default-image

তখন ঢাকার লালমাটিয়ায় থাকতেন তিনি। কয়েকজন এলেন তাঁর বাসায়। একজনের কোলে এক মেয়েশিশু। আগতরা জানালেন, শিশুটি হারিয়ে গেছে। তার মা–বাবাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

বাসার ভদ্রমহিলা বললেন, কী আর করা। আমার বাসায় রেখে যান।

শিশুটিকে রেখে তাঁরা চলে গেলেন। ১৯৮৮ সালের কথা।

এই নারীর নাম ডালিয়া সামাদ। তিনি রেডিও–টিভিতে হারানো বিজ্ঞপ্তির ঘোষণা দিলেন। কিন্তু মেয়েটির খোঁজ কেউ করল না। মেয়েটি বড় হতে লাগল তাঁর বাসায়। পরের বছর একজন মৌচাক মার্কেটের পেছনে একটি পরিত্যক্ত কন্যাসন্তান পেলেন। এই শিশু দুই মাস লালন–পালন করেছিলেন কবি গোলাম মোস্তফার বড় মেয়ে ফিরোজা বেগম। তখন তাঁর বেশ বয়স হয়েছে। ডালিয়া সামাদ তাঁকে খালাম্মা ডাকতেন। তিনি একদিন বললেন, বাচ্চাটাকে নিয়ে যে কী করি? ডালিয়া সামাদ বললেন, ‘ওকে আমার কাছে দিয়ে দেন।’ শিশুটির ঠাঁই হলো ডালিয়া সামাদের বাসায়।

ডালিয়া সামাদের দুই সন্তান। এক ছেলে, এক মেয়ে। এখন তিনি চার সন্তানের মা হলেন। শিশু দুটির মা–বাবার নাম কী হবে? স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় হয়ে গেল যে। মায়ের নাম দিলেন ডালিয়া সামাদ। আর বাবার নাম হলো তাঁর স্বামীর নামে, আবদুস সামাদ।

বিজ্ঞাপন

কন্যাসন্তান দুটি বড় হোক। আমরা ডালিয়া সামাদের কাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে একটু ঢুঁ মেরে আসি। একদিন তাঁর এক খালা বললেন, ‘তুই ঢাকায় পড়ে আছিস কেন। মানুষের জন্য কাজ করতে চাস, শেরপুরে যা।’

শেরপুর জেলায় তাঁর স্বামীর ভিটা। ডালিয়া সামাদ বললেন, ‘ওখানে তো আমাকে কেউ চেনে না। আমি কীভাবে কাজ করব?’ খালা বললেন, ‘তুই যা। মানুষই তোকে চিনে নেবে।’

১৯৯০ সালে ডালিয়া সামাদ পাড়ি জমালেন শেরপুরে। তাঁর দিন–রাত কাটে গরিব রোগীদের সঙ্গে। শেরপুরে ৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে।

কার সেবা লাগবে, কার ওষুধ লাগবে, এসব দিয়ে শুরু হলো তাঁর নতুন জীবন। কোনো গরিব রোগী মারা গেলে তাঁর দাফন করার দায়িত্বও নিতেন তিনি। কোনো কোনো গুরুতর রোগীকে চিকিৎসকেরা ঢাকা বা ময়মনসিংহে নিতে বলতেন। কে নিয়ে যাবে তাকে? ডালিয়া সামাদই ভরসা। যাতায়াত খরচ, চিকিৎসা খরচ সব তিনি বহন করতেন।

১৯৯৮ সাল পর্যন্ত নিয়মিত এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখনো কেউ তাঁর কাছে এলে প্রয়োজনে রোগীকে ঢাকায় পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

শেরপুর জেলা থেকে একজন রোগীকে একাধিকবার ঢাকার বারডেম হাসপাতালে আনতে হয়েছিল। তখনই তাঁর মাথায় এল শেরপুরে বারডেমের শাখা করলে কেমন হয়। ভাবনা সত্যি হলো। ডালিয়া সামাদের উদ্যোগে তৈরি হলো ডায়াবেটিস সেন্টার। নিজেদের জমিতে তৈরি হলো সেটি। ১৯৯৭ সালের ১০ অক্টোবর উদ্বোধন হলো ডায়াবেটিস সেন্টারের।

একের পর এক তিনি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে লাগলেন। গ্রামের মেয়েদের দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবলেন, ইশ্‌, ওদের যদি নিজের পায়ে দাঁড় করানো যেত! গুনে গুনে ৪৫০ জন মেয়েকে তিনি নকশিকাঁথা সেলাইয়ের কাজ শেখালেন, যাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। উপার্জন করছেন।

ডালিয়া সামাদের এক আত্মীয় তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, যাঁদের ঘরবাড়ি নেই, তাঁদের জন্য কিছু করুন। মনে ধরল কথাটা। তিনি উঠে পড়ে লাগলেন। গৃহহীন ৬০ পরিবারকে টিনের ঘর বানিয়ে দিলেন।

তাঁর ধ্যানজ্ঞান একটাই, মানুষের জন্য কী করা যায়। ২২ বছর ধরে আয়োজন করে যাচ্ছেন চক্ষু শিবিরের। চোখের ছানি থেকে শুরু করে নানা অস্ত্রোপচার করানোর জন্য রোগীদের পাঠান ময়মনসিংহে। প্রাথমিক কাজ হয় শেরপুরে।

১৯৯৪ সাল থেকে চালাচ্ছেন রক্তদান কেন্দ্র। এক হাজার মানুষের ব্লাড গ্রুপিং করে রেখেছেন। রক্তের প্রয়োজন হলে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রক্তদান কেন্দ্রেই ছুটে আসেন লোকজন। ডালিয়া সামাদ বিনা সুদে ঋণদানের ব্যবস্থাও করেছেন। দুস্থ শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে ২০ হাজার টাকা দান করেন। নানাভাবে নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত ডালিয়া সামাদ।

এসব কাজের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার অনেকখানি মেটান তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু–শুভানুধ্যায়ীরা। আর তাঁর গাঁটের পয়সা তো আছেই।

শুরুতে বলেছিলাম তাঁর দুই কন্যাসন্তানের কথা। তিনি তাদের নিজের ছেলেমেয়ের মতোই মানুষ করেছেন। দুজনকেই উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছেন। শিখিয়েছেন কারিগরি কাজ। নিজের খরচে দুই মেয়েকে বিয়েও দিয়েছেন। শুধু কি তাই? দুজনকে পাঁচ শতক করে জমির ওপর টিনের বাড়ি করে দিয়েছেন।

১৯৮৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এসব নিয়ে ব্যস্ত আছেন ডালিয়া সামাদ। তাঁর বাড়িজুড়ে নানা প্রজাতের বিরল ফল–ফুলের গাছ। আছে ডালিয়া ফুলের গাছও। ডালিয়া সামাদ ডালিয়া ফুলের মতোই সৌরভ ছড়িয়ে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন
নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন