default-image

পাহাড়ের মানুষেরা জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। এই ফসল উৎপাদনে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নারীদের অবদান যুগ যুগ ধরে। ঝড়, বৃষ্টি, প্রখর রোদ মাথায় ফসল ফলাতে ঘামঝরা খাটুনি তাঁদের।

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, মুরুং, লুসাই, বম, পাংখোয়া, খিয়াং, খুমী, চাকসহ বিভিন্ন অধিবাসীরা জুমচাষ করেন। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রাম সীমানাপাড়া। গ্রামে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ১১০টি পরিবারের বসবাস।

গ্রামের বাসিন্দারা তিন–চার কিলোমিটার দূরের পাহাড়ে গিয়ে জুমচাষ করেন। পুরুষদের পাশাপাশি গ্রামের নারীরা খুবই পরিশ্রমী। ফাল্গুন–চৈত্র মাসে জুম পাহাড় তৈরি, বৈশাখে বীজ বপন আর ভাদ্র থেকে ফসল তোলা। দীঘিনালা উপজেলার লারমা স্কয়ারে প্রতিদিন বিকেলে বসে জুমের ফসল বিক্রির হাট। এ হাটের বিক্রেতাদের সবাই নারী। শুধু জুম নয়, আমন, বোরো, আউশ ধানের মৌসুমে অধিকাংশ কৃষিশ্রমিকও নারী।

বিজ্ঞাপন

দুর্গম সীমানাপাড়া এলাকার জুম পাহাড়ে কয়েক দিন আগে গিয়ে দেখা যায়, রনিকা ত্রিপুরা (৩৩) স্বামী নবীন ত্রিপুরার সঙ্গে জুমঘরে বসে পান বাছাই করছেন। সকালে জুম থেকে মারফা তুলেছেন। এখন পানের আকারভেদে বাছাই করছেন। রনিকা ত্রিপুরা বলেন, ছোটকাল থেকেই আমি জুমে কাজ করায় অভ্যস্ত। আগে মা–বাবার সঙ্গে জুমে গিয়ে কাজ করতাম, এখন স্বামীর সঙ্গেই কাজ করি।

নবীন ত্রিপুরা বলেন, জুমচাষে পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশি পরিশ্রম করে থাকেন। ঘর–সংসার সামলে নারীরা জুমে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। এ জুম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে আরেক পাহাড়ে গিয়ে দেখা যায়, বনা ত্রিপুরা (৩০) জুমে ফসল তোলায় ব্যস্ত। প্রখর রোদে তাঁর মুখে একটুও কান্তির ছাপ নেই। ফসল তুলতে তুলতেই বলেন, ‘এ জুম পাহাড়ই আমাদের লক্ষ্মী দেবী। পরিশ্রম না করলে ফসল ফলাব কীভাবে? জুমে মারফা, চিনাল, মিষ্টিকুমড়া, মরিচ, ভুট্টা, ধান, ঝিঙে, আদা, হলুদ, তুলা, তিলসহ হরেক রকমের ফসল উৎপাদন করা হয়।’

default-image

এক বিকেলে লারমা স্কয়ারে গিয়ে দেখা গেল, জুমের বিভিন্ন ফসল নিয়ে সড়কের দুই পাশে সার বেঁধে বিকিকিনি করছেন নারীরা। প্রতিদিন বিকেলেই ৫০ জনের মতো নারী জুমের ফসল নিয়ে এখানে হাজির হন। কথা হয় ফসল বিক্রি করতে আসা পুষ্পলতা চাকমা (৫০), নিহার বালা চাকমা (৩৬), প্রিয় রানী ত্রিপুরা (২৫), কৃপালতা চাকমা (৪৪), ঝরনা চাকমার (৫০) সঙ্গে। তাঁরা জানান, সারা দিন জুমে কাজ করে বিকেলে ফসল নিয়ে লারমা স্কয়ারে বিক্রি করতে আসেন। এ ফসল বিক্রির টাকায় স্বামী, সংসার, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার সব খরচ চলছে।

সীমানাপাড়া গ্রামের প্রধান (কার্বারি) চয়ন ত্রিপুরা বললেন, ‘আমাদের গ্রামের ১১০টি পরিবারের সবাই জুম চাষি। জুমের ফসলে নারীদের অবদানই বেশি বলে মনে করি।’

যুগ যুগ ধরে পাহাড়ে ফসল উৎপাদনে নারীদের অবদান রয়েছে। জুমচাষে নারীরা নিজেরা নিজেদের ফসল ফলালেও বোরো, আউশ, আমন মৌসুমে মূলত নারীরা কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। জানালেন উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান ও দিবা-নিশি মহিলা কল্যাণ সমিতির সভানেত্রী সীমা দেওয়ান। সীমা দেওয়ান দুঃখের কথাও শোনালেন। নারীরা ফসল উৎপাদনে শ্রম বেশি দিলেও মজুরি পান কম।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0