default-image

‘রুম ভাড়া হবে। ছাত্র ও চাকরিজীবীদের জন্য।’ রাজধানীর ফুটপাতের দেয়ালে লাগানো ঘর বা মেসের ‘সিট’ ভাড়ার এমন অনেক বিজ্ঞাপনই চোখে পড়ে তামান্না সুলতানার। কিন্তু কোনো মেসবাড়িতে ঠাঁই মেলে না। ফুটবলার পরিচয় দিলে কেউ রুম ভাড়া দিতে চান না। অবশেষে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের এক রেফারির সহযোগিতায় কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামের পেছনে মানিকনগর এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছেন সাতক্ষীরার ফুটবলার তামান্না।

মাসে সাত হাজার টাকা বাসাভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য নেই তামান্নার। তাই রুমমেট হিসেবে জুটিয়ে নিয়েছেন ক্রিকেটার বান্ধবী ইমা খাতুনকে। দুই মাস ধরে সেই ফ্ল্যাটকে মেস বানিয়ে থাকছেন দুই খেলার দুই খেলোয়াড়। অনুশীলন করেন কমলাপুর স্টেডিয়ামে ছেলেদের সঙ্গে।

ফুটবলার হতেই তামান্নার ঢাকায় আসা

চাকরির আশায় বা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্যই সাধারণত তামান্নার বয়সী ছেলেমেয়েরা ঢাকায় আসে। আত্মীয়স্বজনহীন শহরে আসার পর যাদের গন্তব্য হয় রাজধানীর বিভিন্ন মেসবাড়ি। কিন্তু শুধু খেলার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসে এভাবে দুজন মেয়ের মেস ভাড়া করে থাকার উদ্যোগটা ব্যতিক্রমই বলতে হয়।

তামান্নার বাড়ি সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে। খেলেছেন বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট, জেএফএ কাপ অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টে। সাতক্ষীরায় মেয়েদের ফুটবল একাডেমি গড়েছেন কোচ আকবর আলী। ওই একাডেমি থেকে উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলে খেলা ফুটবলার সাবিনা খাতুন, মাসুরা পারভীন, জান্নাতুল ফেরদৌস, ফাতেমা তুজ জোহরা, আরিফা খাতুন, সুরাইয়া খাতুন।

বিজ্ঞাপন
default-image

আকবর আলীর একাডেমিতে যে মেয়েরা কোচিং করেন, মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে তাদের আর একাডেমির হয়ে খেলা ও অনুশীলনের সুযোগ থাকে না। বর্তমানে কলেজপড়ুয়া তামান্নাও সেখানে অনুশীলন করতে পারেন না। তা ছাড়া ঢাকায় অনুশীলন করলে বড় ক্লাবে সুযোগ পাওয়া যাবে, এই আশায় স্বপ্নের শহরে পা রেখেছেন তামান্না, ‘আমার ঢাকায় আসার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো ভালো একটা ক্লাবে খেলা ও অনুশীলনের ভালো সুযোগ পাওয়া। আমাদের ওখানে অনুশীলনের অনেক সমস্যা। বাসা থেকে অনেক দূরে যেতে হয় অনুশীলন করতে। বাসে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাগে। সময়ে কুলিয়ে উঠতে পারি না।’

এমনিতেই এ দেশের মেয়েদের খেলাধুলায় আসতে অনেক প্রতিবন্ধকতা পার হতে হয়। কখনো থাকে পরিবারের বাধা, কখনো সমাজের চোখ রাঙানি। এসব পেরিয়েই খেলতে এসেছে তামান্না। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ের আগে মাঠের বাইরেও সমানে লড়তে হচ্ছে। ঢাকায় এসে শুরুতে অনুশীলন করতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।

পল্টন আউটার স্টেডিয়াম মাঠে রহমান ফুটবল একাডেমিতে ছেলেদের সঙ্গে কয়েক দিন ভালোমতো অনুশীলন করতেন তামান্না। পাশের মাঠে ক্রিকেট অনুশীলন করতেন ইমা। অনুশীলনের সময়ে টুকটাক কথা বলতেন ছেলে ফুটবলারদের সঙ্গে। কিন্তু এসব পছন্দ হতো না কোচের। তামান্নার সঙ্গে কথা বলার অপরাধে একাডেমি থেকে এক ফুটবলারকে তাড়িয়ে দেন। কয়েক দিন যেতে না যেতে তামান্নাকেও অনুশীলনে আসতে নিষেধ করেন। পল্টন মাঠে আরও অনেক একাডেমির ফুটবলাররা অনুশীলন করেন। তাদের অনুরোধ করে অনুশীলনের অনুমতি চেয়েছিলেন তামান্না। কিন্তু কেউই ছেলেদের সঙ্গে অনুশীলনের অনুমতি দেয়নি। শেষ পর্যন্ত কমলাপুর স্টেডিয়ামে পল্লীবন্ধু ফুটবল একাডেমিতে অনুশীলনের সুযোগ মিলেছে।

তামান্নার বাবা আতিকুর রহমান সাতক্ষীরায় মাছের ব্যবসা করেন। অল্প আয়ে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে বাবার। বাবার কাছ থেকে তাই টাকা নিতে চান না তামান্না। ঢাকায় এসে শুধু ফুটবল অনুশীলনই করছেন না, পাশাপাশি খেলছেন হ্যান্ডবল, কাবাডি, রাগবি, থ্রো বল, পেসাপালো টুর্নামেন্টে। এসব খেলে যে টাকা পান, তা দিয়েই মেসের ভাড়া ও খাওয়া-দাওয়ার খরচ জোগান তামান্না।

বাবার কাছে টাকা চাইতে হয় না বলেই খুশি তামান্না। তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরায় খেলার সময় কোচের শর্ত ছিল, আমাদের পড়াশোনা ও থাকার খরচ দেবেন তিনি। কিন্তু সেখানে খেলে টাকাপয়সা পেলে তা কোচ নিয়ে নেবেন। এখানে কোচকে কিছু দিতে হচ্ছে না। পেসাপালো, কাবাডি, রাগবি খেলে একটা টুর্নামেন্ট শেষে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হাতে আসে। এটা দিয়ে হাতখরচ উঠে আসে।’

ঢাকায় মেয়েদের ফুটবল একাডেমি নেই। তামান্না বললেন, ‘অনুশীলনের জন্য আমাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হচ্ছে। যদি ছেলে হতাম, এই লড়াইটা হয়তো করতে হতো না। এসব যখন ভাবি খুব খারাপ লাগে।’

বিজ্ঞাপন

ইমার প্রথম পছন্দ ক্রিকেট

খুলনার মেয়ে ইমা প্রিমিয়ার লিগ ক্রিকেট খেলেছেন ঢাকায়। জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বাছাইয়ের (ট্রায়াল) জন্য ঢাকায় এসে অনুশীলন করছেন। ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলের চর্চাটাও চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও বন্ধুকে সঙ্গ দেওয়া ইমার প্রথম উদ্দেশ্য, ‘ও একা ছেলেদের সঙ্গে অনুশীলন করতে চায় না। এ জন্য আমিও ওর সঙ্গে অনুশীলন করি। ফুটবলও ভালো লাগে। তবে ক্রিকেটই আমার প্রথম পছন্দ।’

তামান্নার মতো ইমাও ঢাকায় বিভিন্ন খেলায় অংশ নেন। বাড়িতে অসুস্থ বাবা। বোনের পড়াশোনার খরচ। সব মিলিয়ে সংসারে টানাপোড়েন সব সময়ই থাকে। তাই তো ঢাকায় খেলাধুলা করে টাকা উপার্জন করছেন ইমা। যে টাকায় নিজের খরচটাও চালিয়ে নেন।

লড়াই করতে হচ্ছে ভেবে কখনো ভেঙে পড়েন না ইমা। তিনি বললেন, ‘আমার একটাই স্বপ্ন, জাতীয় দলে খেলা। আমি কখনো ভেঙে পড়ি না। হতাশ হই না। হাল ছেড়ে দিই না। জানি এভাবে কষ্ট করেই একদিন স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছে যাব।’

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন