default-image

করোনাভাইরাস বিস্তারে লকডাউন, যানবাহন বন্ধ, হাসপাতালে যেতে ভীতি কাজ করে মানুষের মধ্যে। তবে সন্তানসম্ভবা নারীদের তো উপায় নেই। সাজেক ইউনিয়নে এই ধরনের নারীদের নিয়ে অস্থির হয়ে পড়েন স্বজনেরা। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের মাচালং শান্তিপাড়ার পূর্ণমুখী চাকমা (৫৫) সহায়তায় এগিয়ে এলেন। তিনিই করোনাকালে শেষ ভরসাস্থলে পরিণত হন। নিজের বাড়িতেই স্বাভাবিক প্রসব করান তিনি।

গত কয়েক মাস দিন-রাত কোনো বিশ্রাম ছিল না পূর্ণমুখী চাকমার। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন দুই থেকে চারজন অন্তঃসত্ত্বা নারী আসছেন তাঁর বাড়িতে। বাড়িটি বলতে গেলে ছোটখাটো হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। গত চার মাসে বাড়িতে প্রসব হওয়া নবজাতকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০০–এর বেশি। নবজাতক ও মা সুস্থ আছেন বলে সেবা নেওয়া পরিবারের সদস্যরাও স্বীকার করলেন।

বাঘাইহাট-সাজেক সড়ক ঘেঁষে পূর্ণমুখী চাকমার বাড়ি। সেবা নিতে আসা নারীরা তাঁকে মা ডাকেন। প্রসবের পরবর্তী সেবাও দেন তিনি। আর চার মাস ধরে তিনি বিনা মূল্যেই এ সেবা দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

স্বামী স্বপন কুমার চাকমা আর পূর্ণমুখী চাকমার বাড়িতে দুটি ঘর। রান্নাঘরের এক পাশে পাটি বিছিয়েই তিনি প্রসবের ব্যবস্থা করেছেন। ২০০৮ সালে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক চিকিৎসা সংস্থা এমএসএফ থেকে ১৫ দিনের ধাত্রী প্রশিক্ষণ নেন পূর্ণমুখী চাকমা। সূর্যের হাসির ক্লিনিকসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ ও কাজ করেছেন তিনি। মাচালং এলাকায় বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে প্রসব করানোর কাজ করতেন। মার্চ মাস থেকে করোনাভাইরাসের বিস্তার শুরু হয়। অনেক সময় একেক এলাকায় যেতে এক থেকে দুই দিন হাঁটতে হয় তাঁকে। পরে বাড়িতেই এ সেবা চালু করেন। প্রসব করানোর পর মা ও নবজাতক সুস্থ হলে বাড়ি চলে যান। নতুন মায়েদের সঙ্গে স্বজনদের খাওয়া-থাকা সব পূর্ণমুখীর বাড়িতে করতে হয়। অনেকে চাল ও সবজি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন, অনেকে তাও আনতে পারেন না। তখন সম্পূর্ণ খাওয়ার আয়োজনই করতে হয় পূর্ণমুখীকে। অনেক সময় স্বজনেরা খুশি হয়ে ২০০ টাকা বা এক হাজার যা দেন, তা নেন পূর্ণমুখী। তবে সেই টাকাও খরচ হচ্ছে এই মা ও স্বজনদের পেছনেই।

গত ২৮ জুলাই পূর্ণমুখীর বাড়ি গিয়ে চারজন প্রসূতিকে পাওয়া যায়। দুজন এসেছেন দুর্গল লংকর ও ঢেবাছড়ি গ্রাম থেকে। অন্য দুজন মার্শাল এলাকায় কলাতলী ও মিঠাছড়ি এলাকা থেকে এসেছেন। ২৫ জুলাই থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত আটটি নবজাতকের জন্ম হয়েছে পূর্ণমুখীর হাতে।

আশা নীলবালা ত্রিপুরা নামের এক স্বজন বললেন, পূর্ণমুখী যে সেবা দিলেন, তা দেখে তাঁরা অভিভূত।

পূর্ণমুখী চাকমা (ধাত্রী) বললেন, ‘ আমার ছোট বাড়িতে গাদাগাদি করে দরিদ্র মায়েদের এ সেবা দিতে হচ্ছে।’

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নেলসন চাকমা বলেন, সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি হাসপাতালের দূরত্ব ৪০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। অনেকে হাসপাতালে যেতে চান না বা যাওয়াটাও কঠিন। সুযোগ পেলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পূর্ণমুখী চাকমাকে সহায়তা করা হবে।

বাঘাইছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. ইফতেখার আহমেদ বলেন, সাজেক ইউনিয়ন থেকে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স উল্টো পথে হওয়ায় খাগড়াছড়িতে অনেকে চিকিৎসাসেবা নেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারিভাবে একজন ধাত্রী রয়েছেন। দুর্গম এলাকা ও যোগাযোগসুবিধা না থাকায় সাজেকের বেশির ভাগ মানুষ ধাত্রীদের কাছ থেকে সেবা নিতে বাধ্য হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন