙ্কিত করে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, মাঠপর্যায়ে নারী কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য পরিবারেও ভূমিকা আছে। সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাষ্ট্রের। কর্মপরিবেশ নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও আইনকানুন বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন