default-image

খেলার বিরতিতে কোর্টের পাশেই চেয়ারে বসে এক মা তাঁর সাত মাসের সন্তানকে দুধ পান করাচ্ছেন। মিজোরাম তুইকুম ভলিবল ক্লাবের মেয়েদের দলের অধিনায়ক লালভেন্তলুয়াঙ্গি ভেনির এমন একটা ছবি বছর দুয়েক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল (ভাইরাল হয়)। লড়াকু ওই খেলোয়াড় মা নিজের খেলার সঙ্গে আপস করেননি। আবার খেলার মধ্যেই ছোট্ট সন্তানকে সামলেছেন। এমনকি দলকেও সেদিন জিতিয়েছিলেন ভেনি। বাংলাদেশের তিরন্দাজ নাজমিন খাতুন যেন ভেনিরই প্রতিচ্ছবি!

কোলের সন্তানকে মাঠের পাশে রেখে অংশ নিয়েছেন সদ্য সমাপ্ত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমসে। শুধু তা–ই নয়, বাংলাদেশ আনসারের হয়ে রিকার্ভ ইভেন্টে মেয়েদের এককে জিতেছেন রুপা।

নাজমিনের ছেলে আবদুল্লাহ আল ইহানের বয়স ৫ মাস। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয়েছিল ইহানের। তারপরও সন্তান জন্মের তিন মাসের মাথায় বাংলাদেশ গেমসে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। শুরুতে গেমসে খেলার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু আনসারের কোচ বাবুল মিয়া নাজমিনকে বলেন, ‘তুমি তো আমাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তোমাকে আমাদের দরকার।’ কোচের অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারেননি। তা ছাড়া বড় মঞ্চে প্রিয় ইভেন্টে নিজেকে চেনানোর তাগিদটাও ছিল ভেতরে। রাজশাহী থেকে চলে এলেন ঢাকায়।

কিন্তু একে তো সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর অনুশীলনে ছিলেন না। তার ওপর ছেলে জন্মানোর পর একটু শারীরিক জটিলতার মধ্যে ছিলেন। তবু নিজেকে ফিট রাখতে শুরু করেন কঠোর পরিশ্রম।

বিজ্ঞাপন
default-image

ওই সময়ের কষ্টের কথা বলছিলেন নাজমিন, ‘শুরুতে পেটে ব্যথা থাকত। কিন্তু আমাদের কঠোর অনুশীলন করা লাগে। বাংলাদেশ গেমসে ভালো কিছু করতে হবে, কোচের আস্থার প্রতিদান দিতে হবে। এই ভেবে অনুশীলন চালিয়ে গেছি।’

গাজীপুর শফিপুর আনসার একাডেমিতে চলত আর্চারির ক্যাম্প। অনুশীলন ক্যাম্প থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে বাসা। সেখানে ছেলেকে রেখে আসতেন বড় ফুফু রাহেলা বেগমের কাছে। এই ফুফুর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই নাজমিনের, ‘ফুপি না থাকলে হয়তো আমার এই গেমসে খেলাই হতো না। উনি আমাকে সাহায্য না করলে এভাবে অনুশীলনও করতে পারতাম না। ভালো কিছু অর্জন করতেও পারতাম না।’ বাংলাদেশ গেমসেও টঙ্গীর আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে মাঠের একপাশে ফুফুর কোলে থাকত ছেলে।

নাজমিন বলছিলেন, বুলস আইয়ে চোখ থাকলেও মনটা পড়ে থাকত ছেলের কাছেই। খুব খারাপ লাগত তখন। ভাবতাম ছেলে এই বুঝি উঠে আমাকে খুঁজছে। দুধ পান করিয়ে আসতাম। গিয়ে আবারও দিতাম।’

ছেলের ভাবনার পাশাপাশি সামনে দেখতেন পদকমঞ্চ। নাজমিন বলেন, ‘মনের দিক থেকে সাহস দিতেন বাবুল স্যার, কোচ অনি চাকমা। রায়হান স্যারও (আনসারের ক্রীড়া পরিচালক রায়হান ফকির) উৎসাহ দিতেন। তাঁদের উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় ফাইনালে উঠি।’

ক্যারিয়ারে পঞ্চমবারের মতো কম্পাউন্ডের একক ইভেন্টের ফাইনালে উঠেছেন। কিন্তু সোনার পদক জেতা হয়নি কখনোই। এবার তো সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে খেলতে হয়েছে। তবু আশা করেছিলেন সোনা জিতবেন। খেলা শেষে বলছিলেন, ‘এতবার ফাইনালে উঠি কিন্তু সোনা জিততে পারি না। ব্যাপারটা কাকতালীয় মনে হয় আমার কাছে।’

ছোট্ট ছেলেকে নিয়েই গত মাসে অংশ নেন কক্সবাজারে জাতীয় আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে। ছেলেকে নিয়ে টানা ১৮ ঘণ্টা ভ্রমণের পর একটু অসুস্থ হয়ে পড়েন নাজমিন, ‘মাত্র ১৩ দিনের অনুশীলনে রুপা জিতি কক্সবাজারে। ওখান থেকে আসার পর সর্দি, জ্বর আর কাশি হয়েছিল আমার ও ছেলের। ৮-৯ দিন অনুশীলনই করতে পারিনি। এখনো শরীর দুর্বল।’

এত লড়াই সংগ্রামের পরও যে রুপা জিতেছেন, এতেই খুশি নাজমিন, ‘মা হিসেবে জিতেছি, এটা অবশ্যই গর্বের একটা বিষয়। এটা আমার জন্য বড় সাফল্য।’

২০০৯ সালে আনসারের চাকরিতে যোগ দেন নাজমিন। অনেকে খেলাধুলার মাধ্যমে চাকরি পেলেও নাজমিন আগে ব্যাটালিয়নে সুযোগ পান। এরপর যোগ দেন আর্চারি খেলায়। প্রাথমিক বাছাইয়ে ৩০ জনের মধ্যে হয়েছিলেন সেরা। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৪ সালে আর্চারির উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য ফেডারেশন তাকে দিল্লি পাঠিয়েছিল। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে গেছেন ইন্দোনেশিয়া, চীন, ইতালি, ইরান, থাইল্যান্ড ও ভারতে। ২০১৮ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় জুয়েল রানার সঙ্গে। খেলাধুলার পাশাপাশি ২০১৬ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন।

খেলাধুলা, ঘরকন্না ও চাকরি—একসঙ্গে এত কিছু কীভাবে সামলান? প্রশ্নটা করতেই হেসে বলেন, ‘আমি যেটাই করি খুব মনোযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করি। নিজের পরিবার, শ্বশুরবাড়ি, স্বামী সবাই আমাকে খুব সমর্থন ও সহযোগিতা করে। মেয়ে বলে কেউ কখনো কিছুতে বাধা দেয়নি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।’

বিজ্ঞাপন
নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন